করোনায় বিপদ ঢাকার মানুষেরই বেশি

প্রকাশিত: ৭:০৭ অপরাহ্ণ, মে ১৭, ২০২০

করোনায় বিপদ ঢাকার মানুষেরই বেশি

খুব দুঃখজনক ও আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে করোনাভাইরাসের এই দুর্যোগে সবচেয়ে বিপদগ্রস্ত অবস্থায় আছে ঢাকা শহরের জনগণ। যদিও তারা রাজধানীর মানুষ। সুবিধা তাদের সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ঘটনাটি বাংলাদেশে উলটো। ঢাকা মহানগর যেন কারো আপন নয়। সমগ্র দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি ঢাকা শহর কেন যেন বড়ই অভাগা। এটা বরাবর। স্বাস্থ্যখাতে তো অবশ্যই। ব্যাপারটি অত্যন্ত কষ্টের।

আর এটা শুধু করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি সেই হিসাব দিয়ে নয়, অন্য নানান ভাবেই। কিভাবে সেটা একটু ব্যাখ্যা করব। তবে তার আগে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন উপজেলা বা জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ে মানুষ কেন তুলনামূলক ভালো অবস্থায় আছে বলছি সেটা আগে বুঝতে হবে।

প্রথমত যেকোনো গ্রামে বা উপজেলায় বা জেলায় বা বিভাগে বসবাস করে মোটামুটি স্থানীয় সব মানুষ। বহিরাগত বা ভাসমান মানুষ সেখানে কম। প্রায় সবাই সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। ফলে মোটামুটি সবাই সবাইকে চেনে। নিজেদের আত্মীয়স্বজনও আশপাশে কম নয়। তাই সমষ্টিগত ও গোষ্ঠীগতভাবে তারা যেকোনো বিপদ মোকাবেলা করতে সক্ষম। শহরে কেউ কাউকে চেনে না বেশিরভাগ সময়। এটা অন্য সময় সুবিধা কিছু দিলেও দুর্যোগ মোকাবেলায় অন্যতম বড় অন্তরায়।

এরপর আসি সরকারি ব্যবস্থাপনার দিকে। বাংলাদেশের সরকারি কাঠামোতে উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও, কৃষি কর্মকর্তা, পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও (উপজেলা চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, মহিলা কাউন্সিলর, পৌরসভা মেয়র প্রভৃতি) সেখানকার স্থানীয় জনতা চেনে। খুব ভালো করে চেনে। জানেও। ব্যাকগ্রাউন্ডসহ। চেনা ও জানার কারনেই ক্ষেত্র বিশেষে তারা নিজেদের এলাকার সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, জনপ্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ডর উপর নজর রাখতে পারে ও তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারে। ফলে এখানে পুলিশসহ সরকারি কর্মকর্তারা যেমন তেমন জনপ্রতিনিধিরাও কিছু কাজ না করে পার পায় না (জনতার প্রতিনিয়ত মুখোমুখি হতে হয় যে!)। বলা চলে করতে মোটামুটি বাধ্যই থাকে। কিছু চুরি করেও!

বিপরীতে ঢাকা শহরে যেখানে প্রায় দুই কোটি মানুষ বাস করে তার অবস্থাটি কেমন? এখানকার মানুষরা কি মেয়র বাদে নিজেদের এলাকার কাউন্সিলর, মহিলা কাউন্সিলর ইত্যাদি কাউকে ঠিকমতো চেনে? বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্তরা বা বিপুল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী? উত্তর চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যাবে যে না। খুব বেশি চেনে না। ওয়ার্ড নম্বর জিজ্ঞেশ করলেও বিপুল সংখ্যক মানুষ বলতে পারবে না। ফলে সরকারি কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতায় আনার কোনো ব্যবস্থাও নাই। তাতে অবশ্য সে এলাকার বেশিরভাগ জনগণেরও তেমন কোনো মাথা ব্যাথাও নাই।

টিভির টক শোতে ঢাকার অন্তত কোনো কাউন্সিলর বা মহিলা কাউন্সিলরকে খুব বেশি দেখি নাই কোনোদিন। মেয়র কিছু জবাব দেয় কিন্তু দুই সিটি কর্পোরেশন মিলায় যে এক শর ওপর কাউন্সিলর এবং মহিলা কাউন্সিলর আছেন, তারা কোথায়? তারা কি করছেন? মগবাজার বা মোহাম্মদপুর বা ওয়ারী বা বংশাল বা যে এলাকায় করোনারোগী বেশি সেখানকার কাউন্সিলররাই বা কোথায়? মিডিয়া তাদেরকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনুক। তাদের আর্থিক বরাদ্দ কোন খাতে কিভাবে খরচ হচ্ছে সেটাও জানি। শুধু করোনাকালীন নয়, অন্য যেকোনো সময়ই তারা আসলে কি করেন?

ঢাকা শহরে এতগুলো ওয়ার্ড, এখানে ওয়ার্ডভিত্তিক সরকারি ব্যবস্থাপনায় কোন হাসপাতালের কি অবস্থা? মাতৃসদন কেন্দ্র যা আছে সেগুলোর অবস্থা কি? তারা কয়জনকে সেবা দিচ্ছেন? সেখানে কি জরুরি প্রয়োজনে শিশু থেকে বয়োবৃদ্ধদের নিয়ে যাওয়া যাবে? তারা মানুষকে অভয় দিক অন্তত। আর ওয়ার্ড ভিত্তিক স্বাস্থ্যকর্মকর্তাই বা কোথায়? মোট কথা রাজধানী ঢাকার ব্যবস্থাপনা আরো শক্তিশালী করা দরকার। আরো দরকার কাউন্সিলরদের জবাবদিহিতা। সবচেয়ে বেশি দরকার ঢাকাবাসীর সচেতনতা ও নগর কাঠামোতে অংশগ্রহণ। সেটা খুবই বেশি পরিমানে।

তবে সঙ্গে এও প্রশ্ন করি যে ঢাকা শহরের স্থানীয় কাঠামো কি কোনো পাঠ্যপুস্তকে আছে? এটা জানার উপায়ই বা কি? আমি আমার পরিচিত একজন বড় ভাইয়ের সন্তানকে টিকা দিতে গিয়ে প্রায় এক বছর আগে প্রথমবারের মতো দেখেছি এই যানজটের শহরে সরকারিভাবে টিকা দেয়ার মতো জরুরি কাজও এখানে জটিল একটা ব্যাপার। সরকারি টিকাদান কেন্দ্রই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অথচ আমার যারা আত্মীয় ঢাকার বাইরে থাকে তাদের জন্য এটা অতি সহজ একটি কাজ। কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র সবই হাতের নাগালে। সেখানে ঢাকার মতো যানজটও নাই। পরে বেশ খানিক সময় নিজ উদ্যোগে পড়াশুনা করে বুঝতে পারলাম যে ঢাকার স্থানীয় কাঠামোটা কেমন। এও ধরতে পারলাম যে ঢাকা শহরের স্বাস্থ্যব্যবস্থায়ই বড়সড় গলদ রয়ে গিয়েছে। ঢাকার বাইরে উপজেলাকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নয়।

জরুরি প্রয়োজনে এখানে সবাই ঢাকা মেডিক্যাল যায় কারণ এটাই সবাই জানে। এই যে করোনাকালের বিপদে অন্য রোগী নিয়ে সবাই এক হসপিটাল থেকে আরেক হসপিটালে ছুটছেন তা মূলত হাতের কাছে বা নিজের এলাকায় কোনো ইমারজেন্সি বা জরুরি সেবাদানকারী সংস্থা না থাকার কারণে বা না জানার কারণে।

কারণ অন্য সময় ঢাকার মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তরা (ক্ষেত্র বিশেষে নিম্নবিত্তরাও) বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় কাজটি করেন। বা যেকোনো বিপদে পড়লেও নিজস্ব চ্যানেলের মাধ্যমে কাজ সেরে ফেলেন। কিন্তু কেন নিজের ওয়ার্ডে নাই সেটা নিয়ে প্রশ্নও তোলেন না। বা কার কাছে তুলবেন সেটাই হয়ত জানেন না। বা নিজের কাজের ব্যস্ততার কারনে সেই সময়ও পান না। মূলত রাজধানীবাসীর এই নির্লিপ্ততা ও অংশগ্রহণহীনতাই রাজধানীর মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তকে বিপদ সংকুল করে তোলে।

আরেকটা ব্যাপার যে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যসেবা সবসময়ই ব্যয়বহুল। যে সমস্যায় ঢাকাবাসী ভুগছে। এখানে বেসরকারি বিশেষায়িত হসপিটাল আছে বেশ। পাঁচ তারকামানের হাসপাতালও আছে। তার দরকারও আছে কিন্তু জরুরি এবং নিত্যকার যে কাজগুলো যেমন গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবা, শিশু স্বাস্থ্য, তাদের নিবিড় মনিটরিং, যেকোনো অসুখে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা ইত্যাদির জন্য রাজধানীবাসী জন্য ওয়ার্ড ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা তেমন নাই। এগুলো নিয়ে অচিরেই ভাবনা শুরু করা দরকার। অনেক দেরী এমনিতেই হয়ে গিয়েছে। আর অন্তত নয়।

লেখক: সাব্বির আহমেদ : গণ্যমাধ্যকর্মী-(ঢাকা)

সর্বশেষ খবর

আমাদের ফেইসবুক পেইজ