‘মানুষ থেকেই মানুষ আসে বিরুদ্ধতায় ভিড় বাড়ায় আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ তফাত শুধু শিরদাঁড়ায় ’

প্রকাশিত: ১২:২৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২০

‘মানুষ থেকেই মানুষ আসে বিরুদ্ধতায় ভিড় বাড়ায় আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ তফাত শুধু শিরদাঁড়ায় ’

সাহাদাত পারভেজ :

কয়েক দিন আগে সেলিম ভাই আর রোকেয়া আপা তাদের একমাত্র মেয়েকে নিয়ে মাওয়ায় ঘুরতে গিয়েছিলেন। ফেসবুকে তারা সেই সব ছবি পোস্ট করেছেন। সেলিম ভাই আর আর রোকেয়া আপার এমন হাস্যোজ্জ্বল ছবি দেখে সত্যি ভালো লেগেছে। একটা দীর্ঘ সময় ধরে তাদের এমন যুগল ছবি দেখি নাই। তারা আসলে কাজ নিয়ে এমন ব্যস্ত ছিলেন যে কোথাও ঘুরতে যাওয়া কিংবা ছবি তোলার সময়টুকু পর্যন্ত পাননি। মাঝেমাঝে খারাপ ঘটনাও যে ভালো কিছুর জন্ম দেয় এই ছবিগুলো তার প্রামাণ। কয়েক দিন আগে সেলিম ভাই প্রথম আলোর চাকরি ছেড়েছেন। আর সে কারণেই হয়তো আমরা তাদের এই রকম ভালো কিছু মুহূর্ত দেখতে পেলাম।
সেলিম খান প্রথম আলো অনলাইনের নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। এই যে প্রথম আলোর অনলাইন এখন জনপ্রিয়তার উপরের দিকে অবস্থান করছে, এটা কিন্তু বলা চলে সেলিম ভাই একাই গড়ে তুলেছিলেন। দীর্ঘ সময় এর হাল ধরেছিলেন। আমরা তার সাক্ষী। আমাদের চোখের সামনে হয়েছে এই অনলাইন। সেলিম ভাই যখন অনলাইনের এই কনসেপ্ট নিয়ে ভেবেছেন তখন প্রথম আলোর সম্পাদক মোবাইলে ফোন নম্বরও সেভ করতে জানতেন না। মাঝেমাঝে কেউ তার ফোন নম্বর জানতে চাইলে তিনি আমাদের বলতেন, আমার ফোন নম্বরটা দিয়ে দাও। অথচ সেই সেলিম ভাই-ই প্রথম আলোর চাকরিটা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
যখন করোনা শুরু হলো তখন সেলিম ভাইকে বলা হলো, আপনার টিম থেকে লোক ছাঁটাই করেন। অপ্রয়োজনীয়দের তালিকা বানান। দুর্বল কর্মীদের লিস্ট দেন। তখন সেলিম ভাই বললেন, আমার টিমে কোনো অপ্রয়োজনীয় ও দুর্বল কর্মী নাই। আমি কাউকে বাদ দিতে পারবো না। তিনি তালিকাতো দিলেনই না বরং প্রথম আলোর এই অন্যায্য আচরণের প্রতিবাদ করে বসলেন। প্রথম আলো গণতন্ত্র কিংবা বাকস্বাধীনতার কথা বললেও তাদের নিজেদের মধ্যে সে চর্চা নেই। তারা নূন্যতম প্রতিবাদ পছন্দ করে না। তাই কাউকে বিব্রত না করে দীর্ঘ দিনের গড়া গড়া ভালোবাসার জায়গাটা থেকে সড়ে গেলেন। এই সময়ে বেশির ভাগ কর্মী যখন স্রোতের সঙ্গে গা ভাসান, মতি ভাইকে খুশি রাখতে ব্যস্ত থাকেন; সেই সময় সেলিম ভাই প্রতিবাদ করেন; একটা নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সাহস দেখান। স্রোতের বিপরীতে পথচলা মানুষ যে দুয়েক জন এখনো আছে সেলিম ভাই তার বড় উদাহরণ।
যুদ্ধে নিশ্চিত পরাজয় জেনেও যিনি সাহসের সঙ্গে লড়ে যান, প্রতিবাদ করেন, অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করেন না; সে-ইতো লড়াকু, অসীম সাহসী মানুষ। গত ১২ আগস্ট সেলিম ভাই তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন-
‘মানুষ থেকেই মানুষ আসে
বিরুদ্ধতায় ভিড় বাড়ায়
আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ
তফাত শুধু শিরদাঁড়ায় ’
সেলিম ভাইয়ের সেই শিরদাঁড়াটা আছে। কারণ তার শরীরে প্রখ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ মাওলানা আকরম খাঁর রক্ত প্রবাহমান। তিনি তার নাতি। সেলিম ভাইয়ের এক মামা ডা. এমআর খান এ দেশের একজন কিংবদন্তীতুল্য শিশু বিশেষজ্ঞ। তার আরেক মামা তোয়াব খান এ দেশের সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। সাংবাদিতা কোনো চাকরি না। সাংবাদিকতা হচ্ছে নৈতিকতা চর্চার জায়গা। সাংবাদিকতা হচ্ছে একটা প্রতিবাদ। সেটা প্রথম আলোর অনেক সাংবাদিক ভুলে গেছেন। প্রথম আলোর কী যেন একটা ব্যাপার আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে প্রতিবাদী ছেলেটাও ওখানে চাকরি করতে গিয়ে কেমন করে যেন তোতা পাখি হয়ে যায়। যখন কোনো কোনো কর্মীর দীর্ঘশ্বাসে বিশাল আকাশও বিদীর্ণ হয়ে ওঠে তখন পাশের চেয়ারে বসে থাকা কর্মীদের কেউ কেউ ফুল পাখি, লতা পাতা, আকাশ বাতাস, মাটি পানি, অহেতুক কবিতা, খাজুরা গল্প, মানহীন সাহিত্য, জবা ফুল লাল এই জাতীয় স্ট্যাটাস দেন; তখন সাংবাদিকতা, নৈতিকতা আর মানবিকতার কী থাকে বলেন? গাটসটুকু ছাড়া সাংবাদিকদের জীবনে আর কী আছে, কেউ কি আমাকে বুঝিয়ে বলতে পারেন?
আমার জানা মতে, এখন পর্যন্ত প্রথম আলোর ৩৫ জন নিরীহ কর্মীকে ছাটাই করা হয়েছে। আরো নাকি ৮৫ জনের তালিকা আছে। প্রতিদিন আমার কাছে অসংখ্য ম্যাসেজ আসে, ফোন আসে। আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় তারা ঘুমাতে পারেন না। তাদের জীবন দিনে দিনে দুর্বিষহ হয়ে যাচ্ছে। করোনাকে জুজু বানিয়ে প্রথম আলো কর্মী ছাটাইয়ের যে অপতৎপড়তা চালাচ্ছে সেটা ভালো কিছু ইঙ্গিত করে না। তারা হয়তো নিজেরাই বুঝতে পারছেনা তাদের এই সিদ্ধান্ত কতোটা আত্মঘাতি। এক সময় যখন বুঝতে পারবেন তখন আর কিছু করার থাকবে না। প্রথম আলো কিন্তু এখন লসে নাই। করোনার শুরুতে দুই মাস লসে ছিল। এখন তারা সব কিছু সামলে নিয়েছে।
প্রথম আলো বরাবরই সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে যা তা ব্যবহার করে, অন্যায় আচরণ করে। তাদের এই আচরণে সাধারণ কর্মীদের যে মনস্তাত্বিক রক্তক্ষরণ হয় সেই রক্তে আগে ভিজতো সিএ ভবন। আর এখন ভেজে প্রগতি ইনস্যুরেন্স ভবন। সে সব নিদারুণ কাহিনি লোকলজ্জার ভয়ে কেউ মুখ ফুটে বলে না।
দূর থেকে প্রথম আলোকে দেখা আর প্রথম আলোর ভেতরে থেকে প্রথম আলোকে দেখা এক জিনিস না। আপনারা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়ান তারা নিশ্চয়ই শিক্ষার্থীদের এই বাস্তবতার কথাগুলো বললেন। এটা জেনেও যারা সাংবাদিকতায় আসতে চাইবে কেবল তাদেরকেই উৎসাহিত করবেন। আর ক্লাসরুমে সেলিম খানের মতো সাংবাদিকদের উদাহরণ দিবেন। তাহলে সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীরা বাস্তব শিক্ষাটা পাবে।
আবার আসি সেলিম খানের কথায়। তিনি খুব চুপচাপ, বিনয়ী মানুষ। বলেন কম, শোনেন বেশি। সব সময় পড়াশোনায় মত্ত থাকেন, একটা ঘোরের মধ্যে থাকেন; কাজের মধ্যে ডুবে থাকেন। চেহারায় সারাক্ষণ ভেসে থাকে শান্ত নদীর মতো শীতল অভিব্যক্তি। তাকে বরফের মতো ঠান্ডা মানুষ বলেই জানতাম। কিন্তু তিনি যে ভেতরে ভেতরে এত বিপ্লব পুষেন, এটা আমার জানা ছিল না। সবাইতো স্রোতের সঙ্গে গা ভাসাতে স্বচ্ছন্দবোধ করেন। নিজের ক্ষতি করে এ সময়ে কে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস দেখায় বলেন? করোনার এই দু:সময়ে প্রথম আলোর এ রকম অন্যায়, অন্যায্য আর অনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একজনও যে রুখে দাঁড়ালেন, সেটাইবা কম কী।
#সাহাদাত_পারভেজ
৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
1234567
15161718192021
22232425262728
293031    
       
22232425262728
2930     
       
  12345
2728     
       
28      
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ