দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড: একটি পর্যালোচনা

প্রকাশিত: ১০:১০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০২০

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড: একটি পর্যালোচনা

আবুল বাশার নাহিদ :

দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিটিশ শাসন পরবর্তী রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সূচনা ঘটে ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মোহনদাস করমচাদ গান্ধীর হত্যার মধ্য দিয়ে। যিনি মহাত্মা গান্ধী নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত।

তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রগামী ব্যক্তি এবং ভারতের জাতির জনক। তার হত্যাকারী ছিলেন নাথুরাম গডসে। যিনি উগ্র হিন্দুত্ববাদী কর্মকান্ডের সাথে দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন। তার ধারণা ছিল মহাত্মা গান্ধী ভারত বিভাজনের সময় মুসলমানের পক্ষে কাজ করেছেন। সেই প্রেক্ষাপটে মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করেন।

এই হত্যাকাণ্ডে পুরো জাতি শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়। গান্ধীজির মৃত্যুর পরে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু জাতির উদ্দেশ্যে আবেগময়ী বক্তব্য দেন।

তিনি বলেন, বন্ধু এবং সহযোদ্ধারা আমি ঠিক জানি না; আপনাদের কীভাবে বলব যে আমাদের প্রেমময় নেতা যাকে আমরা বাপু বলে থাকি, আমাদের জাতির পিতা আর নেই। আমরা আর উপদেশ কিংবা সান্ত্বনা জন্য তার কাছে ছুটে যাব না। এটি একটি ভয়াবহ আঘাত, শুধু আমার জন্যই না বরং দেশের লাখ লাখ মানুষের জন্য। গান্ধীজির হত্যার বিচার কার্যকর হয়েছিল ১৯৪৯ সালে।

দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক হত্যাকান্ডটি ঘটে ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবার পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে। এখানে এক জনসভায় ভাষণ দেয়ার পূর্বে আততায়ীর গুলিতে মারা যান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান। যিনি পাকিস্তান আন্দোলন এবং রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। তাকে হত্যার কারণ জানা যায়নি। তিনি মারা যাওয়ার পরে তাকে ’শহীদ-এ- মিল্লাত’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। যেখানে নিহত হন সেই উদ্যানের নামকরণ করা হয় ‘লিয়াকত বাগ’।

১৯৫৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী সলোমান বন্দরনায়েক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তিনি মারা যাওয়ার পরে ১৯৬০ সালের নির্বাচনে তার স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েক প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।

১৯৮৮ সালের ১৭ আগস্ট পাকিস্তানের সামরিক শাসক জিয়াউল হক মারা যান বিমান দুর্ঘটনায়। যদিও অনেকেই এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করেন। তার জানাজা এবং দাফন কার্য রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানেই হয়েছিল।

ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর একমাত্র কন্যা। যিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলেন। ভারতের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষার গুরুদায়িত্ব পালনের গৃহীত পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় নিজ দেহরক্ষীর গুলিতে ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর নিহত হন তিনি।

তার মৃত্যুতে ভারতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মৃত্যুর দিনই তার ছেলে রাজিব গান্ধী ভারতের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় কার্যকর হয়েছিল ১৯৮৯ সালের ৬ জানুয়ারি।

১৯৯১ সালের ২১ মে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে রাজিব গান্ধী তামিলনাড়ু রাজ্যে এক আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন। শ্রীলংকার এলটিটিই প্রথমে তার হত্যার দায় অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করে নেয়।

তার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে গৃহীত পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তার হত্যার পাঁচ বছর আগের মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর এক রিপোর্টে তাকে হত্যার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করে। এ হত্যাকাণ্ডের বিচারও খুব দ্রুত হয়েছিল।

১৯৭৯ সালে সামরিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর। জুলফিকার আলী ভুট্টোর মৃত্যুদণ্ডকে সামরিক শাসক জিয়াউল হকের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিযোগ রয়েছে। তার মৃত্যুর পরে তার কন্যা বেনজির ভূট্টো পিপিপি এর প্রধান হন এবং ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন।

বেনজির ভুট্টো নিহত হন ২০০৭ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে এক রাজনৈতিক জনসভায় আত্মঘাতী বোমা হামলার শিকার হয়ে। যেখানে ৫৬ বছর আগে নিহত হয়েছিলেন লিয়াকত আলি খান।

দক্ষিণ এশিয়া তথা মানব ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংসতম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডটি ঘটে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। এ দিন বাঙালির জাতির পিতা, বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। শুধু তার পরিবারের সদস্যদেরকেই নয় বরং তার আত্মীয়দেরকেও হত্যা করা হয়েছিল।

তার বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহকর্মীদেরও জেলের ভিতর হত্যা করা হয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়াসহ পৃথিবীর অন্যান্য রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড থেকে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ছিল ভিন্ন। উপরে আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এসব হত্যাকাণ্ডে শিকার হয়েছেন মাত্র একজন টার্গেটকৃত ব্যক্তি; যেখানে গোটা পরিবারকে হত্যার শিকার হতে হয়নি। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার বিচার তো করা হয়নি বরং বিচারের সব পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রেক্ষাপটও ছিল ভিন্ন। তিনি শুধু রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না । তিনি ছিলেন একটি জাতি রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং তার বাস্তবায়নকারী। তিনি ছিলেন একটি আদর্শের পতাকাবাহী। তিনি কখনো ক্ষমতা চাননি বরং বাঙালির চূড়ান্ত মুক্তির পথ কীভাবে নিশ্চিত করা যায় সে লক্ষ্যে কাজ করেছেন।

১৯৫০ এর দশকে মন্ত্রীত্বের লোভনীয় পদের বদলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী না হয়ে বাঙালির মুক্তির কথা বলেছেন।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক নেতাদের একটা বড় অংশ বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য ব্যয় করেছেন; আর সেই সময়ে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির লক্ষ্যে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে বেরিয়েছেন।

১৯৪৬ সালের নির্বাচনের সময় তিনি কলেজের ক্লাসের পরিবর্তে পূর্ববাংলার পথেপ্রান্তে ঘুরে বেরিয়েছেন এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্বের চেয়ে খেটে খাওয়া গরিব কর্মচারীদের পক্ষে অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

স্বৈরাচারী আইয়ুবের চোখে চোখ রেখে বাঙালির মুক্তির সনদ ছয়দফা তুলে ধরেন। তৎকালীন বাস্তবতায় বহু রাজনৈতিক নেতা এ প্রস্তাব অবাস্তব মনে করলেও তিনি তা বাস্তবায়ন করেছেন।

তিনি বাংলার মাটি আর মানুষের ভালোবাসার বিকল্প কিছুই ভাবেননি। তার নেতৃত্বেই মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। তিনি বাঙালিকে একটি স্বাধীন ভূখন্ড এনে দিয়েছিলেন।

তিনি বাঙালিকে দিয়েছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র , ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে প্রণীত আধুনিক এক সংবিধান। দক্ষিণ এশিয়ায় তার নেতৃত্বেই গঠিত হয়েছিল আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্র।

কিন্তু সেটা মেনে নিতে পারেনি মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা। তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনা করে। শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা নয়, বরং বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল।

হত্যাকারীরা পাকিস্তানী আদর্শে ফিরে যেতে চেয়েছিল। তাই তারা ১৫ আগস্টের ঘটনা ঘটায়। ফলে ১৫ আগস্টের পরে এ হত্যার বিচারের পথ বেআইনিভাবে ইনডেমনিটি জারি করে বন্ধ করা হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি শুধু বিচারই বন্ধ করেনি বরং তারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে মুছে দিয়ে পাকিস্তানি আদর্শে ফিরে যায়। পাকিস্তানের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য, শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাঙালির মুক্তির সংগ্রামকে অস্বীকার করে মুক্তিযুদ্ধের নতুন অপব্যাখ্যা দেয়া শুরু করল।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকে বৈধতা দেয়ার লক্ষ্যে নতুন রাষ্ট্রশক্তি জাতির পিতা এবং তার পরিবারের নামে মিথ্যা ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করা শুরু করে । এ ক্ষেত্রে তারা রাষ্ট্রে সকল শক্তিকে ব্যবহার করেছিল।

নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিক তথ্য যেন পৌঁছাতে না পারে সে লক্ষ্যে তারা পাঠ্য বইয়েও ইতিহাস বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোন রাজনৈতিক নেতাকে এ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি। দীর্ঘদিন পরে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার হলেও তার ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে যে ভিত্তিহীন অপপ্রচার করা হয়েছিল তা এখনো বন্ধ হয়নি।

লেখক: আবুল বাশার নাহিদ, লেকচারার, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ও দপ্তর সম্পাদক, বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী
সুত্র : যুগান্তর

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
15161718192021
22232425262728
2930     
       
  12345
2728     
       
28      
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ