করোনা মোকাবিলায় জাতীয় কাউন্সিল গঠন করুন

প্রকাশিত: ১:২০ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৩, ২০২০

করোনা মোকাবিলায় জাতীয় কাউন্সিল গঠন করুন

আমসাআ আমিন :: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নভেল করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। সফলভাবে যুদ্ধ চালাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন যুদ্ধ চালানোর উপযুক্ত সংগঠন। শান্তির সময়ের মন্ত্রণালয়/প্রতিষ্ঠান দিয়ে তীব্রগতির করোনা বাগে আসবে না। নিউইয়র্কের বর্তমান মেয়র এন্ড্রু কুয়োমোর ভাষায়, ‘করোনা চলছে বুলেটের গতিতে।’ এ যুদ্ধে জয়লাভ করতে হলে আমাদের করোনা প্রতিরোধ কাজকর্মে এমনি গতি সঞ্চার করতে হবে। সেজন্য আমার পরামর্শ : জাতীয় ‘করোনা নির্মূল কাউন্সিল’ (কনিক) ও জেলায় জেলায় টাস্কফোর্স (কনিক/ট) গঠন। এদের চলতে হবে বুলেটের গতিতে, ওয়ার ফুটিংয়ে, সবাইকে নিয়ে। প্রয়োজন হতে পারে সুদক্ষ সামরিক নেতৃত্ব। এরাই হবেন নভেল করোনা যুদ্ধের দক্ষ নীতিনির্ধারক, স্ট্র্যাটেজিস্ট, পরিচালক ও করোনাযোদ্ধা। সরকার দিকনির্দেশনা দেবে, সরবরাহ করবে সব রসদ/সরঞ্জাম এবং চালাবে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা। নিচে রইল কিছু বিস্তারিত বর্ণনা। আমার কথা কতটুকু দেশের কাজে লাগবে জানি না। সম্ভাবনা হয়তো ক্ষীণ। বিবেকের তাড়নায় ভাবছি, অবশ্যই বলা দরকার যা উপলব্ধি করছি, কেউ পছন্দ করুক বা না করুক। নীরব থাকার সময় এটা নয়। সময়টা আসলে খুবই অনিশ্চিত, খুবই খারাপ। কত যে ক্ষতি হবে, কেউ জানে না। আতঙ্ক ছড়ানো নয়, সতর্ক করাই আমার লক্ষ্য। সব কর্মতৎপরতা জোরালো করতে বলাই আমার উদ্দেশ্য। যেভাবে সব চলছে সেভাবে চললে বিপর্যয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমাদের ব্যক্তি, সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার মান খুব গর্ব করার মতো নয়। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও আইন মেনে চলার স্বাভাবিক প্রবণতাও নেই। দ্রুতগামী করোনাযুদ্ধে জয়লাভের জন্য এসবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সবকিছু মাথায় রেখেই আমার ধারণাগুলো ব্যক্ত করছি। সর্বাত্মক করোনাযুদ্ধের জন্য, টোটাল ন্যাশনাল ওয়ার এগেইনস্ট করোনাভাইরাস-১৯-এর কাজে লাগতেও পারে আমার দু-একটা কথা। তাই ঢিল ছুড়ছি অন্ধকারে, অনেক কথা আছে, কিন্তু বলছি খুবই সংক্ষিপ্তভাবে :

১. প্রথম কথা হলো টোটাল ন্যাশনাল মোবিলাইজেশন : ছাত্র-যুব সমাজকে ডাকুন। অবসরপ্রাপ্তদেরও ডাকুন। সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজকে ডাকুন। মালিক-শ্রমিক সবাইকে এ যুদ্ধে শামিল করতে হবে; রাজনৈতিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব-সংকোচ আপাতত শিকেয় তুলে রাখতে হবে। এখন মোটেই দলকানা থাকা যাবে না। এ যুদ্ধ অবশ্যই সবার যুদ্ধ, ১৬/১৭ কোটি মানুষের এক বিশাল ও স্পর্শকাতর জনযুদ্ধ, করোনা নামের এক অজানা ও ভয়ানক শত্রুর বিরুদ্ধে, প্রত্যেক নাগরিক এ শত্রুর টার্গেট।
২. যেভাবেই হোক, বেগম জিয়া আপাতত মুক্ত। সরকারকে ধন্যবাদ। এখন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, অন্যান্য দল, এনজিও ও সিভিল সমাজের নেতাদের নিয়ে মাঝে মাঝে, প্রয়োজন অনুযায়ী সরকার/প্রধানমন্ত্রী নীতিনির্ধারণী পরামর্শ সভা ডাকতে পারেন। করোনা নির্মূলে সময়ে সময়ে সমস্যা বিশ্লেষণ, সমাধান-কৌশল নির্ধারণ, বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ-অণুবীক্ষণ, নীতি-কৌশল নবায়ন, পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়ে এ ধরনের উদ্যোগ জাতীয় ঐক্য সৃষ্টিতে গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে। তাই আবার বলব, সবার অংশগ্রহণ দরকার, সেই রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা দরকার। এ দুর্যোগে কারও দলকানা থাকা চলবে না। কঠিন এ সময় পাড়ি দিতে, যুদ্ধের সময়ের মতো, জাতীয় ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস একান্ত দরকার। আশা করি বেগম জিয়া বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবেন এবং তার দলে এ বিষয়ে দ্রুত ঐকমত্য তৈরি করতে তৎপর হবেন, সরকারকে এ যুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন।

৩. বাস্তব সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্য আমার প্রস্তাব : একটি জাতীয়/সর্বদলীয় ‘করোনা নির্মূল কাউন্সিল ও টাস্কফোর্স’ গঠন করুন। যে নামই দিন না কেন, সকল পর্যায়ে বেশ কজন সেনা কর্মকর্তাও রাখুন এ কাউন্সিলে ও টাস্কফোর্সে। এদের দিয়ে ২৪ ঘণ্টা/সাত দিনই সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রো-অ্যাকটিভভাবে কাজ করাতে হবে, সঠিক নীতি-কৌশল নিতে হবে, করোনার আগে চলতে হবে, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সব বিভাগে ও জেলায় শাখা গঠন করতে হবে। শুধু প্রশাসন একা সব পারবে না। জাতীয় কাউন্সিলে পেশাগতভাবে দুর্নীতিমুক্ত, নৈতিক চরিত্রে বলিষ্ঠ ও সুদক্ষদের নিয়ে স্টাফিং করতে হবে, সাজসরঞ্জাম, যানবাহন ও প্রয়োজনীয় বাজেট দিতে হবে।

৪. ফেসবুকে একটা লম্বা পোস্টে দেখলাম, করোনার জন্য নির্ধারিত কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের অবস্থা করুণ। ভিতরে/বাইরে গাদাগাদি অবস্থা, সর্বত্র হাঁচি/কাশি/থুথু। ডাক্তার ও নার্সদের পিপিই নেই। রোগী/অভিভাবক ফিরে যাচ্ছেন। নির্ধারিত অন্য হাসপাতালগুলোরও খোঁজ রাখা দরকার। IEDCR-এর আন্তরিকতা/দক্ষতা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন। মানতেই হবে IEDCR ভীষণ চাপে আছেন। তবে অবহেলার অভিযোগ থাকলে তার দ্রুত ও গোপন তদন্ত এবং বিহিত করা দরকার। সবাই জানি যে, নৈতিক মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় সবখানেই/সেক্টরেই সব আছে, ব্যাপকভাবে।

৫. করোনা পরীক্ষা হচ্ছে ঢাকায় মাত্র পাঁচ-ছয়টা হাসপাতালে। বাইরে তো নেই। পরীক্ষা করাই হলো করোনাযুদ্ধের ফ্রন্টলাইন। কিন্তু কিট বা ল্যাব সুবিধার ঘাটতিগুলো দ্রুত দূর করতে না পারলে যুদ্ধ চলবে কী করে? ঢাকায় শুধু নয়, বড় সব জেলাতেই ব্যবস্থা করতে হবে। পিপিইতে আছে ১০ রকমের জিনিস- গাউন, হেড/ফেস কাভার, গগলস, গ্লাভস ইত্যদি। এসবের সাপ্লাই কম, এক মাসের আছে কিনা সন্দেহ? সুতরাং বহির্দেশীয় সহায়তার বা কেনাকাটার উদ্যোগ দরকার। সময় কম।

৬. খবরে প্রকাশ, ইতালিকে চীন প্রচুর সহায়তা দিচ্ছে। আমরাও কি চাইতে পারি না? ইতালির প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে এ সহায়তা তারা পেয়েছেন। আমাদের অনেক দুর্বলতা আছে, সহায়তারও বিশেষ প্রয়োজন আছে। করোনা নিয়ন্ত্রণে সবকিছুই চীনের অতিরিক্ত আছে। করোনাও নিয়ন্ত্রণে আছে। আরও শুনলাম কিউবা অনেক দক্ষ ডাক্তার ও নার্স ইউরোপে পাঠাচ্ছে। করোনা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছড়িয়ে পড়ার আগেই এ ধরনের আন্তর্জাতিক সহায়তা খোঁজা করা দরকার।

৭. সেনাবাহিনী বলছে, তারা ৩ ঘণ্টায় ৫০ বেডের পাঁচটি ফিল্ড হসপিটাল চালু করতে পারবে। দরকার সব জেলাতেই একটি; আপাতত সব বিভাগে হোক একটা বা দুটা। সেনাবাহিনীর এ সামর্থ্য দ্রুত বাড়ানো প্রয়োজন। বিদেশি সহায়তা ছাড়া তা হবে না। চীন ১০ দিনে ১ হাজার বেড করতে পারে। তারা রাজি থাকলে সব জেলার খোলা মাঠে স্টেডিয়ামে ৫০/১০০ বেডের ফিল্ড হাসপাতাল করা ও চালানো যায়। কিছুদিনের জন্য দক্ষ জনবল এসে আমাদের ক্র্যাশ-ট্রেনিংও দিতে পারে। আর্মি মেডিকেল কোরের ও অন্যান্য রেজিমেন্টের প্রচুর মেডিকেল জনবল আছে। ৭০-৮০ হাজার গ্রামের জন্য ৫-৬ হাজার ইউনিয়নে ১০-১২ হাজার পল্লী চিকিৎসক আছেন। পর্যায়ক্রমে সবাইকে ক্র্যাশ প্রোগ্রামে আনা যায়।

৮. চীন করোনা নিয়ন্ত্রণে এনেছে। কীভাবে – সে শিক্ষাও নেওয়া যায়। তাদের অতিরিক্ত অনেক সাজসরঞ্জাম থাকতেও পারে। চেষ্টা করতে অসুবিধা কোথায়? চীনা সহযোগিতার জন্য প্রয়োজন জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা। বেইজিংয়ে আমাদের দূতাবাস প্রয়োজনীয় তথ্য জোগাড় করতে পারে।

৯. আইএমএফ-প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জি-২০ দেশগুলোকে সতর্ক করেছেন, করোনা ও অন্যান্য কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ে পড়বে। গরিব অর্থনীতির দেশ ও খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ শুরু হয়ে গেছে। সংস্থাটি এখন ১ লাখ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দিতে প্রস্তুত। সবচেয়ে বেশি ঝুঁঁকিতে থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলো অগ্রাধিকার পেতে পারে। পরে ঋণ মওকুফও হতে পারে। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক সংকটের কথা সবাই বলছে। শিল্পকারখানার পুঁজি সংকট, ব্যাংকে লিকুইডিটির অভাব, বিনিয়োগ শূন্যতা এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সামাজিক নিরাপত্তার বাজেট নিয়ে টানাটানি তো আছেই। করোনা ও রোহিঙ্গা তার ওপর মারাত্মক বাড়তি চাপ। আমরা জানি, আইএমএফ ভালো লেন্ডার নয়। তবে ঋণ মওকুফের একটা ভালো সুযোগ আছে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, এআইআইবি, চীন সরকারের সঙ্গে কথা শুরু হতে পারে। সমস্যা তো থাকতেই পারে। সবাই যখন করোনা বিপদে, কাজটি কঠিন হবে। কিন্তু আমাদেরও প্রয়োজন জরুরি। করোনাযুদ্ধ মুখে মুখে নয়, বাস্তবে সফল করতে হলে যুদ্ধের খরচ দ্রুত জোগাড় করতেই হবে। ভালো নেগোশিয়েটিং স্কিল প্রয়োগে অনুদান/ঋণ শর্ত সহজ হতে পারে। বিষয়গুলোর ভালো-মন্দ বিবেচনা করে সময় থাকতে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা এখনই শুরু করা উচিত।

১০. করোনার প্রসার ঠেকাতে লম্বা ছুটি, ফলে মানুষের বাড়ি যাওয়ার প্রবণতা, পরিবহনে হুমড়ি খেয়ে পড়ার সম্ভাবনা কারও মাথায় কি এলো না? আগে কি এসব আমরা দেখিনি। এর ফলে করোনা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ল না কমল! এজন্য বলি, একটি-দুটি নয়, বেশকিছু পারদর্শী মাথা কাজে লাগানো দরকার। জাতীয় করোনা নির্মূল কাউন্সিল থাকলে কেউ না কেউ পরামর্শ দিত যে এক-দুই দিন আগেই সড়ক, নৌ ও রেল সব পরিবহন বন্ধ করে দিন। তারপর বলা যেত, আগামীকাল থেকে অফিসে আসতে হবে না। কোনো গাড়ি চলবে না। বাড়িতে বসে থাকবেন। বাইরে বের হওয়া নিষেধ, গ্রামের বাড়িতে যেতে পারবেন না। ১৭ দিন কোনো ছুটি নয়। করোনা কারফিউ দেওয়া হলো। রাস্তায় সেনা সদস্যরা থাকবেন। দুজনের বেশি একসঙ্গে বের হলেই ১০-১৫ দিন শ্রীঘরে থাকতে হবে। আপনাদের করোনা থেকে বাঁচানোর জন্যই এসব কড়াকড়ি ইত্যাদি।

পরিশেষে আবার বলব, বাড়ি যেতে সবার হুমড়ি খেয়ে পড়ার ঘটনা এবং জানুয়ারি/ফেব্রুয়ারিতেই প্রস্তুতি শুরু না করা প্রমাণ করে, আসলেই জাতীয় ‘করোনা নির্মূল কাউন্সিল’ ও বিভাগে/জেলায় টাস্কফোর্স গঠন খুবই দরকার। তা ছাড়া সংশ্লিষ্ট সাত-আট জন মন্ত্রীর ওপর মানুষ আস্থা হারিয়েছে- সোশ্যাল মিডিয়া তাই বলে। মনে রাখা দরকার, আগামী দিনগুলোতেও তুঘলকি কান্ড ঘটে যেতে পারে। তাই দ্রুত জাতীয় পর্যায়ের কমিটি গঠন ও সুনির্দিষ্ট দায়দায়িত্ব নির্ধারণ প্রয়োজন। দক্ষ, দায়িত্ববান, টেকনোক্র্যাট, অরাজনৈতিক ব্যক্তি- এমনকি সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক/বেসামরিক ডাক্তার, নার্স ও কর্মকর্তাদের পুনর্নিয়োগ করা যায়, যুদ্ধকালীন যেভাবে করা হয়। বিভাগে জিওসিদের সম্পৃক্ত করা যায়। সিভিল-মিলিটারি সম্পর্ক ঠিক রেখে এভাবেই সম্ভব হতে পারে, ওয়ার ফুটিংয়ে করোনাযুদ্ধে বিজয় এবং জয়লাভ আমাদের করতেই হবে।

লেখক : মেজর জেনারেল ও রাষ্ট্রদূত (অব.)

নৈতিক সমাজের প্রবক্তা।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

আমাদের ফেইসবুক পেইজ