কােটি কােটি টাকার জব্দকৃত পাথর লুটপাটের মহােৎসব

প্রকাশিত: ১১:২৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০২০

কােটি কােটি টাকার জব্দকৃত পাথর লুটপাটের মহােৎসব

অনলাইন ডেস্ক

সিলেটের কানাইঘাটের লােভাছড়া কােয়ারিতে প্রশাসনের জব্দকৃত কােটি কােটি টাকার পাথর লুটপাটের মহােৎসব শুরু হয়েছে। তিন মাস আগে পাথরগুলাে নিলামে দিলেও সর্বােচ্চ দরদাতার ইজারাদারকে কার্যাদেশ বুঝিয়ে না দেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে সরকারের মােটা অংকের রাজস্ব হারানাের পাশাপাশি ইজারাদারও চরম ক্ষতির সম্মুখিন। বিষয়টি সুরহা করতে উচ্চ আদালত এবং জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে জেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দিলেও অজ্ঞাত কারণে তা বাস্তবায়িত হচ্ছেনা। ইজারাদারের অভিযােগ, নিলাম বাতিল বা পুন:নিলাম না করে তার জমাকৃত পে অর্ডারের টাকাও ফেরত দেয়া হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে অনেকটা অসহায় পাথরের মালিকানা জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ বিভাগও। তবে জেলা প্রশাসক বলেছেন উচ্চ আদালতের মামলা সুরহা না হওয়া পর্যন্ত আদেশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছেনা। এছাড়া বিষয়টি এখন পরিবেশ অধিদপ্তরের এখতিয়ার। আর পরিবেশের পরিচালকের ভাষ্য: তিনি চিঠি লিখলেও খনিজ সম্পদ ব্যুরাে থেকে তাকে কােনাে নির্দেশনা না দিয়ে জেলা প্রশাসককে দিয়েছেন। সরকারি অফিসগুলাের এমন চিঠি চালাচালির ফাঁকে একটি অসাধু সিন্ডিকেট সরিয়ে নিচ্ছে পাথরগুলাে।

এ বিষয়ে জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব মোঃ আনিছুর রহমান সংবাদকে বলেন, এতােদিন এভাবে পাথর ফেলে রাখলে চুরি বা লুটপাট হওয়া স্বাভাবিক। তিনি বলেন, অনেক আগেই ইজারাদারকে নিলামকৃত পাথর বুঝিয়ে দেয়ার জন্য জেলা প্রশাসক ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে বলে দেয়া হয়েছে। এখন এটা তাদেরই দায়িত্ব।

গত কয়েক মাসে টাস্কফাের্সের মাধ্যমে লােভাছড়া কােয়ারিতে অবৈধ দাবি করে প্রায় অর্ধশত কােটি টাকার পাথর জব্ধ করে সিলেট জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর। এরপরই তারা নিলাম পক্রিয়া শুরু করে। তবে শুরু থেকেই স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দাবি করে আসছিলেন নদীর তীরে স্তুপকৃত পাথরগুলাে অবৈধ নয়। ইজারাকালীন মেয়াদে তারা ইজারাদারের কাছ থেকে ক্রয় করে রেখেছেন। কিন্তু করােনার মহামারির কারণে তারা সেখান থেকে তাদের পাথর অপসারণ করতে পারেননি। তবে তাদের এই দাবি মিথ্যে গন্য করে নিলাম আহবান করা হয়। এসময় জব্দকৃত পাথরের তৃতীয় নিলামের সর্বোচ্চ দরদাতা নির্বাচিত হন গোয়াইনঘাট উপজেলার ডৌবাড়ী ইউনিয়নের নূর উদ্দিনের ছেলে নিজাম উদ্দিন। তিনি বলেন, গত ১২ই আগস্ট সিলেট পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালকের অনুকুলে পে-অর্ডার বাবত ৬৭ লাখ টাকা জমা দিয়ে তিনি তৃতীয় নিলামে অংশ নেন। ১৬ টাকা দরে এক কোটি ঘনফুট পাথরের জন্য ১৬ কােটি টাকা টাকার নিলামে তিনি সর্বোচ্চ দরদাতা হিসাবে নির্বাচিত হন। কিন্তু গত তিন মাসেও জেলা প্রশাসন তাকে সরেজমিন দখল ও নিলামের কার্যাদেশ প্রদান করেননি। তার বক্তব্য, নিলামের দর কর্তৃপক্ষের পছন্দ না হলে তা বাতিল করে পুন:নিলাম ও তার পে অর্ডারের টাকা ফেরত দেয়া হােক। এজন্য তিনি বার বার জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেও কােনাে ফলাফল পাননি। এর আগে নিজেদের মালিকানা পাথর দাবি করে কয়েক ব্যবসায়ীর আদালতে মামলা চলমান থাকায় পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে করনীয় জানতে চাওয়া হয়। জবাবে জেলা প্রশাসককে গত ৯ সেপ্টেম্বর জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ বিভাগ অপারেশন-৩ শাখার সহকারী সচিব মােসা: মাতােয়ারা বেগম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ‘মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ হতে প্রাপ্ত পত্রের ভিত্তিতে লােভা নদীর দুই ধারে স্তুপ আকারে জমা থাকা পাথরের বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। সে বিবেচনায় ৪৭.৭০ লক্ষ ঘনফুট পাথর যা আদালতের নির্দেশে রিট মামলা দায়েরকারীদের অনুকূলে প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলেও জেলা প্রশাসক সিলেট ও পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক বিজ্ঞ সলিসিটর বরাবরে আপিল দায়ের করা হয়েছে। ফলে উক্ত জব্দকৃত ৪৭.৭০ লক্ষ ঘনফুট পাথর হস্তান্তর করা যাচ্ছে না।’ এমতাবস্তায় চিঠিতে উল্লেখিত ঘনফুট পাথর বাদে (রিট আদেশের আওতাভুক্ত) অবশিষ্ট পাথর চলমান নিলাম দরপত্রের আওতায় জরুরী ভিত্তিতে বিক্রয় করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরােধ করা হয় । কিন্তু সেই নির্দেশনা না মানায় অবশেষে ক্ষতির মুখে থাকা ইজারাদার নিজাম উদ্দিন অসহায় হয়ে গত মাসে আদালতে একটি রিট পিটিশন (নং ৬৪৭৬/২০২০) দায়ের করেন। আদেশে আদালত চার সপ্তাহের মধ্যে বিষয়টি সুরহার নির্দেশ দিলে তাও কার্যকর হয়নি।

এদিকে, রােববার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায় লোভাছড়ার জব্দকৃত পাথরের পরিমান দিন দিন কমে যাচ্ছে। অবৈধ ব্যবসায়ীরা চোরাই পথে প্রতিদিন কৌশলে সরিয়ে নিচ্ছে। তারা কানাইঘাট উপজেলার খেয়াঘাট, লোভারমুখ, আন্দুরমুখ ও পাশ্ববর্তী জকিগঞ্জ উপজেলার আটগ্রাম বাজাররের খেয়াঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে নৌকা যোগে পাথর নিয়ে স্তুপ আকারে জমা রাখছে। সেখান থেকে ট্রাক্টর ও ট্রাক যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে তা পাচার করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় গত ১ নভেম্বর ক্ষয়ক্ষতিসহ দাখিলকৃত পে-অর্ডার ফেরতের জন্য ইজারাদার জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়েছেন।

এই পাথরকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চাইলে জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব মোঃ আনিছুর রহমান সংবাদকে বলেন, ‘আমরা আদালতে রিটের পাথর রেখে অন্যগুলাে চলমান দরপত্রে দেয়ার জন্য ডিসিকে (জেলা প্রশাসক) বলে দিয়েছিলাম।কিন্তু ডিসি কেন তা করছেন না তা বােধগম্য নয়।’ তিনি আরাে বলেন, ‘খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি)’র মাঠপর্যায়ের কােনাে অফিস না থাকায় পাথর সংক্রান্ত বিষয়গুলাে তারাই (জেলা প্রশাসক) বুঝিয়ে দেন। ঠিক এভাবেই লােভাছড়ার বিষয়টি সিলেটের ডিসিকে সমাধানের জন্য বলা হয়।’ ডিসি কেন আপনাদের আদেশ শুনছেন না-এই প্রশ্নের জবাবে সিনিয়র সচিব বলেন, ‘যদি ডিসি তা করতে না পারেন সেটা আমাদের চিঠি দিয়ে জানাতে পারেন। আমরা এখনাে এ ধরণের কােনাে কিছু পাইনি। তাই না পাওয়া পর্যন্ত কিছু বলা ঠিক নয়।যদি তিনি এটাকে সমস্যাবােধ করেন তাহলে আমরা আমাদের সম্পদ বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবাে।’

জানতে চাইলে সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘পরিবেশ যখন নিলামে যাচ্ছিল তখন খনিজ সম্পদ ব্যুরাে থেকে বলা হয় বিষয়টি তারা দেখবে।এমতাবস্তায় তাদেরকে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে চিঠি দিয়ে করনীয় জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু পরিবেশকে করনীয়র কােনাে নির্দেশনা না দিয়ে আমাকে বলা হলাে অর্ধেক রেখে বাকি পাথর নিলাম করার জন্য। বিষয়টি এখন আমার কাছে না; পরিবেশের কাছে।’

তবে পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় পরিচালক এমরান আহমদ বলেন, খনিজ সম্পদ ব্যুরােতে করনীয় জানতে চাওয়া হলেও তারা কােনাে নির্দেশনা পাননি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দেয়ায় বিষয়টি সমাধানে তার কােনাে এখতিয়ার নেই।
সুত্র : দৈনিক সংবাদ

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

আমাদের ফেইসবুক পেইজ