২ মার্চ ১৯৭১ : উড়লো-নতুন-পতাকা

প্রকাশিত: ৫:০৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২, ২০২০

২ মার্চ ১৯৭১ : উড়লো-নতুন-পতাকা

অনলাইন ডেস্ক ::
পতাকা ব্যবহারের ইতিহাস প্রায় চার হাজার বছরের। পতাকার উদ্ভব হয় মূলত যুদ্ধ ক্ষেত্রে পক্ষ-বিপক্ষকে চিহ্নিত করার প্রতীক হিসেবে। ১৮ শতকে দেশে দেশে যখন জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে তখন থেকে জাতি গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করার জন্য রাষ্ট্রীয় পতাকার ব্যবহার শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা এর উদাহরণ যা ১৭৭৭ সালে জাতীয় প্রতীকে রূপলাভ করে।
২রা মার্চ ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্রের ইতিহাসে পতাকা উত্তোলন করে স্বাধীনতার ঘোষণা বা স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধের নির্দেশনা প্রদানের আর কোন তথ্য নেই। ২রা মার্চ রাষ্ট্র, সশস্ত্র সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রামের বিরল ঘটনা।

১৯৭১ সালের আজকের এই ২রা মার্চে লাখো বাঙালি ছাত্র গণ-জমায়েতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আজকের কলা ভবনের বটতলাতেই আ স ম আবদুর রব, বাইরে পাকিস্তানী সাজোয়া ট্যাংক আর বন্দুকের নল তাক করার তর্জনী গর্জনী উপেক্ষা করে ছাত্র সমাজের প্রাণের দাবির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলন করলেন। এ পতাকা উত্তোলন নিছক এক বাহাদুরি কিংবা কেবলমাত্র পতাকা উত্তোলনের আনুষ্ঠানিকতা ছিলোনা। এছিলো দীর্ঘ পরিকল্পনা, সুবিন্যস্ত এক সুদূর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের আগে থেকে নেয়া বাংলাদেশ স্বাধীন করার বৈপ্লবিক এক পরিকল্পনার অংশ বিশেষ। যে ঘটনার পর সমগ্র পাকিস্তানে জান্তা সরকার আ স ম আবদুর রব কে “বিদ্রোহী” এবং তার মাথার মূল্য লাখ টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করে। নিউক্লিয়াসের রূপকার ছিলেন সিরাজুল আলম খান, সঙ্গে ছিলেন মরহুম ফজলুল হক মণি, কাজী আরেফ আহমেদ, মার্শাল মনি, প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক আর তরুণ ছাত্রনেতাদের মধ্যে এর সাথে যুক্ত ছিলেন আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, হাসানুল হক ইনু, মরহুম নূর আলম জিকু সহ আরো অনেকে। তবে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার ছাত্রনেতাদের মধ্যে, যাদের নেতৃত্বে সেদিন ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো ও পরিচালিত হতো-সেই আ স ম আবদুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন- এই চারজনের মধ্যে আ স ম আবদুর রব আর শাজাহান সিরাজ কেবল স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের সাথে জড়িত ছিলেন।
বিস্মৃত .শিবনারায়ন. দাশ
নতুন পতাকা সেলাই করছেন শিবনারায়ন দাশ

সেজন্যে ২রা মার্চ পতাকা উত্তোলনের পরিকল্পনার কথা সেদিন এই নিউক্লিয়াসের সদস্যরা ছাড়া আগে থেকে আর কেউ অবহিত ছিলেননা। সিরাজুল আলম খান এবং আ স ম আবদুর রব ও মরহুম নূর আলম জিকু, কাজী আরেফ আহমেদ আমাকে নিজেরাই একথা বলেছেন। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলনের খবর বিদ্যুৎ বেগে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে, এক নব জাগরণের উন্মেষ সারা বাংলাদেশে আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। বাঙালি প্রাণের টানে নব উদ্যমে জেগে উঠে। আওয়াজ উঠে বীর বাঙালি অস্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো।

আ স ম আবদুর জানিয়েছেন, তার জীবনের সবচাইতে স্মরণীয় তিনটি ঘটনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালিন সময়েই ঘটে যায়। সে তিনটি ঘটনা হলো- ০১) ৬৯ এ ১১ দফা প্রণয়ন ও আন্দোলনের নেতৃত্বদান, ০২)৭০ এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের ভোটে প্রথম ভিপি নির্বাচিত ০৩) ৭১ এ বাঙালি জাতির পক্ষে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ২রা মার্চ স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন।

১৯৭০ সালের পল্টনের বিশাল জনসভায় সিরাজুল আলম খান জাতিকে “জয়বাংলা” শ্লোগান উপহার দেন, (যেমন করে দেন নিউক্লিয়াসের মাধ্যমে- পদ্মা মেঘনা যমুনা-তোমার আমার ঠিকানা, বীর বাঙালি অস্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর) যা পরবর্তীতে বাংলাদেশ নামক জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সমগ্র বাঙালি জাতি যেমন বাঙালি মুসলমান, বাঙালি হিন্দু, বাঙালি বৌদ্ধ, বাঙালি খ্রিষ্টান সকলকে এক অসাধারণ স্বাধীনতার মোহনায় একত্রিত করে এক অভিন্ন এক শ্লোগানে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ২৬ মার্চের অনিবার্য স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যায়।
২৩ মার্চ ৭১ .বঙ্গবন্ধু উড়ালেন.নতুন পতাকা
২৩ মার্চ ৭১ বঙ্গবন্ধু উড়ালেন নতুন পতাকা

আ স ম আব্দুর রব বলেন, এই শ্লোগানটি দেয়ার প্রস্তাব গৃহীত হয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়াস পন্থী ছাত্র আহসান উল্লাহ সানির রুমে। সেই সভায় সেদিন উপস্থিত ছিলেন সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব, আবুল কালাম আজাদ, আব্দুল্লাহ সানি, ইউসুফ সালাউদ্দিন আর বঙ্গবন্ধু প্রথম এই শ্লোগান উচ্চারণ করেন ১৯৭০ সালের ৭ ই মার্চের জনসভায়। মরহুম নূর আলম জিকু, আব্দুর রাজ্জাক, আ স ম আবদুর রব, প্রয়াত কাজী আরেফ আহমেদ, সিলেটের প্রয়াত আখতার হোসেন ১৯৮২ সালের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন ভাঙ্গার উদ্যোগের প্রাথমিক আলোচনা সভার এক পর্যায়ে জানিয়েছিলেন সর্বসম্মতভাবে, ১৯৭০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির এক অবিস্মরণীয় স্বপ্ন বুননের দিন। এদিন বাংলাদেশের পতাকা তৈরি হয়েছিলো। জিজ্ঞেস করলে সকলের সম্মুখেই আ স ম আবদুর রব বলেছিলেন তখনকার ইকবাল হল-যা আজকের জহুরুল হক হল নামে পরিচিত, ১১৬ নম্বর কক্ষে থাকতেন আ স ম আবদুর রব। এই কক্ষেই বসেই সেদিন নিউক্লিয়াসের পরিকল্পনাতেই আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, কাজী আরেফ, মার্শাল মনি(মনিরুল ইসলাম),শরীফ নূরুল আম্বিয়া স্বাধীন বাংলার পতাকার কাঠামো তৈরি করেন। পতাকার ভিতরের মানচিত্র সেলাই করা সম্ভব ছিলোনা বিধায় তা অংকন করেন শিবনারায়ণ দাস। আর সেদিনের বৈঠকেই নিউক্লিয়াস পক্ষে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লিখিত আমার সোনার বাংলা বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত নির্ধারণ করেন। ১৫ই ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে জয়বাংলা বাহিনীর প্রধান হিসেবে পূর্ণ সামরিক কায়দায় আ স ম আবদুর রব বঙ্গবন্ধুর হাতে ঐ পতাকা তুলে দেন। আর নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্ত মোতাবেকই ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ এই পতাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আ স ম আবদুর রব উত্তোলন করেছিলেন। একটি পতাকা- একটি মানচিত্র পুরোপুরি বদলে দিলো। নতুন করে ইতিহাস রচিত হলো। ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে বাংলাদেশের পথ পরিক্রমা তাই নতুনের জয়গানে ছুটে চললো।কেননা আর পাকিস্তানের সাথে এক তাকা চলেনা, চলবেনা। সকল সম্পর্ক ছিন্ন ভিন্ন করে জানান দিলো নতুন এই মানচিত্রের লাল সবুজের নতুন এই পতাকা। আ স ম আবদুর রব পতাকা উত্তোলনই শুধু করলেননা, নতুন এক জাতি রাষ্ট্রের জন্মের সূচনা করে দিলেন। পাকিস্তানী জান্তা হায়েনার মতো তাই তার পেছনে জীবিত অথবা মৃত ধরার জন্যে পাগলা কুত্তার মতো ছুটে চললো। বীর বাঙালি রব ফেরারি হলেননা, তখনি পালিয়ে ভারতে যাওয়ার সুযোগ থাকা সত্যেও রয়ে গেলেন ঢাকায়। পরিকল্পনা চলতে লাগলো গোপনে নিউক্লিয়াসের নির্দেশে। ইতিমধ্যে সারা বাংলা জেগে উঠেছে স্বাধীনতার উন্মাতাল মন্ত্রে। যার ফলে ৩রা মার্চ স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষিত হলো পল্টনের ঐতিহাসিক ছাত্র গণ-জমায়েতে, ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন, “এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম-স্বাধীনতার সংগ্রাম…”।

৭ই মার্চের পথ ধরে আসে ২৬শে মার্চ, এর গভীর রাতে ২৭ এর শুরুতে চট্টগ্রাম কালুর ঘাট স্টেশন থেকে মরহুম বেলাল মোহাম্মদের অক্লান্ত সহায়তায় তখনকার মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আমি মেজর জিয়া বলছি বলে স্বাধীনতা ঘোষণা, আর সর্বশেষ নয়মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফসল ১৬ই ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজী ৯৩ হাজার সৈন্য সহ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্যদিয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৪ মার্চ সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুর সাথে তার সাক্ষাতের কথা মনে করে বললেন,আগেই সিদ্ধান্ত ছিলো তাকে বুড়িগঙ্গার ওপারে নিয়ে যাওয়া হবে।পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মণি,আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ। বঙ্গবন্ধু আ স ম রবের হাতে চার হাজার টাকা তুলে দিয়ে বললেন তোরা যা, আমি পরে আসছি, আমার জন্য চিন্তা করিসনা। আ স ম রব চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেননা, বলতে লাগলেন, প্রথম যেদিন অস্র-শস্র নিয়ে বিলোনিয়ার চোত্তা খোলা বাংলাদেশে ঈনডাকশান করছি, তখন মাতৃভূমির মাটি ছুঁয়ে মাথানত হয়ে সালাম করেছিলাম। কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলাম। কারণ ইয়াহিয়া আমার মাথার দাম একলক্ষ টাকা ঘোষণা করেছিলো, ভাবছিলাম জীবনে আর ফিরে আসতে পারবোনা। স্বাধীন দেশে ফিরে এলাম, বিধ্বস্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যে বটতলায় দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়েছিলাম, পাক বাহিনী সেই বটগাছটি কামানের গোলায় উড়িয়ে দিয়েছে। কিছুদিন পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর জন এফ কেনেডি সস্ত্রীক ঢাকা সফরে এলে আমি ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন মিলে কেনেডিকে দিয়ে উপড়ে ফেলা সেই বটগাছের জায়গায় নতুন একটা চারা রোপণ করি- যা আজও সেই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে মাথা উঁচু করে।

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

আমাদের ফেইসবুক পেইজ