প্রকৃতি ফিরছে আপন রূপে

প্রকাশিত: ২:৪৮ পূর্বাহ্ণ, মে ১৮, ২০২০

প্রকৃতি ফিরছে আপন রূপে

মো. সিরাজুল ইসলাম মোল্লা :; লোভী, দাম্ভিক, যুদ্ধবাজ এবং হিংসুটে মানবগোষ্ঠীর দ্বারা নানাভাবে অত্যাচারিত পৃথিবী যে মানবজাতির ওপর বড়ই নাখোশ, তা বলাই বাহুল্য।

আর তাই ভয়ংকর ছোঁয়াচে ভাইরাস করোনা যেখানে গোটা মানবজাতির জন্যই হুমকিস্বরূপ, মানুষকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে প্রতিমুহূর্তে; সেখানে প্রকৃতির জন্য এটি যেন ঠিক বিপরীত রূপ ধারণ করেছে!

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ডলফিনের ফিরে আসাসহ সমগ্র বাংলাদেশ এবং গোটা পৃথিবীর প্রকৃতিই যেন তার আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে!

নিউইয়র্কে অবস্থিত কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে, নিউইয়র্কে গত কয়েকদিনে কার্বন মনো-অক্সাইড নির্গমনের হার ৫০ ভাগ কমে গেছে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের হার কমেছে ৫-১০ ভাগ এবং সেই সঙ্গে মিথেন নির্গমনের হারও কমেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। চীনেও বিভিন্ন ধরনের গ্যাস নির্গমনের হার কমেছে ৩৫ ভাগ। ইতালিতেও একই রকম চিত্র দেখা গেছে, স্যাটেলাইট ইমেজ থেকে তা খুবই দৃশ্যমান।

ইউরোপিয়ান এনভায়রনমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ইউরোপজুড়ে বায়ুদূষণের মাত্রা ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পুরো ইউরোপে মোতায়েনকৃত বায়ুর গুণাগুণ পরিমাপক ৩ হাজার কেন্দ্র থেকে সংগৃহীত ডেটা থেকে তারা এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

২৭ মার্চ ইন্ডিয়া টাইমস থেকে জানা যায়, ওজোনস্তরে সৃষ্ট বড় আকারের গর্তটাও ইতোমধ্যে অনেকটা ছোট হয়ে গেছে এবং ক্রমান্বয়ে আরও ছোট হচ্ছে। ৩৩ বছর আগে ১৯৮৭ সালে মন্ট্রিল প্রটোকলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমিয়ে আনার কথা যেমনটি বলা হয়ছিল, বিশ্বব্যাপী গত কিছুদিন ৫০০-৭০০ কোটি মানুষ কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ থেকে বাঁচার জন্যে স্বেচ্ছাবন্দি থাকার ফলে সেই নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং পরিবেশ তার ক্ষত অনেকখানি পূরণ করতে সমর্থ হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশের অবস্থাও নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম নয়। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের পরিবেশ, বিশেষ করে বায়ুদূষণের অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে, ঢাকা শহরের অবস্থান খারাপের তালিকার প্রথম থেকে তৃতীয় স্থানে বিরাজ করছিল। আর বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল বছরে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার এবং পৃথিবীজুড়ে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল বছরে ৭০ লাখ।

বাংলাদেশের এখনকার অবস্থান যদিও জানা যায়নি, তবে টেলিভিশনের চিত্র দেখে মনে হচ্ছে পরিবেশ এখন একেবারে ঝকঝকে, কোনো ধুলাবালু উড়ে না, ধোঁয়া নেই, যেদিকেই ক্যামেরা তাক করছে, সেদিকই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এ থেকেই পুরো দেশের চিত্র আন্দাজ করা যায়।

নিউইয়র্ক পোস্টের ২৮ মার্চের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, মার্শাল বুর্ক নামে একজন বায়ুমান বিশেষজ্ঞ বলেছেন- কোভিড-১৯ চীনে ৪ হাজার শিশু এবং সত্তরোর্ধ্ব ৭৩ হাজার মানুষের জীবন রক্ষা করেছে। তবে চলতি মহামারীতে প্রকৃতি কত মানুষের জীবন কেড়ে নেবে, তা এখনই বলা মুশকিল। এখন পর্যন্ত তিন লাখের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৫০ লাখ মানুষ।

এ অবস্থা কতদিন চলবে তা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন, কারণ আমরা এটিকে নিয়ন্ত্রণ করার যতটুকু উপায় জানি (সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা), তা-ও মানছি না। এছাড়া যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় এ মহামারী এরই মধ্যে এনে দিয়েছে এবং আরও আনবে, তা মানবজাতির জন্য এক বিশাল ধাক্কা। সবার জীবনধারাকেই পাল্টে দিতে পারে!

বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার প্রত্যাশিত ২ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে অর্ধেকে নেমে আসবে। এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা যুক্তরাজ্যের পুরো জিডিপির সমান। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, বাংলাদেশের ক্ষতি হতে পারে ৩ বিলিয়ন ডলার এবং চাকরি হারাতে পারে লাখ লাখ মানুষ!

ইমোরি ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল হেল্থ অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস বিভাগের প্রফেসর ড. রবার্ট ব্রামেন বলেন, ‘করোনাভাইরাস বনরুই নামক একটি বন্যপশু থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন। আর এজন্য আমরাই দায়ী!’ নির্মমভাবে পশুপাখি হত্যা এবং বন ধ্বংস করার ফলে ১৭৫০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ৫৭১টি অথবা তার চেয়েও বেশি পশুপাখি বিলুপ্ত হয়েছে। পৃথিবী তার বনাঞ্চল হারিয়েছে ৮০ ভাগ। আর এভাবে চলতে থাকলে ১০০ বছরে যা বাকি আছে, তার ৫০ ভাগ হ্রাস পাবে। ১৯৩০ সাল থেকে এ পর্যন্ত মৎস্যসম্পদও কমেছে ৪ দশমিক ১ শতাংশ এবং এর প্রধান কারণ মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি।

এভাবে মানুষ একদিকে যেমন অবলীলায় হত্যা করছে বন্য পশুপাখি, সামুদ্রিক প্রাণী, আর অন্যদিকে তেমনি ঝড়ো উন্নয়নের তাগিদে উজাড় করছে গাছপালা, নিঃশেষ করছে ফসিল জমি। উন্নয়ন প্রতিযোগিতা এমনভাবে চলছে যে, কে কার আগে দখল করবে বরফ আচ্ছাদিত অঞ্চল থেকে শুরু করে স্পেস পর্যন্ত। আর এর সব বিরূপ প্রভাব পড়ছে প্রকৃতির ওপর। ওজোনস্তরের গর্ত যাতে আর না বাড়ে বরং ধীরে ধীরে কমে আসে, সে চেষ্টা মানুষ যদিও শুরু করেছে ৩৩ বছর আগে, তবে এ ব্যাপারে বড় বড় দেশের মধ্যে আন্তরিকতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

ওজোনস্তরে যে বিরাট গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, সে হয়তো এই ক্ষত আর নিতে পারছে না! পৃথিবীও আর সইতে পারছে না। তাই হয়তো নিজ থেকেই গোটা মানবজাতির ওপর তার এই নির্মম প্রতিশোধ!

তাই সাবধান! উন্নয়নের সোজা ও সহজ কোনো রাস্তা নেই। এক ধাপ এগিয়ে যাতে পদস্খলন না হয়, সেদিকে লক্ষ রেখেই সামনে যাওয়ার কথা আমরা সবাই জানি। প্রকৃতি ও মানুষের ওপর অমানুষিক ধ্বংসযজ্ঞ না চালিয়ে সব সৃষ্টির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হওয়া একান্তভাবে বাঞ্ছনীয়।

মো. সিরাজুল ইসলাম মোল্লা : সভাপতি, সুন্দর জীবন। সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সোসাইটি অব স্কলারলি জার্নাল এডিটরস। সদস্য, এডিটোরিয়াল বোর্ড, বিএমআরসি জার্নাল
সুত্র : যুগান্তর

আমাদের ফেইসবুক পেইজ