ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে হৃদয়ছোঁয়া শেষ আকুতি : সিলেটবাসীকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় ডা. ফয়সাল

প্রকাশিত: ৩:১৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০২০

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে হৃদয়ছোঁয়া শেষ আকুতি : সিলেটবাসীকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় ডা. ফয়সাল

নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেটবাসীকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় নিলেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশী চিকিৎসক আবদুল মাবুদ চৌধুরী (ফয়সাল)। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ডা. ফয়সাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের কৃতিছাত্র। জন্মস্থান বৃহত্তর সিলেটের হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থানায় গ্রামের বাড়ি হলেও তার গৌরবময় শিক্ষাজীবন এবং নিকটাত্মীয়তা সূত্রে চট্টগ্রামের সঙ্গে ডা. ফয়সালের ছিল আজীবন আত্মার সম্পর্ক।

আর তাই তার বন্ধু-বান্ধব, ব্যাচমেট এবং আরও যারা তাকে চিনতেন জানতেন তারা শোকে-বেদনায় মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন। যখন ডা. ফয়সালের অপ্রত্যাশিত ও বেদনাদায়ক মৃত্যু সংবাদটি প্রথম কানে আসে। ।

১৯৮৬ সালে চমেকের এমবিবিএস প্রথম বর্ষে ভর্তি হন ডা. ফয়সাল। এমবিবিএস পাশ করেন ১৯৯২ সালে। তিনি সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে চমেকে ভর্তি হন। তাছাড়া তিনি চট্টগ্রামের শহীদ শেখ মোজাফ্ফর আহমদে নাতনি জামাই। এমবিবিএস পাস করার কিছুদিন পর তিনি যুক্তরাজ্যে চলে যান বলে জানান চমেকের সাবেক শিক্ষার্থী ও বর্তমান অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ।
ব্রিটেনে খ্যাতিমান চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন নিজেকে। সেই সঙ্গে ডা. ফয়সাল বাংলাদেশী কমিউনিটি বিশেষ করে সিলেট ও চট্টগ্রামের মানুষগুলোর নিকট ছিলেন সবসময়ই প্রিয়মুখ। সমাজসেবা ও দরদী মন তার ছিল অনন্য গুণ।

খোলা চিঠিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে হৃদয়ছোঁয়া সেই আকুতি –

“প্রিয় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। দয়া করে ব্রিটেনে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯)-এর সাথে সম্পুক্ত সমস্ত স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষার জিনিসপত্র নিশ্চিত করুন। মনে রাখবেন, আমরা হয়তো ডাক্তার/নার্স/স্বাস্থ্য সেবা কর্মী, যাদের প্রতিদিন সরাসরি রোগীদের সংস্পর্শে আসতে হয়। কিন্তু আমরাও তো মানুষ। আমাদেরও মানবাধিকার আছে। আমাদেরও অধিকার আছে এই পৃথিবীতে সন্তান এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে রোগমুক্তভাবে বেঁচে থাকার”।

ফেসবুকে এই খোলা চিঠিটি ব্রিটিশ-বাংলাদেশি চিকিৎসক আবদুল মাবুদ চৌধুরী (ফয়সাল)। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে উদ্দেশ্য করে পোস্টটি দিয়েছিলেন গত ১৮ মার্চ। এর কয়েকদিন পর তিনি এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী দুই জনই আক্রান্ত হন কোভিড-নাইনটিনে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় তাদের দুই জনকেই হাসপাতালের আইসিইউ-তে নিয়ে যেতে হয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে অবস্থার উন্নতি হওয়ায় গত ৯ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডে নিয়ে আসা হয়।

অথচ, প্রধানমন্ত্রীকে করোনাভাইরাসের বিপদ সম্পর্কে যিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, সেই ডা. আবদুল মাবুদ চৌধুরী তার আগের দিন, ৮ এপ্রিল, গত বুধবার রাতে করোনাভাইরাসে ইন্তেকাল করেন। ডা. ফয়সাল চৌধুরীর এই ট্র্যাজিক মৃত্যুর খবরটি গত বৃহস্পতিবার থেকেই ব্রিটিশ গণমাধ্যমে গুরুত্বের সাথে উঠে আসছে বারেবারে।

বিদেশি সংবাদমাধ্যমের খবরাখবরে জানা যায়, করোনাভাইরাসের কারণে সামনের কাতারে থাকা ডাক্তার/নার্স/স্বাস্থ্য কর্মীরা যে কত বিরাট ঝুঁকির মধ্যে আছে, সেই প্রশ্ন আবারও উঠছে সবখানে, সমান গুরুত্ব সহকারেই।

ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস বা এনএইচএস-এ কাজ করেন শত শত বাংলাদেশী ডাক্তার এবং স্বাস্থ্যকর্মী। ডা. আবদুল মাবুদ চৌধুরী হলেন করোনাভাইরাসে দেশটিতে মারা যাওয়া প্রথম বাংলাদেশী ডাক্তার। তিনি ছিলেন ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তার স্ত্রীও ডাক্তার। উভয়েই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন।

স্ত্রী সেরে উঠলেও ডা. আবদুল মাবুদ চৌধুরীর অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে। তাকে মৃত্যুর আগের কয়েকঘণ্টা হাসপাতালের আইসিইউতে ভেন্টিলেটার রাখতে হয়েছিল। লন্ডনে এনএইচএসে কর্মরত একজন বাংলাদেশী ডাক্তার ও পারিবারিক বন্ধু বিশ্বজিৎ রায় মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও ডা. ফয়সাল চৌধুরীকে দেখতে গিয়েছিলেন।

ডা. বিশ্বজিৎ রায় বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, সপ্তাহখানেক আগে ডা. চৌধুরীর জ্বর এবং ডায়রিয়া দেখা দেয়। করোনাভাইরাস হলে যেসব উপসর্গ থাকার কথা সেগুলোর কোনটিই তার মধ্যে দেখা যায়নি। যখন তার মধ্যে যখন সামান্য ডেলিরিয়ামের (প্রলাপ) লক্ষণ দেখা দেয় তখন তিনি নিজেই হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হন।

হাসপাতালে যাওয়ার পর জানা যায়, তার ফুসফুস ভালভাবে কাজ করছিল না। প্রথম দিন থেকেই তাকে আইসিইউতে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। কিন্তু দেখা গেল তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাচ্ছিল। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তিন দিন পর তাকে হাসপাতালে ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিটে সরিয়ে নেয়া হয়। কৃত্রিম অক্সিজেন দিয়েও যখন তার অবস্থার কোন উন্নতি হলো না, তখন তাকে ভেন্টিলেশনে দেয়া হয়।

ডা. বিশ্বজিৎ জানান, ভেন্টিলেশন দেয়ার পর প্রথমদিকে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। কিন্তু এরপর তার গায়ে আবার জ্বর দেখা দেয়। একইসাথে তার কিডনি, লিভার ইত্যাদির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। যাকে আমরা ‘মাল্টি অর্গান ফেইলিউর’ বলে থাকি।

গত বুধবার হাসপাতাল থেকে জরুরি বার্তা এলো ডা. ফয়সাল চৌধুরীর পরিবারের কাছে। ডা. বিশ্বজিৎ তাদের সঙ্গে ছুটলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছিলাম পরিস্থিতি সংকটজনক। আমরা তখনো আশা ছাড়িনি। আমরা আশা করছিলাম অলৌকিক কিছু ঘটবে। ও আমাদের মাঝে ফিরে আসবে। নাহ। বুধবার রাত সাড়ে দশটায় ডা. ফয়সাল চৌধুরী পৃথিবীর সব মায়া ছিন্ন করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন’।

ব্রিটেনের হোমারটনে হাসপাতালে ডা. আবদুল মাবুদ চৌধুরী (ফয়সাল) কাজ করতেন। করোনাভাইরাস মহামারীর বিরুদ্ধে ব্রিটেনে প্রথম কাতারে থেকে লড়াই করছেন যেসব ডাক্তার, এ পর্যন্ত তাদের মধ্যে অন্তত ৯ জন নিজেরাই এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। আর এই ডাক্তারদের সবাই অভিবাসী অর্থাৎ ভারত, পাকিস্তান, মিশর, নাইজেরিয়া, সুদানসহ বিভিন্ন দেশে তাদের জন্ম। এ তালিকায় এখন সর্বশেষ যুক্ত হলো বাংলাদেশি ডাক্তার আবদুল মাবুদ চৌধুরীর ফয়সালের নামটি।

ডা. আবদুল মাবুদ চৌধুরী ছিলেন ব্রিটেনের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে সুপরিচিত মুখ। যুক্ত ছিলেন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। স্ত্রী, এক ছেলে এবং এক মেয়েকে নিয়ে ছিল তার সুখের সংসার। তার ছেলে ইনতিসার চৌধুরী স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ভুল ধরিয়ে দিতে আমার বাবা কোনোদিন ভয় পাননি। কারণ তিনি তার সহকর্মী, বন্ধু, পরিবার-পরিজন সবার কথাই ভাবতেন। এমনকি যাদের সঙ্গে হয়তো তার দেখা হয়নি, তাদের কথাও তিনি ভাবতেন।
ইনতিসার এবং তার মাত্র ১১ বছর বয়সী ছোট বোন ওয়ারিশা তাদের বাবার এই ট্র্যাজিক মৃত্যুর শোক সাগরে দাঁড়িয়েও চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নই দেখছে।

তারা সেই পেশাতেই যেতে চায়, যে পেশায় কাজ করতে গিয়ে তাদের বাবার অমূল্য প্রাণ ঝরে পড়লো। মানবদরদী একজন চিকিৎসক ডা. আবদুল মাবুদ চৌধুরীর মৃত্যুশোক সবারই প্রাণ যন্ত্রনায় বিদ্ধ হয়। ছিন্ন করে হৃদয়ের গভীরকে।

আমাদের ফেইসবুক পেইজ