‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ৫৫ বছর ও রাষ্ট্রের দায়

প্রকাশিত: ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৪

‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ৫৫ বছর ও রাষ্ট্রের দায়

‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ৫৫ বছর ও রাষ্ট্রের দায়

 

মুক্তাদীর আহমদ মুক্তা

 

২৩ ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির জন্য একটি স্মরণীয় দিন। ৫৫ বছর আগে ১৯৬৯ সালের এই দিনে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, মুক্তিকামী মানুষের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। যিনি পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতির পিতা হিসেবে আর্বিভূত হয়েছিলেন।

১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে কারাভোগের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে শেখ মুজিবুর রহমান রূপান্তরিত হন মুক্তিকামী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামী নেতায়। তারপর ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা, ১৯৫২’র আন্দোলন সংগ্রাম, ১৯৫৪’ র নির্বাচন, ১৯৫৬ সালে সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন, মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করে অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতায় এক পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের অধিকার আদায়ের সর্বোচ্চ জনপ্রিয় ও একমাত্র নির্ভরযোগ্য নেতায় পরিণত হন তিনি।

১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির সনদ ‘৬ দফা’ ঘোষণা করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে স্বাধিকার আন্দোলন শুরু করায় বাঙালির নন্দিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে নিবৃত্ত করতে পাকিস্তান সরকার একের পর এক মিথ্যা মামলা দেয়। বার বার কারাগারে পাঠায়। তবে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামমুখর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত মামলা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা।

১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার অভিযোগ আনে, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে কয়েকজন রাজনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এবং গুটিকয় সাধারণ সৈনিক সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পূর্ববাংলাকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। এই মিথ্যা মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানসহ মোট ৩৫ জনকে আসামি করা হয়। ৩৫ জন আসামির সবাইকে পাকিস্তানি সরকার গ্রেপ্তার করে। মিথ্যা মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানকে সাজা দেওয়ার পরিকল্পনা টের পেয়ে বাঙালি জাতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং স্বৈরাচারী আইয়ুবের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলে। ছাত্র-জনতার মিছিলে রাজপথ উত্তাল হয়ে ওঠে। গণআন্দোলনে নতিস্বীকার করে আইয়ুব খান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অভিযুক্ত সব আসামিকে মুক্তি প্রদানের ঘোষণা দেন।

১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারাবন্দি থেকে মুক্তি পান। পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুক্তিপাগল বাঙালির স্বপ্নের কাণ্ডারি, ইতোমধ্যে বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে উঠা শেখ মুজিবুর রহমান কে বিশাল গণসংবর্ধনা প্রদান করে।

রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অনুষ্ঠিত ওই গণসংবর্ধনা উপলক্ষে প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষের জনসমাবেশে, সভার সভাপতি, তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভিপি এবং সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক তোফায়েল আহমেদ জনগণের পক্ষে বাঙালির মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান কে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান করেছিলেন। মূলত তারপর থেকেই বাংলার জনগণের কাছে শেখ মুজিবুর রহমান নাম ছাপিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটি ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে।

ঐতিহাসিক ২৩ ফেব্রুয়ারির প্রেক্ষাপট ও প্রেক্ষিত বর্ণনা করে উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানের মহানায়ক হিসেবে পরিচিত,তৎকালীন ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদ তাঁর একাধিক স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডাকসু’ কার্যালয়ে চার ছাত্র সংগঠনের নেতাদের উপস্থিতিতে এক সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ প্লাটফরম ‘সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান তথা আওয়ামী লীগের ৬ দফাকে যুক্ত করে ঐক্যবদ্ধ ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ’৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জমায়েত অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের বটতলায় এবং পূর্ব ঘোষিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হয়।

তিনি তাঁর এক নিবন্ধে উল্লেখ করেন, ’৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি যে আন্দোলন আমরা শুরু করেছিলাম, ২০ জানুয়ারি শহিদ আসাদের রক্তাক্ত জামা হাতে নিয়ে যে শপথ নিয়েছিলাম, ২৪ জানুয়ারি মতিউর -মকবুল – রুস্তম – আলমগীরের রক্তের মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলন সর্বব্যাপী গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করেছিল। ৯ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে শপথ দিবসে স্লোগান দিয়েছিলাম ‘শপথ নিলাম শপথ নিলাম মুজিব তোমায় মুক্ত করবো; শপথ নিলাম শপথ নিলাম মা-গো তোমায় মুক্ত করবো।’ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে ১৫ ফেব্রুয়ারি ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করে সান্ধ্য আইন জারি করা হলে সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে রাজপথে প্রতিবাদ মিছিল করি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহাকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি সেনারা বেয়নেট চার্জে নির্মমভাবে হত্যা করে আবার সান্ধ্য আইন জারি করলে যথারীতি আমরা সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে প্রতিবাদ কর্মসূচি অব্যাহত রাখি। ২০ ফেব্রুয়ারি সমগ্র ঢাকা নগরীকে মশাল আর মিছিলের নগরীতে পরিণত করলে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।

২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে পল্টনের জনসমুদ্রে প্রিয় নেতা শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আটক সবার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম প্রদান করি। সমগ্র দেশ গণবিস্ফোরণে প্রকম্পিত হয়। জনরোষের ভয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান সব রাজবন্দিকে বিনা শর্তে মুক্তি দিলে দেশজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। প্রিয় নেতাকে কারামুক্ত করার মধ্য দিয়ে শপথ দিবসের স্লোগানের প্রথম অংশ ‘মুজিব তোমায় মুক্ত করবো’, এবং ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে হাতিয়ার তুলে নিয়ে যুদ্ধ করে প্রিয় মাতৃভূমিকে হানাদারমুক্ত করে স্লোগানের দ্বিতীয় অংশ ‘মা-গো তোমায় মুক্ত করবো’ বাস্তবায়ন করেছিলাম।

২২ ফেব্রুয়ারি আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিই যে, প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা জানাব। সেই সিদ্ধান্ত অনুসারেই রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টায় সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়।

নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, ২৩ ফেব্রুয়ারি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। সে দিনের রেসকোর্স ময়দান যারা দেখেননি তাদের বলে বোঝানো যাবে না সেই জনসমুদ্রের কথা। আমরা যখন সেখানে পৌঁছেছি, তখন রেসকোর্স ময়দানে মানুষ আর মানুষ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রেন, বাস, ট্রাক, লঞ্চ-স্টিমার বোঝাই হয়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, কৃষক-শ্রমিক, সাধারণ মানুষ ছুটে এসেছে। ঢাকার মানুষ তো আছেই। অভিভূত হয়ে পড়লাম। এর আগে এত বড় জনসভা দেখিনি। সেই জনসমুদ্রে লাখ লাখ লোক এসেছে প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে একনজর দেখতে। প্রিয় নেতাকে নিয়ে আমরা মঞ্চে উঠলাম। সেদিন সেই মঞ্চে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য রেখেছিলেন। চিরাচরিত প্রথা ভঙ্গ করে আগেই সভাপতির ভাষণ দেওয়ার জন্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে লাখ লাখ মানুষকে অনুরোধ জানিয়ে বলেছিলাম, ‘সবার শেষে বক্তৃতা করার কথা থাকলেও আপনাদের অনুমতি নিয়ে আমি আগেই বক্তৃতা করতে চাই।’ লাখ লাখ লোকের সম্মতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আগেই বক্তৃতা করি। সেদিন যে ভালোবাসা মানুষের কাছ থেকে পেয়েছি তা বলে বোঝাতে পারব না। বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করে বলেছিলাম, ‘প্রিয় নেতা তোমার কাছে আমরা ঋণী, বাঙালি জাতি চিরঋণী। এ ঋণ কোনোদিনই শোধ করতে পারব না। সারা জীবন এ ঋণের বোঝা আমাদের বয়ে চলতে হবে। আজ এ ঋণের বোঝাটাকে একটু হালকা করতে চাই জাতির পক্ষ থেকে তোমাকে একটা উপাধি দিয়ে।’ যে নেতা তার জীবনের যৌবন কাটিয়েছেন পাকিস্তানের কারাগারে, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন সেই নেতাকে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হলো। লাখ লাখ লোক তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে এই প্রস্তাব গ্রহণ করে প্রিয় নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে লাখ লাখ কণ্ঠে ধ্বনি তুলেছিল, ‘জয় বঙ্গবন্ধু।’ (২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত নিবন্ধ)

তোফায়েল আহমেদ অপর এক নিবন্ধে উল্লেখ করেন ‘আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সেদিন ১০ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ। সেই জনসমুদ্রের মানুষকে যখন জিজ্ঞাসা করেছিলাম, যে নেতা জীবনের যৌবন কাটিয়েছেন পাকিস্তানের কারাগারে, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, সেই প্রিয় নেতাকে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে একটি উপাধি দিতে চাই। ১০ লাখ মানুষ যখন ২০ লাখ হাত উত্তোলন করেছিল, সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। তখনই প্রিয় নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে এই উপাধি জনপ্রিয় হয়েছে, জাতির জনকের নামের অংশ হয়েছে এবং আজকে তো শুধু ‘বঙ্গবন্ধু’ বললেই সারা বিশ্বের মানুষ এক ডাকে চেনে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ যাকে মহাত্মা উপাধি দিয়েছিলেন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ পৃথিবীর অনেক নেতাই উপাধি পেয়েছেন। কিন্তু ফাঁসির মঞ্চ থেকে মুক্ত হয়ে, গণমানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে, ১০ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে এমন আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে কেউ উপাধি পাননি। সেদিন আমি বক্তৃতার শেষে বলেছিলাম, আমার বক্তৃতা আর দীর্ঘ করতে চাই না। তখন জনসমুদ্র থেকে রব উঠেছিল, আমি যেন বক্তৃতা শেষ না করি। জনসমুদ্রের প্রবল অনুরোধে আবার বক্তৃতা করে যখন পুনরায় শেষ করতে চাইলাম, তখন সভামঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বলো, বলো, বলো’। তারপর বক্তৃতা শেষে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি ঘোষণার পর এই প্রথম নাম ঘোষণা করলাম, এবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন, বাংলার মানুষের নয়নের মণি, পৃথিবীর নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে এই প্রথম ভাষণ দিলেন। সে কী ভাষণ! স্মৃতির পাতায় আজও ভেসে ওঠে। এই ভাষণের শেষেই তিনি বলেছিলেন, ‘আগরতলা মামলার আসামি হিসেবে আমাকে গ্রেপ্তার করে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় গ্রেপ্তার করে যখন ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাবে, তখন বুঝতে পেরেছিলাম যে ওরা আমাকে ফাঁসি দেবে। তখন এক টুকরো মাটি তুলে নিয়ে কপালে মুছে বলেছিলাম, হে মাটি, আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমাকে যদি ওরা ফাঁসি দেয়, মৃত্যুর পরে আমি যেন তোমার কোলে চিরনিদ্রায় শায়িত থাকতে পারি।’ বক্তৃতার শেষে তিনি বলেছিলেন, ‘রক্ত দিয়ে জীবন দিয়ে তোমরা যারা আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছ, যদি কোনো দিন পারি নিজের রক্ত দিয়ে আমি সেই রক্তের ঋণ শোধ করে যাব।’ তিনি একাই রক্ত দেননি, সপরিবারে বাঙালি জাতির রক্তের ঋণ তিনি শোধ করে গেছেন। তিনি চলে গেছেন, রেখে গেছেন তার দুই কন্যা। ’৮১ সালের সম্মেলনে জ্যেষ্ঠ কন্যার হাতে আমরা আওয়ামী লীগের পতাকা তুলে দিয়েছিলাম। স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে ’৮১ সালের ১৭ মে তিনি বাংলার মাটি স্পর্শ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর দুটি স্বপ্ন ছিল। একটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা; যা তিনি সম্পন্ন করেছেন। আরেকটি ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা। সেই কাজটি তারই সুযোগ্য কন্যা দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নিচ্ছেন ‘ (২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত নিবন্ধ)।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী নেতা হয়ে ওঠেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা প্রস্তাব থেকে শুরু করে ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং এরপর সত্তরের নির্বাচন- এসব রাজনৈতিক পরিক্রমার ভেতর দিয়ে শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের একচ্ছত্র নেতা। ওই সময়ে মাত্র পাঁচ বছরে রাজনৈতিক দৃশ্যপট ব্যাপকভাবে বদলে যায়। তখনকার সময় আরও সুপরিচিত রাজনীতিবিদরা থাকলেও তাদের ছাপিয়ে সামনের কাতারে চলে আসেন শেখ মুজিব।

ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবি উত্থাপন শেখ মুজিবকে একেবারে সামনের কাতারে নিয়ে আসে। ছয় দফার মূল বিষয় ছিল পাকিস্তানকে একটি ফেডারেশনে পরিণত করা, যেখানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থাকবে। ছয় দফার মাধ্যমে শেখ মুজিব গ্রাম ও শহরের মানুষকে একত্রিত করতে পেরেছিলেন।

শেখ মুজিবুর রহমান লাহোরে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন ১৯৬৬ সালে ৫ ফেব্রুয়ারি। এর কয়েক মাস পরই মে মাসে তাকে আটক করে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। অভিযোগ ছিল- তিনি ছয় দফার মাধ্যমে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছেন। সেই থেকে প্রায় তিন বছর কারাগারেই কেটেছে শেখ মুজিবের।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি লাখো মানুষের জনসমুদ্রে ‘বঙ্গবন্ধু ‘ উপাধিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ভূষিত করা হলেও ‘ বঙ্গবন্ধু ‘ অভিধাটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন বীর চট্টলার সন্তান, ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক রেজাউল হক চৌধুরী মোস্তাক।

শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু অভিধায় উল্লেখ করার স্মৃতিচারণ করে রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক বলেছিলেন , “১৯৬৭ সালে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ ‘প্রতিধ্বনি’ নামক একটি মাসিক পত্রিকা বের করত। সে পত্রিকার একটি সংখ্যায় আমি ‘সারথী’ ছদ্মনামে ‘আজব দেশ’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ লিখি। লেখাটার শেষ দিকে ‘বঙ্গশার্দূল’ শেখ মুজিবের পাশে প্রথম ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি ব্যবহার করি”। তিনি বলেন, “শেখ মুজিবের নামের সাথে সুনির্দিষ্ট কোনো বিশেষণ তখনও যুক্ত হয়ে ওঠেনি। বিভিন্ন জনবিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন নামকরণ করলেও কোনোটি তেমন স্বীকৃতি লাভ করেনি। শেখ মুজিবুর রহমান তখনও ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে পরিচিত নন। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি মুজিব ভাই সম্বোধনে পরিচিত। ১৯৬৬ সাল থেকে তার নামের আগে তরুণ সমাজ ‘সিংহশার্দূল’, ‘বঙ্গশার্দূল’ ইত্যাদি খেতাব জুড়ে দিতে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিবের নামের সাথে একটি যথাযথ বিশেষণ যুক্ত করার চিন্তা আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। তখন দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের অসারতা উল্লেখ করে আমি একটি নিবন্ধ রচনা করি। চার পৃষ্ঠাব্যাপী এই নিবন্ধে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিকভাবে দুটো পৃথক অঞ্চল হিসেবে পাকিস্তানের দুই অংশের সম্পূর্ণ বিপরীত বৈশিষ্ট্যকে জোরালোভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করি। এই নিবন্ধে গণমানুষের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের নামের সাথে প্রচলিত বিভিন্ন বিশেষণের পাশাপাশি সর্বপ্রথম লিখিত আকারে আমি ‘বঙ্গবন্ধু’ বিশেষণটি ব্যবহার করি।” বলাবাহুল্য, তখন থেকেই শেখ মুজিবের নামের সাথে এতদিনের প্রচলিত ‘মুজিব ভাই’, ‘বঙ্গশার্দূল’, ‘সিংহশার্দূল’ ইত্যাদি বিশেষণকে রীতিমতো প্লাবিত করে ‘বঙ্গবন্ধু’ নামটিই সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ‘বঙ্গবন্ধু’ নামটি পরবর্তীকালে তার নামের সাথে এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে, ‘বঙ্গবন্ধু’ উচ্চারণ করলে আর শেখ মুজিব বলতে হয় না। একইভাবে শেখ মুজিব নাম উচ্চারিত হলেই ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটিও চলে আসে অবলীলায়। আজ শেখ মুজিব মানে ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘বঙ্গবন্ধু’ মানেই শেখ মুজিব। (সমকাল ১৯ মার্চ ২০২১)

বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ৫০ বছর উপলক্ষে ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে দেশটিভির একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূরের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তোফায়েল আহমেদ নিজেই স্বীকার করেছেন বঙ্গবন্ধু উপাধিটি তাঁর আগে এক লেখায় লিখেছিলেন তাঁরই কর্মী ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক।

‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি যেভাবেই প্রথম উচ্চারিত হোক ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারিতে তোফায়েল আহমেদ কর্তৃক উপাধি হিসেবে ঘোষণার পর এটি লাখো জনতার স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন লাভ করে। তারপর থেকেই বঙ্গবন্ধু শব্দটি শেখ মুজিবের পরিপূরক। অবিনাশী চেতনার ধারক ও উজ্জীবক স্লোগানে পরিণত হয়। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে ৭ ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৬ মার্চ স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, ১৭ এপ্রিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম সরকার মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠার পর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় অর্জনে ‘বঙ্গবন্ধু’ আর ‘বাংলাদেশ’ শব্দদুটি যেন পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ‘জয়বাংলা’ স্লোগানের সঙ্গে ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠে বিজয়ী জাতির গর্বিত উচ্চারণের স্ফুরণ।

১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি উপাধি পাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক আবেগঘন বক্তব্য রাখেন। এখানে এর কিছু অংশ উদ্ধৃত করা হলো। তিনি বলেন, “…আমি সরকার পক্ষের সাথে প্রস্তাবিত রাজনৈতিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করে দেশের উভয় অংশের পক্ষ থেকে দেশবাসীর অধিকারের দাবি উত্থাপন করব এবং যদি উত্থাপিত দাবি গ্রাহ্য করা না হয় তবে সে বৈঠক থেকে আমি ফিরে এসে দাবি আদায়ের জন্য দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তুলব…সংগ্রাম করে আমি আবার কারাগারে যাব। কিন্তু মানুষের প্রেম ভালোবাসার ডালি মাথায় নিয়ে দেশবাসীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না। বঞ্চিত বাঙালি, সিন্ধি, পাঞ্জাবি, পাঠান আর বেলুচের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। কায়েমি স্বার্থবাদীদের শোষণ থেকে দেশের উভয় অংশের জনগণের মুক্তির একমাত্র পথ হলো আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক আজাদি। আমি আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন চাই, প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত সার্বভৌম পার্লামেন্ট চাই এবং রাজনীতি, অর্থনীতি, চাকরি-বাকরি অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্ব পর্যায়ে জনসংখ্যার ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব চাই। আমি শ্রমিকের ন্যায্যমূল্য চাই। কৃষকের উৎপন্ন দ্রব্যের উপযুক্ত মূল্য চাই। সাংবাদিকদের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চাই” (ভবেশ রায়, বঙ্গবন্ধুর জীবনকথা, ঢাকা, এশিয়া পাবলিকেশন্স, ১৯৯৬, পৃ. ১৭)।

আমাদের দেশে ঈর্ষাপরায়ণ ও হীনমন্য রাজনীতিকদের ক্ষুদ্রতার কারণে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি স্বাধীনতার ৫২ বছর পরও সর্বজনীন হতে পারলো না। এ ব্যর্থতা রাজনীতির। এ ব্যর্থতা রাষ্ট্রের। কেবল রাজনৈতিক কারণে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতানেত্রীর মুখে শেখ মুজিবুর রহমান বলার আগে সতর্কভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটি উচ্চারিত হয় না। যেন এই রাজনীতিকদের সামনে সবচেয়ে বড় ভীতি ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি। বঙ্গবন্ধুর বিশালত্বকে নতুন প্রজন্মের কাছে সর্বজনীন রূপে উপস্থাপন করতে হবে। খণ্ডিতভাবে নয় পূর্ণাঙ্গ ভাবে বঙ্গবন্ধুকে দলমতের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া প্রয়োজন। জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতার অভিধার সর্বজনীন বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ করা উচিত। দলীয় রাজনীতির বৃত্ত থেকে নয় ‘বঙ্গবন্ধু ‘ শব্দটি উচ্চারিত হোক জাতীয় সম্মান ও আত্মমর্যাদা থেকে।

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
22232425262728
2930     
       
  12345
2728     
       
28      
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ