কভিড-১৯ ও আমাদের সংক্রামক আইন

প্রকাশিত: ১:২৮ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৪, ২০২০

কভিড-১৯ ও আমাদের সংক্রামক আইন

ব্যারিস্টার মুনা চৌধুরী

কভিড-১৯ আমাদের ক্রমাগত নতুন পরিস্থিতিতে ফেলছে। যদিও ২০১৮ সালের সংক্রামক রোগ আইনটিতে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সুনির্দিষ্ট বিধানাবলি রয়েছে। যেমন গত কয়েক দিন দেশে মুখ্য আলোচনার বিষয় ছিল বাংলাদেশে কভিড-১৯-এর টিকা প্রয়োগ নিয়ে। রোগবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-হুর গাইডলাইন অনুযায়ী যেন চীনের টিকা প্রয়োগ করা হয়, যার আইনি বিধান আমাদের সংক্রামক রোগ আইনের ধারা ৯ ও ৫-এ উল্লেখ আছে।

পৃথিবীজুড়ে কভিড-১৯-এর এই বিশ্ব মহামারী অথবা প্যানডেমিকে জড়িয়ে আমরাও প্রতিনিয়ত মুখোমুখি হচ্ছি বিবিধ আইনি সমস্যার। সরকার বর্তমান দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলা ও নিয়ন্ত্রণ করছে মূলত সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮-এর মাধ্যমে। ২০১৮ সালের এ সংক্রামক রোগ আইনে জনগণের যেসব আইনি অধিকার ও কর্তব্য রয়েছে, সেগুলো নিয়েই আজকের এ আলোচনা।
আমাদের সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ একটি বিস্তারিত, মূল আইন। আইনটিতে ২৩টি সংক্রামক ব্যাধির নাম উল্লিখিত ছিল এবং কভিড-১৯-কে ২৪ নম্বর সংক্রামক ব্যাধি হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে ২০২০-এর মার্চে। বিস্তারিত এ আইনটির কিছু বিশেষত্ব আছে যেমন আইনটি শুরুতেই বলে দিচ্ছে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে এটি দেশের অন্যসব আইনের চেয়ে প্রাধান্য পাবে এবং আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন [ধারা ৩]। সেই সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রয়োগ হবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (World Health Organization) তফসিলে উল্লিখিত ও International Health Regulations -এর অভিযোজনগুলো : যেমন সতর্কতা, ঝুঁকি, শিক্ষা বিস্তার, রোগের উন্নতি পর্যালোচনা, অধিকার সংরক্ষণসহ বিবিধ পদ্ধতিগুলো [ধারা ৯]।

আইনটির আরেকটি সুনির্দিষ্ট বিশেষত্ব এটি প্রশাসনিক এবং আমলাতান্ত্রিক যা ক্ষমতা দিচ্ছে প্রজাতন্ত্রের নির্ধারিত কর্মচারীদের, বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, সেই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পরিবেশ ও বন, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়, সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসকদের। উল্লিখিত মন্ত্রণালয়গুলো নিয়ে তৈরি ‘উপদেষ্টা কমিটি’র সব সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর বাধ্যতামূলক [ধারা ৬, ৭, ও ৮]। যেহেতু ২০১৮ সালের আইনটি ক্ষমতা দিচ্ছে প্রশাসনকে, সে কারণে শুধু প্রশাসনই মামলা দায়ের করতে পারবে, জনগণ নয়। এ আইনের কোনো ব্যত্যয় দেখলে জনগণ সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসককে অনতিবিলম্বে জানাবে। মামলা দায়ের করবে প্রশাসন এবং সে ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির বিধানাবলি প্রযোজ্য হবে [ধারা ২৭]।

আইনটি প্রশাসনকে কঠোর হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিবিধ ক্ষমতা দিচ্ছে যেমন- সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ ও মোকাবিলার জন্য রোগের ঝুঁকি হ্রাস, সচেতনতা বৃদ্ধি, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের জন্য প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ গ্রহণ [ধারা ৫(১)(গ)], আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক ও প্রতিষেধক প্রয়োগ [ধারা [৫(১)(ছ)], সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে অন্তরিন (Quarantine) বা পৃথক্করণ (Isolation) [ধারা ১(ট)] এবং বিচ্ছিন্ন করা না গেলে স্থানান্তরিত বা জনবিচ্ছিন্নকরণ [ধারা ১৪]। সেই সঙ্গে বাজার, স্টেশন, বন্দর ও গণজমায়েত বন্ধ ঘোষণা [ধারা ৫(১)(ন)], দেশের ভিতর ও বাইরের যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধকরণ [ধারা ৫(১)(ত)], সংক্রামিত এলাকা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ওই স্থানে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণকরণ [ধারা ১১(১)] [ধারা ১৬(১)] এবং সরকারি বিধি অনুযায়ী মৃতদেহের সৎকারকরণ [ধারা ২০(১)]।

প্রশাসনিক এ আইনটি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন জাগতে পারে নাগরিক হিসেবে এ আইনে আমাদের দায়বদ্ধতা কী। জনগণ হিসেবে এ আইনে আমাদের দায়বদ্ধতা এতটাই যে আইনটি পালনে ব্যর্থতা হতে পারে আমাদের জন্য দ-নীয় অপরাধ যেমন- ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব পালনে বাধা, তথ্যে গাপন অথবা মিথ্যা বা ভুল তথ্য প্রদান। কোনো ব্যক্তি সরকারি ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব পালনে বাধা প্রদান অথবা অসম্মতি জানালে সেই ব্যক্তির সাজা হতে পারে কারাদন্ড যা তিন মাসের বেশি নয়, অথবা অর্থদন্ড ৫০ হাজার টাকার বেশি নয়, অথবা কারা এবং অর্থ দন্ড উভয়ই [ধারা ২৫(১)]। কোনো ব্যক্তির তথ্য গোপন যেমন সংক্রামিত জীবাণুর বিস্তার, বিস্তারে সাহায্য, ঝুঁকির বিষয় গোপন করার সাজা হতে পারে কারাদন্ড ছয় মাসের বেশি নয়, অথবা অর্থদন্ড, ১ লাখ টাকার বেশি নয়, অথবা কারা এবং অর্থ দন্ড উভয়ই [ধারা ২৪(১), ২৪(২)]। কোনো ব্যক্তি সংক্রামক রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা ভুল তথ্য প্রদান করলে তার সাজা হতে পারে কারাদন্ড দুই মাসের বেশি নয়, অথবা অর্থদন্ড ২৫ হাজার টাকার বেশি নয়, অথবা কারা এবং অর্থ দন্ড উভয়ই [ধারা ২৬(১), ২৬(২)]। এখানে বলা জরুরি, কোনো বাসস্থানের মালিক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বাধ্য থাকবেন কোনো সংক্রমিত, জীবিত অথবা মৃত ব্যক্তির তথ্য সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জন এবং জেলা প্রশাসককে অনতিবিলম্বে জানাতে। সে তথ্য সিভিল সার্জন অথবা জেলা প্রশাসকও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে অনতিবিলম্বে জানাতে বাধ্য থাকবেন [ধারা ১০(২)]।

বিস্তারিত হলেও এ মূল আইনটিতে কিছু বিষয় অনুপস্থিত। সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ জনগণকে দিচ্ছে নির্দিষ্ট দায়িত্ব যা পালনে ব্যর্থতা হতে পারে জনগণের জন্য দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু আইনটিতে প্রশাসন, হাসপাতাল, স্বাস্থ কেন্দ্র ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের অবহেলা অথবা ব্যর্থতা নিয়ে কোনো বিধান নেই। যদিও চিকিৎসাজনিত অবহেলা, গাফিলতি, অপারগতা কভিড-১৯-এর আগে অথবা এই সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই জনমনে ক্ষোভ এবং দুঃখের সঞ্চার করেছে। আমার বিবেচনা এবং অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, মহামারী যখন আঞ্চলিক না হয়ে বিশ্ব মহামারীতে রূপান্তরিত হয়, পরিস্থিতি তখন অনেক বেশি আশঙ্কাজনক হয়। যে কারণে প্রশাসনের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মী, ডাক্তার, বিজ্ঞানী, সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানীদেরও এ মহামারী মোকাবিলায় সংযুক্ত করলে সুফল বয়ে আনতে পারে। এ আইনটি যেহেতু প্রশাসনিক সে কারণেই ‘জাতীয় কমিটি’র অনুপস্থিতি আইনটির একটি বিশেষ সীমাবদ্ধতা বলে প্রতীয়মাণ হয়। মনে পড়ে, ১৯৯৪ সালে ভারতের সুরাটে যখন প্লেগের আবির্ভাব ঘটে, তখন বাংলাদেশে প্লেগ প্রতিরোধে একটি জাতীয় কমিটি গঠিত হয়েছিল। যার সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন এ দেশে প্লেগ প্রতিরোধে শতভাগ সাফল্য বয়ে আনে। তেমনিভাবে এইচআইভি-এইডস প্রতিরোধে বাংলাদেশে জাতীয় এইডস কমিটি ৮০ ও ৯০-এর দশকে কাজ করেছিল এবং বর্তমানে এইচআইভি-এইডস বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রণে আছে।

কভিড-১৯-এর এ পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে আমাদের ধৈর্য ধারণ করে সরকারি নির্দেশ মেনে চলাই সঠিক। আইন জনগণের জন্য; আইন মেনে চলার দায়িত্ব আমাদের সবার, যার যার নিজেদের অবস্থান থেকে হোক সেটা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী অথবা একজন সাধারণ নাগরিক। এ আইনের ওপর শতভাগ শ্রদ্ধা রেখে, বিশ্বব্যাপী এ দুর্যোগে আইনটিকে পূর্ণাঙ্গভাবে মেনে চলে সরকারকে সাহায্য করা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী ও জনগণের নৈতিক দায়িত্ব এবং আইনি কর্তব্য বলে মনে করি।

লেখক : ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল

নিবন্ধিত আরবিট্রেটর, কুয়ালালামপুর রিজিওনাল সেন্টার ফর আরবিট্রেশন এবং সহসভাপতি, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ।
সুত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
       
  12345
2728     
       
28      
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ