প্রণবদা ছিলেন রাজনীতির রত্ন

প্রকাশিত: ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২, ২০২০

প্রণবদা ছিলেন রাজনীতির রত্ন

মমতা ব্যানার্জি :

তিনি ছিলেন প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি। ভারতরত্নও। বঙ্গবাসী ও বঙ্গভাষী হিসেবে আমরা সবাই এ জন্য গর্ববোধ করি। তবে আমার মতে, প্রণবদা ছিলেন রাজনীতির রত্ন। তার মতো রাজনীতি-অন্তপ্রাণ ব্যক্তির পক্ষে এটাই বোধহয় সবচেয়ে বড় শিরোপা!

পেছনে তাকিয়ে ভাবছি, প্রণব মুখার্জির সঙ্গে কতদিনের পরিচয় আমার? ১৯৮৪-তে আমার প্রথম লোকসভা নির্বাচনের টিকিট পাওয়ার পেছনে প্রণবদা ছিলেন। সেই কথা পরে বলব।

মনে পড়ছে তারও আগে ১৯৮৩ সালের কথা। সুব্রতদা, মানে সুব্রত মুখোপাধ্যায় তখন প্রণবদার টিম করেন। আমরা কাজ করতাম সুব্রতদার সঙ্গে।

কলকাতায় এআইসিসি-র অধিবেশন। প্রতিনিধিদের থাকার বন্দোবস্ত দেখাশোনার দায়িত্বে সুব্রতদা। সেই সংক্রান্ত কাজের সূত্রেই আমার প্রথম প্রণবদার কাছাকাছি যাওয়া। তিনি তখন কেন্দ্রে অর্থমন্ত্রী।

কলকাতায় এলে উঠতেন আমির আলি এভিনিউয়ে সরকারি ভবন ‘কপার হাউস’-এ। সেটি তখন ছিল ছোট দোতলা বাংলো।

কী জানি, হয়তো আমার নামে আগেই কিছু ভালো কথা শুনেছিলেন প্রণবদা! তাই প্রথম আলাপেই তার স্নেহের ছোঁয়া পেলাম। উৎসাহ দিলেন। প্রশংসাও করলেন।

যোগাযোগের সেই শুরু। এর অল্পদিন পরেই আর একটি ঘটনা। জম্মু-কাশ্মীরে কংগ্রেস কর্মীদের ওপরে গুলি চলল। নিহত হলেন কয়েকজন। ফারুক আবদুল্লা তখন কলকাতায়।

পরদিন খুব ভোরে ফিরে যাবেন। দিল্লি থেকে প্রণবদা নির্দেশ দিলেন, ‘কাল ফারুক আবদুল্লাকে বিমানবন্দরে তোরা বিক্ষোভ দেখাবি।’ সেই মতো শীতের ভোরে ৪টার সময় একটি গাড়ি জোগাড় করে বেরোলাম।

রাস্তায় কাঠের গুঁড়ি বোঝাই একটি লরিতে ধাক্কা মারল গাড়ি। তবু প্রাণে বাঁচলাম। ভাঙা গাড়িতেই বাকিদের তুলে বিমানবন্দরে বিক্ষোভ দেখিয়ে সব খবর দিলাম প্রণবদাকে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে প্রণবদা বহু ঝড়-ঝঞ্ঝা, বর্ষা-বসন্ত, কঠিন পরিস্থিতি, সহজ সমাধানের অংশীদার ও সাক্ষী।

আমরা জানি, ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রিসভায় প্রণবদা ছিলেন দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। ইন্দিরাজি তার ওপর নির্ভর করতেন চোখ বুজে।

এভাবে অনেক কাজ তখন সমাধা হয়েছে। সেই বিশ্বস্ততা প্রণবদা অর্জন করেছিলেন। তবে রাজীব গান্ধীর সঙ্গে প্রণবদার সম্পর্ক ভালো ছিল না। ইন্দিরাজি যেদিন নিহত হন, আমরা সেদিন রাজীবজির সঙ্গে সফর করছি।

কাঁথির পথে কনভয় থামিয়ে আমাদের গাড়ির কাছে এসে রাজীবজি বললেন, ‘মাম্মি কো গোলি লাগা’। তৎক্ষণাৎ ফিরে যাওয়া। বিমানে বরকতদার সঙ্গে সেদিন প্রণবদার কটু বাক্যবিনিময় হয়েছিল।

যাই হোক, রাজীবজি অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হন। তার পরে ১৯৮৪-র ভোট। যাদবপুরে কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের নাম উঠছিল। কিন্তু প্রণবদা আমার নাম সুপারিশ করেন। সুব্রতদার কাছ থেকে নামটি গিয়েছিল প্রণবদার কাছে। প্রণবদা ফোন করে জানতে চান, ‘তুই লড়তে পারবি তো?’ তাকে বলেছিলাম, ‘সুযোগ পেলে লড়ে যাব। পালাব না।’

তিনি আমার জন্য প্রচারে এসেছিলেন। বারুইপুরে, বেহালায় সভা করেছিলেন। আমি লোকসভায় যাওয়ার পরে রাজীবজি আমাকে পছন্দ করেছিলেন। রাজ্যে সিপিএমের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তার কাছে অনেক সুযোগ ও প্রশ্রয় পেয়েছি।

কিন্তু প্রণবদার সঙ্গে রাজীব গান্ধীর দূরত্ব বাড়ছিল। তাকে মন্ত্রী করা হয়নি। বরকতদাকেও নয়। দলেও প্রণবদা চাপে ছিলেন। মন স্বাভাবিকভাবেই ভারাক্রান্ত তখন।

একদিন আমাকে বললেন, ‘আমার সঙ্গে রাজীবের আলাদা কথা বলার ব্যবস্থা করে দিতে পারবি?’ রাজীবজিকে অনুরোধ করে রাজি করালাম। সম্ভবত ১৯৮৭। ত্রিপুরায় সেই বৈঠক হল। প্রণবদার আচরণে চোখের জলও ফেলতে হয়েছে আমাকে।

২০০৯-এর দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের শরিক ছিল তৃণমূল। মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বে আমি রেলমন্ত্রী, আমাদের আরও ছয়জন বিভিন্ন রাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রণবদা ছিলেন ওই সরকারে অর্থমন্ত্রী।

ঘটনাটি তখনকার। প্রসঙ্গত এটাও বলি, সোনিয়াজি না-চাইলে সেবার কংগ্রেসের সঙ্গে আমাদের জোট হতো না। হনুমন্ত রাও এসেছিলেন রাজ্যে কংগ্রেসের পর্যবেক্ষক হয়ে। প্রণবদার ভূমিকা তখনও খুব ইতিবাচক ছিল বলে মনে করি না।

কোনো নতুন প্রকল্পে বা চালু কাজের জন্য টাকা দিতে বরাবর ভীষণ কার্পণ্য করতেন অর্থমন্ত্রী প্রণবদা। সেই সময় একদিন মন্ত্রিসভার বৈঠকে হয়ে গেল চরম অশান্তি। কলকাতায় মেট্রোর কয়েকটি নতুন প্রকল্প ও সম্প্রসারণের জন্য টাকা চেয়ে ফাইল পাঠিয়েছিলাম। কাজগুলো পরিকল্পনাবহির্ভূত নয়। তবু তিনি টাকা ছাড়বেন না। বৈঠকে আমি বললাম, কেন দেবেন না?

উনি হঠাৎ বলে বসলেন, ‘তোর দলে তুই একা ক্যাবিনেটে আছিস। কী ভাবিস নিজেকে? তোর এত বেশি কথা শুনব না। টাকা পাবি না।’ অপমানে চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এলো। কেঁদে বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে আসছি, ছুটে এলেন আমার এক সতীর্থ মন্ত্রী শেলজা। আমাকে হাত ধরে বসালেন।

শান্ত করার চেষ্টা করলেন। প্রণবদা তখনও নিজের জেদে অটল। পরে অবশ্য মন্ত্রিসভার অনুমোদন আমি আদায় করতে পেরেছিলাম। প্রণবদাকে কাছের মানুষ ভাবতাম বলেই বোধহয় তার কাছে পাওয়া আঘাত ভুলিনি। হৃদয়ের উষ্ণতাই বা ভুলি কী করে!

তার রাষ্ট্রপতি পদে শপথে আমি যাতে থাকি, তাই বিশেষ বিমান পাঠিয়েছিলেন যাতায়াতের। সংসদের সেন্ট্রাল হলে একদম পেছনে বসেছিলাম। শপথ সেরে আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রা সহকারে বেরোচ্ছিলেন যখন, আবেগে ডেকে ফেললাম, ‘প্রণবদা…!’

মাননীয় রাষ্ট্রপতি দাঁড়িয়ে হাত বাড়ালেন, ‘কোথায় ছিলি তুই? দেখতেই পেলাম না!’ মন বলছে, আর তো কোনোদিন আপনার সঙ্গে দেখা হবে না, প্রণবদা! অসুস্থ হওয়ার আগের সপ্তাহেও ফোন করেছিলাম।

বললেন, ‘ভাল লাগে না রে! কোনো কাজ নেই।’ বলেছিলাম, ‘লিখুন, পড়ুন। আপনি তো লেখাপড়া করতে ভালোবাসেন।’ শুনে হেসেছিলেন শুধু। সেটাই তার সঙ্গে আমার শেষ কথা। ফোনে শোনা হাসিটুকু থাক স্মৃতি হয়ে। (আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির স্মৃতিচারণ, সংক্ষেপিত।)
সুত্র : যুগান্তর

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
1234567
15161718192021
22232425262728
293031    
       
22232425262728
2930     
       
  12345
2728     
       
28      
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ