সেলিম ভাই, কেন চলে গেলেন এভাবে এই অবেলায়?

প্রকাশিত: ১০:৫৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০২০

সেলিম ভাই, কেন চলে গেলেন এভাবে এই অবেলায়?

অপূর্ব শর্মা

মৃত্যু চিরসত্য, অথচ নির্মম! কেউ তা ঠেকাতে পারেনি কোনোদিন। কেউ আগে, কেউ পরে। জন্মের পর থেকেই মানুষ এগিয়ে যায় মৃত্যুর দিকে। অমরত্বের তিলক পরে কেউ জন্মায়নি আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে। আবশ্যিকভাবেই অমোঘ সত্য মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয় মানুষকে।

মৃত্যু যখন দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকে তখনও আমরা বাঁচার প্রাণান্ত চেষ্টা করি। তবে, সময় ফুরিয়ে এলে আমাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। বড় মায়ার এই পৃথিবী থেকে নিতে হয় বিদায়। প্রয়াত হলেই গত হয়ে যায় মানুষ। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ মৃত্যুর মাঝে লীন হন না। নিজেদের কর্মপ্রভায়, সৃষ্টিতে বেঁচে থাকেন। না থেকেও থেকে যান। তাদের আলোয় আলোকিত হয় সমাজ। তাদের দেখিয়ে দেয়া পথে অগ্রসর হই আমরা। তাদের স্বপ্নময়তার সহযাত্রী হয়ে এগিয়ে যাই। সাংবাদিক আজিজ আহমদ সেলিম তেমনই একজন মানুষ। ঘাতক করোনা তাঁকে প্রাণহীন করলেও তিনি আমাদের মধ্যে থাকবেন অগণিত কাল।

সাংবাদিকতার সূচনা লগ্নেই আজিজ আহমদ সেলিম নামটির সাথে পরিচয়। প্রথমে বিটিভির সংবাদদাতা হিসেবে, এবং পরবর্তীতে দৈনিক যুগভেরী পাঠের সুবাদে তাঁকে দূর থেকে জানা। আমি তখন এগিয়ে চলার স্বপ্নে বিভোর। যুগভেরীতে তখন সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে আমার অতি আপনজন কমলগঞ্জের আবদুর রাজ্জাক রাজা কাজ করতেন। মাঝে মধ্যে তাঁর সাথে কথা হতো ফোনে। আর শ্রীমঙ্গলে এলে হতো আড্ডা। ২০০১ সালে আবদুর রাজ্জাক রাজা ভাই যুগভেরীতে স্টাফ রিপোর্টার নেওয়া হবে জানালে আমি আগ্রহ প্রকাশ করি। তিনি সেলিম ভাই এবং তাপসদার সাথে কথা বলে আমাকে সিলেট আসতে বলেন। দিনটি ছিলো ১ আগস্ট ২০০১। জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোল চারিদিকে। রাজা ভাই আমাকে সন্ধ্যার পর আসতে বলেন অফিসে। সে অনুযায়ী আম্বরখানায় যুগভেরী কমপ্লেক্সে পৌঁছে যাই। রাজা ভাই প্রথমে তাপসদার সাথে পরিচয় করান এরপর তাপসদা আমাকে সেলিম ভাইয়ের রুমে নিয়ে যান। আমি সেলিম ভাইকে সালাম দিতেই তিনি স্মিত হেসে বললেন বসও। বসলাম তাঁর সামনে। পরিবারে কে কে আছেন জিজ্ঞেস করে সিভি দিয়েছি কি-না জানতে চাইলেন। বললাম, তাপসদার কাছে দিয়েছি। তিনি বললেন, সবই ঠিক আছে। এসেছো ভালো কথা, থাকবে তো? না-কি কয়দিন পর চলে যাবে? আমি বললাম থাকবো। থাকার জন্যই এসেছি। তিনি বললেন, যদি সততা এবং নিষ্ঠার সাথে সাংবাদিকতা করও তাহলে আমাকে পাশে পাবে সবসময়। পাশাপাশি বললেন, আমি তোমার বেশ কয়টি নিউজ পড়েছি। তুমি ভালো নিউজ করো। বুঝতে অসুবিধে হয়নি, কোথায় নিউজ পড়েছেন তিনি। সিলেট থেকে প্রকাশিত দৈনিক বার্তাবাহক পত্রিকার শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি হিসেবে আমি তখন কাজ করতাম। নিয়মিতই তখন আমার প্রতিবেদন প্রকাশিত হতো বার্তাবাহকের প্রথম পাতায়।

প্রথমদিনই আমাকে ধরপাকড়ের কারণে সন্ত্রাসীদের পালানো নিয়ে একটি রিপোর্ট করতে বলেন তাপসদা। তাৎক্ষনিক ‘ওরা এখন গা দিয়েছে’ শিরোনামে প্রতিবেদন লিখে দিই। তাপসদা সেটি সঙ্গে সঙ্গে সেলিম ভাইকে দেখান। দ্রুত পাঠ করে, সেলিম ভাই আমাকে বললেন, খুব ভালো হয়েছে, এমনটিই চাই। পরদিন সেই সংবাদটি তিন কলামে ছাপা হয় যুগভেরীর প্রথম পাতায়। এটিই যুগভেরীতে প্রকাশিত আমার প্রথম প্রতিবেদন। দিন যত গড়িয়েছে তাঁর নির্ভরতা, আস্থা বেড়েছে আমার উপর। যে বিষয় নিয়ে রিপোর্ট করতে চেয়েছি তাতে কখনও আপত্তি করেন নি। তাঁর পরিচিতজনের বিরুদ্ধে গেলেও সেই রিপোর্ট টেবিলে আটকায়নি কখনো। যুগভেরীতে যারা অতীতে কাজ করেছেন, এখনো যারা কাজ করছেন-সকলেরই একথা জানা যুগভেরী কারো রক্তচক্ষুকে ভয় করে না। সত্য প্রকাশে সবসময়ই আপোষহীন যুগভেরী। যুগভেরীর প্রাণপুরুষ আমীনূর রশীদ চৌধুরী নির্ভীকতার যে ব্রত শুরু করেছিলেন, সেটাকেই সময়ের সাথে সাথে এগিয়ে নিয়েছেন অনেকে। সেলিম ভাই ছিলেন সেই পরম্পরারই সার্থক উত্তরসূরি। সত্য কঠিন হলেও সত্যকেই ভালবেসেছিলেন তিনি। সত্য কখনো তাঁর সাথে প্রবঞ্চনা করেনি।

সময়ের সাথে সাথে সেলিম ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হয়েছে। আমার উপর এতটাই নির্ভর করতেন কোনো আইটেমের কথা মাথায় এলেই সেটি করতে বলতেন। অনেক আইটেম নিউজ আমাকে দিয়ে করিয়েছেন তিনি। ঐ সময় যুগভেরীতে লিড নিউজ করা নিয়ে বলা চলে রিপোর্টারদের মধ্যে এক ধরনের অঘোষিত প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিলো, কার চেয়ে কে বেশি বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করতে পারবে? প্রতিটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর এত প্রশংসা করতেন সেলিম ভাই তাতে ব্যতিক্রমী নতুন প্রতিবেদন তৈরিতে উদ্বুদ্ধ হয়েছি বিশেষভাবে।

সেলিম ভাইয়ের ভরসার একটি কথা আজ খুব মনে পড়ছে। ২০০১ সালের নির্বাচনের পূর্বে আবুল মাল আবদুল মুহিত এসেছিলেন যুগভেরীতে। যুগভেরীতে তখন তুখোড় সব রিপোর্টারের হাট। আমি একেবারেই নবীন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেলিম ভাই আমাকে আবুল মাল আবদুল মুহিতের ইন্টারভিউ করতে বললেন। পাশে বসে রইলেন তিনি। আমি একটার পর একটা প্রশ্ন করে চলেছি আবুল মাল আদুল মুহিতকে। আর তিনি একের পর এক উত্তর দিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারাও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। আমি বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা কি-এমন একটি প্রশ্ন করেছিলাম তাঁকে, তিনি উত্তরে বলেছিলেন সচিবালয়। এক্ষেত্রে কি করা প্রয়োজন? আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, সচিবালয় বিলুপ্ত করা দরকার। সাক্ষাৎকার গ্রহণ শেষে আওয়ামীলীগের এক নেতা অনুরোধ করেছিলেন এই প্রশ্নটি এবং এর উত্তর এড়িয়ে যেতে। আমি ঠিকই সেটি লিখি এবং যুগভেরীতে পরদিন ৩ কলাম সেকেন্ড লিড হিসেবে প্রকাশিত হয়। এমনই ছিলেন সেলিম ভাই। কখনো পিছিয়ে যাননি। আস্থা রেখেছেন আমার উপর। আমি ২০০৩ সালে অন্যধারা নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা বের করার উদ্যোগ নিলে তাতে লেখা দিয়েছেন, করেছেন সার্বিক সহযোগিতা।

২০০৪ সালে দৈনিক আজকের কাগজে যোগ দিলে শুধু এটুকু বলেছেন যুগভেরী যেনও বঞ্চিত না হয়। আমার কর্মপ্রবাহে কখনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন নি তিনি। এগিয়ে যাওয়ার সাহস যুগিয়েছেন। ঐ সময়টাতে বোমা হামলা, গ্রেনেড হামলা, জঙ্গি শায়েখ আবদুর রহমানের সিলেট থেকে আটক হওয়া নিয়ে বেশ কয়েকটি রিপোর্ট আমি যুগভেরীতে করেছিলাম। তাতে, বিভিন্ন সংস্থার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। তিনি এ সম্পর্কিত বিষয়ে তাদেরকে আমার সাথে কথা বলতে বলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিলো, আমি ভালোমতোই সামলাতে পারবো পরিস্থিতি।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সেলিম ভাইয়ের সাথে কাজ করেছি। পরবর্তীতে সেলিম ভাই দৈনিক উত্তরপূর্ব পত্রিকার প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করলেও তাঁর অপত্য স্নেহ এবং ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হইনি কখনো। সাংবাদিকতার পাশাপাশি লেখালেখি এবং সামাজিকতায়ও তিনি অনন্য ছিলেন। সাংস্কৃতিক কর্মপ্রবাহের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন সেলিম ভাই। ছিলেন সাংবাদিকদের অভিভাবক। তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিলো সমাজের প্রতিটি স্তরে। প্রতিটি সংকট মোকাবেলায় তিনি ছিলেন দিশারী। প্রগতিশীলতার পথেই প্রবহমান ছিলো তাঁর পথচলা। সবার সাথেই সমান ব্যবহার করতেন তিনি। আপাদমস্তক ভালো মানুষ বলতে যা বোঝায়, তাই ছিলেন সেলিম ভাই।

টাওয়ার অব হেমলেটস কাউন্সিলের মাসব্যাপি আয়োজন সিজন অব বাংলা ড্রামায় ছান্দসিকের আমন্ত্রণে আমার লন্ডন যাত্রায় অসম্ভব খুশি হয়েছিলেন সেলিম ভাই। ফিরে আসার পর এনিয়ে আলাপচারিতায় তাঁর লন্ডন ভ্রমণের স্মৃতি তর্পণ করলেন। বললেন, তোমার অগ্রগতির পথে মাইলফলক হয়ে থাকবে লন্ডনের আয়োজনে অংশগ্রহণটি। এবং এ নিয়ে লেখারও তাগাদা দিয়েছিলেন তিনি। আমার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণায় অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন সবসময়। তাঁর এবং ভাবীর ইচ্ছে ছিলো, একদিন ওম এবং প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে যেন আমি তাদের বাসায় বেড়াতে যাই। সর্বশেষ গত ২৬ জানুয়ারি ভারতীয় হাইকমিশনের একটি অনুষ্ঠানে দেখা হলে সেকথা ভাবি এবং সেলিম ভাই দু’জনেই স্মরণ করিয়ে দিলেন। আমি বলেছিলাম শীগগির আসবো। এরপর ফেব্রুয়ারি মাসের ব্যস্ততা, তারপর শুরু হলো দুঃসহ সময়। তাই আর যাওয়া হলো না। এ আক্ষেপ আমার থাকবে সারাজীবন।

করোনাকাল শুরু হলে সবকিছুর মতো আমাদের জীবনচলায় ছন্দপতন ঘটে। বন্ধ হয়ে যায় দেখা, সাক্ষাৎ। কিন্তু দূরালাপনিতে যোগাযোগ হতো নিয়মিতই। বাইরে যেতে বারণ করতেন আমাকে। তিনিও বিধি নিষেধ মেনে চলতেন। আমি করোনায় আক্রান্ত হবার পর নিয়মিতই ফোনে খোঁজ নিয়েছেন, আমার ছেলে ওমের জন্য তাঁর সে-কি মায়া। আমি যেন ভুলেও ওমকে আদার করার জন্য স্পর্শ না করি, সাবধান করে দিতেন প্রতিবার। তাঁর ভরাটকন্ঠের নির্দেশনাগুলো কানে ভাসছে। আর বেদনায় বিক্ষত হচ্ছে মন।

এত বিধি নিষেধ মানার পরও করোনায় আক্রান্ত হলেন তিনি। তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলো। সবার প্রার্থনায় সেলিম ভাই ফিরে আসবেন, এমন একটা আশা জেগেছিলো মনে। কিন্তু না ফেরানো গেলোনা তাঁকে। ঘাতক করোনা কেড়ে নিলো তাঁর প্রাণ। অকালেই পারি জমালেন তিনি না ফেরার দেশে। তার মায়াভরা হাসিমাখা মুখটি আজ বার বার ভেসে উঠছে চোখের সামনে। তিনি যেনও বলছেন, ভালো থেকো অপূর্ব। ভালো থেকো।

সেলিম ভাইয়ের সাথে আর দেখা হবে না শহীদ মিনারে, দেখা হবে না নানা অনুষ্ঠানে। কথা হবেনা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে। মায়াভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করবেন না, ‘কিলান আছো তুমি, বালানি? সাবধানে থেকো।’

সেলিম ভাই, খুব, খুব মিস করবো আপনাকে। পরিচিতজনের ভীরে আমার এ দু’চোখ খোঁজে ফিরবে আপনাকে? না দেখতে পেয়ে ব্যথায় কাতর হবে মন। চোখ ভিজবে জলে। কেন চলে গেলেন, এভাবে এই অবেলায়!

অপূর্ব শর্মা : লেখক, সাংবাদিক।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ