মহানবীকে ভালোবাসা আমাদের ইমানি দায়িত্ব

প্রকাশিত: ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০২০

মহানবীকে ভালোবাসা আমাদের ইমানি দায়িত্ব

এম এ মান্নান

 

মানবকুলের মধ্যে সেরা ছিলেন আখেরি নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

সর্বকালের সেরা মানব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন পরশপাথরের মতো। যাঁর সংস্পর্শে এসে সাহাবিরা সোনার মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁরা জাগতিক লোভ-লালসা ত্যাগ করে আল্লাহ-প্রেমের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। সমাজের সব মানুষের প্রতি তাঁরা যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন তা দৃষ্টান্তস্থানীয়। সাহাবিদের জীবনযাপন কেমন ছিল নিচের হাদিসগুলো থেকে তা অনুধাবন করা যায়। মুহাম্মদ ইবনে জিয়াদ (রা.) বলেন, ‘আমি সালফে সালেহিনকে (পূর্ববর্তী যুগের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব) দেখেছি, তাদের কয়েক পরিবার যৌথভাবে একই বাড়িতে বাস করত। কখনো কখনো তাদের কোনো পরিবারে মেহমান আসত এবং তখন হয়তো অন্য পরিবারের চুলায় খাবার রান্না হতো। আতিথ্য দানকারী পরিবার চুলার ওপর থেকে তা তুলে নিজের মেহমানের জন্য নিয়ে আসত। মালিক তার হাঁড়ির খোঁজে এসে তা না দেখে বলত, কে খাদ্য ও হাঁড়ি নিয়ে গেছে? আপ্যায়নকারী পরিবার বলত, আমরা তা আমাদের মেহমানের জন্য নিয়ে এসেছি। হাঁড়ির মালিক বলত, আল্লাহ ওই খাদ্যে তোমাদের বরকত দান করুন। মুহাম্মদ (সা.) বলেন, রুটির ক্ষেত্রেও এরূপ হতো’ আদাবুল মুফরাদ। পরস্পরের প্রতি অত্যধিক আস্থা ও বিশ্বাস থাকলেই কেবল এরূপ করা যায়। অন্যথায় সাধারণ অবস্থায় এ ধরনের সরল ও অকৃত্রিম আচরণ তিক্ততার সৃষ্টি করতে পারে।
আবদুর রহমান (রা.) বলেন, ‘মহানবী (সা.)-এর সাহাবিরা রুক্ষ মেজাজেরও ছিলেন না আবার মৃতবৎও ছিলেন না। তারা নিজেদের মজলিসে কবিতা পাঠ করতেন এবং জাহিলি যুগের ঘটনাবলিও আলোচনা করতেন। কিন্তু তাদের কারও কাছে আল্লাহর হুকুমের পরিপন্থী কোনো কিছু আশা করা হলে তার উভয় চোখের মণি ঘুরতে থাকত। যেন তারা পাগল।’ আদাবুল মুফরাদ। অর্থাৎ রসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহচার্য লাভ করে তারা এমন ভারসাম্যপূর্ণ মেজাজের অধিকারী ছিলেন যে, তারা পাদরি-পুরোহিত ও সংসারত্যাগীদের মতো সম্পূর্ণ রুক্ষ স্বভাবের ছিলেন না, আবার দুনিয়াদার লোকদের মতো সব সময় হাসি-কৌতুক এবং গালগল্পেও মেতে থাকতেন না। বরং কৌতুকের স্বাদ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তাদের মন দীনি আবেগে পরিপূর্ণ থাকত।

দীন ও ইমানই হলো এ দুনিয়ার সবচেয়ে বড় নিয়ামত, যা আমরা মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমেই লাভ করেছি। তিনি আমাদের প্রতি অশেষ অনুগ্রহ করেছেন। তিনি নির্মম অত্যাচার ও অপরিসীম নির্যাতন ভোগ করে হিদায়াতের বাণী পৌঁছিয়েছেন। তাঁর এ কোরবানি ও ত্যাগ না হলে আমাদের কাছে দীন পৌঁছাত না, বরং আমরা কুফর ও শিরকের অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকতাম। কাজেই মহানবী (সা.)-এর প্রতি মহব্বত ও ভালোবাসা পোষণ করা আমাদের নৈতিক ও ইমানি দায়িত্ব। উপরন্তু মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসাকে অন্য সবকিছুর ভালোবাসা থেকে ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। তবেই প্রকৃত ইমানদার হওয়া যায়। ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন, তোমাদের কাছে যদি আল্লাহ, তাঁর রসুল এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করা অপেক্ষা অধিক প্রিয় তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের স্বগোষ্ঠী, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যার মন্দা পড়ার আশঙ্কা কর এবং তোমাদের বাসস্থান যা তোমরা ভালোবাস, তবে অপেক্ষা কর আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত। আল্লাহ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না।’ সুরা তওবা, আয়াত ২৪।

মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সব মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হব। যৌক্তিকভাবেও যদি আমরা বিষয়টি বিশ্লেষণ করি তা হলেও দেখব, সবার চেয়ে মহানবী (সা.)-কেই অধিক ভালোবাসা কর্তব্য। কেননা সাধারণত চার কারণে একজন অন্য একজন মানুষকে ভালোবেসে থাকে- ১. বাহ্যিক সৌন্দর্য ২. চারিত্রিক গুণাবলি ৩. ইহসান ও ৪. আত্মীয়তা। উপরোক্ত চারটি কারণ মহানবী (সা.)-এর মধ্যে পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান। কাজেই সৃষ্টির মধ্যে তিনিই সর্বাধিক ভালোবাসা পাওয়ার হকদার।

এ ভালোবাসা হবে হৃদয় নিংড়ানো। এর বাস্তবায়ন ঘটবে মহানবী (সা.)-এর অনুসরণ ও অনুকরণের মধ্য দিয়ে। বস্তুত যাবতীয় আমল তথা পোশাক, পানাহার, আচার-অনুষ্ঠান, এক কথায় ব্যক্তিগত জীবন থেকে আরম্ভ করে আন্তর্জাতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মহানবী (সা.)-কে অনুকরণের মধ্যেই নিহিত রয়েছে তাঁর ভালোবাসা ও মহব্বতের প্রকৃষ্ট নিদর্শন। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের কেউ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তার ইচ্ছা ও কামনা আমার নিয়ে আসা আদর্শের পূর্ণ অনুসারী হবে।’ তাঁর ভালোবাসা যেমনিভাবে তাঁর অনুসরণ ছাড়া সম্ভব নয়, তেমনি আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনও মহানবী (সা.)-এর অনুসরণ ও অনুকরণ ছাড়া সম্ভব নয়। আল কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ সুরা আলে ইমরান, আয়াত ৩১। যে ব্যক্তি মহানবী (সা.)-এর আনুগত্য করল সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। মহানবী (সা.)-এর আনুগত্য ছাড়া আল্লাহর আনুগত্য আদৌ সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, ‘কেউ রসুলের আনুগত্য করলে সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল।’ সুরা নিসা, আয়াত ৮০।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
     12
17181920212223
24252627282930
       
22232425262728
2930     
       
  12345
2728     
       
28      
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ