• সিলেট, রাত ১২:০২, ৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কোরআনের ভাষায়, ঈমানদার ও ঈমানহীনদের চোখে ভূমিকম্প

admin
প্রকাশিত নভেম্বর ২৪, ২০২৫
কোরআনের ভাষায়, ঈমানদার ও ঈমানহীনদের চোখে ভূমিকম্প

Manual7 Ad Code

কোরআনের ভাষায়,
ঈমানদার ও ঈমানহীনদের চোখে ভূমিকম্প

Manual5 Ad Code

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ

 

ভূমিকম্পের সেই আকস্মিক ঘটনা, যা হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়, চোখে এনে দেয় আতঙ্ক এবং মুহূর্তের মধ্যে বহু প্রাণ কেড়ে নেয়—অনেকের চোখে তা শুধু একটি বস্তুবাদী ব্যাখ্যার ঘটনা! তবে এখন ঘটনা শুধু সংখ্যায় নয়, তা যেন হৃদয়ের চোখ দিয়ে দেখা যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের আগে অনেক দৃষ্টান্ত অতিবাহিত হয়ে গেছে। অতএব, পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখো যারা সত্যকে অস্বীকার করেছিল তাদের পরিণতি কী হয়েছিল। এতে মানবজাতির জন্য রয়েছে একটি স্পষ্ট শিক্ষা আর আল্লাহভীরু মানুষদের জন্য রয়েছে দিকনির্দেশনা ও উপদেশ।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৭-১৩৮)

Manual7 Ad Code

কিন্তু গাফেল, অজ্ঞ ও অবিশ্বাসীদের বৈশিষ্ট্য হলো—আল্লাহর নিদর্শন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। তা হোক কোরআনের আয়াত বা মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা কুদরতের স্পষ্ট চিহ্ন—কোনো কিছুই তাদের মনকে নাড়া দেয় না। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় ঘনিয়ে এসেছে, অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে আছে। তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যখনই কোনো নবীন উপদেশ আসে, তারা তা অমনোযোগী অবস্থায় শোনে—তাদের হৃদয় তো অন্যদিকে বিভ্রান্ত থাকে।’
(সুরা : অম্বিয়া, আয়াত : ১৩)

Manual5 Ad Code

যেকোনো ঘটনা, ইতিহাস ও বাস্তবতাকে একমাত্র বস্তুবাদী চোখে দেখা—ইহজাগতিক ধ্যান-ধারণা মানুষের স্বভাবগত বিষয়। আল্লাহ তাদের মানসিকতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আর যদি তারা আকাশের একটি টুকরা পতনশীল অবস্থায় দেখেও, তারা বলবে, ‘এ তো স্রেফ ঘন মেঘ!’ (সুরা : তুর, আয়াত : ৪৪)

একই মনোভাব আমরা দেখি ‘আদ’ জাতির ইতিহাসে। যখন তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসন্ন শাস্তির মেঘ দেখল, তারা সরলভাবে ভাবল—এটা বৃষ্টির মেঘ। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর তারা যখন দেখল যে তা তাদের উপত্যকার দিকে ধেয়ে আসছে, তারা বলল, এ তো এমন একটি মেঘ, যা আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করবে, বরং এটি সেই জিনিস, যার জন্য তোমরা তাড়াহুড়া করলে—এক প্রবল বায়ু, যাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

এটি তার প্রতিপালকের আদেশে সব কিছু ধ্বংস করে দিল, ফলে এমন হলো যে তাদের ঘরবাড়ি ছাড়া আর কিছুই দৃশ্যমান রইল না।’ (সুরা : আহকাফ, আয়াত : ২৪-২৫)

একজন মুমিন কখনো শুধু বস্তুগত কারণের ওপর নির্ভর করে না। সে কারণগুলোর স্রষ্টা, আসমান-জমিনের মালিক আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। যিনি কোনো বিষয়ের ইচ্ছা করলে কেবল বলেন—‘হও’, আর তা হয়ে যায়। মুমিন তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, যাতে নুহ (আ.)-এর পুত্রের মতো ভুল না করে।

নুহ (আ.) যখন তাকে বলেন, ‘হে আমার প্রিয় পুত্র! আমাদের সঙ্গে ওঠে এসো, আর কাফিরদের সঙ্গে থেকো না।’ পুত্র জবাব দিল সম্পূর্ণ বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে—‘আমি এমন এক পর্বতে আশ্রয় নেব, যা আমাকে পানির হাত থেকে রক্ষা করবে।’ তখন নুহ (আ.) বলেন, ‘আজ আল্লাহর আদেশ থেকে কাউকে রক্ষা করার নেই, তিনি যাকে দয়া করেন তাকে ছাড়া। এরপর তাদের মাঝে ঢেউ এসে দাঁড়াল এবং সে ডুবে যাওয়া লোকদের অন্তর্ভুক্ত হলো।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৪৩)

ইহজাগতিক ধ্যান-ধারণা লোকেরা কি ভুলে গেছে—অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলে থাকার ভান করছে যে এই পৃথিবীর ভূত্বক, পর্বত, সাগর—সবই আল্লাহর আদেশেই পরিচালিত? আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করলেন, যখন তা ছিল ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। তিনি আকাশ ও পৃথিবীকে বললেন, ‘চাই স্বেচ্ছায়, চাই অনিচ্ছায়—তোমরা আসো।’ তারা বলল, ‘আমরা স্বেচ্ছায় উপস্থিত হলাম।’

(সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ১১)

তিনি আদেশ করেন আর সৃষ্টিজগৎ বিনা দ্বিধায় অনুসরণ করে। তিনি তাদের ধারণ করে রেখেছেন তাদের নির্ধারিত ভূমিকায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আসমান ও জমিনকে ধরে রেখেছেন, যাতে তারা ভেঙে না পড়ে। আর যদি তারা ভেঙে পড়ত, তবে আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই যে তাদের ধরে রাখতে পারত।’

(সুরা : ফাতির, আয়াত : ৪১)

বিজ্ঞানীরা কী বলেন? তাঁরা বলেন, অপ্রত্যাশিত! কিন্তু আল্লাহর কাছে কিছুই অপ্রত্যাশিত নয়। কেমন যেন আল্লাহ তাআলা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন সেই অত্যাচারীর দিকে, যার নাম ছিল কারুন। আল্লাহ যখন তাকে বিপুল সম্পদ দান করেছিলেন, সে অকৃতজ্ঞ হয়ে বলেছিল, ‘আমি তো এগুলো পেয়েছি আমার নিজ জ্ঞানের কারণে!’ এ ছিল তার অহংকার, তার অজ্ঞতা। ফলে শাস্তি ছিল অনিবার্য—‘অতঃপর আমরা তাকে ও তার গৃহকে ভূগর্ভে ধ্বংস করে দিলাম। আল্লাহ ছাড়া তার কোনো দল তাকে সাহায্য করতে পারেনি এবং সে নিজেও আত্মরক্ষা করতে সক্ষম ছিল না।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৮১)

আজ আমাদের ওপর যা ঘটেছে, যার জন্য ভূমিকম্পবিদরা এখনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা খুঁজে পাননি, তা নিছক আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের কর্ম, আমাদের নৈতিক অবক্ষয় এবং আল্লাহর আইনকে উপহাস করার পরিণতির দিকেই ইঙ্গিত করে—সুদকে বৈধ করা, মদকে সাংস্কৃতিক আড়ালে প্রমোট করা, ইসলামী আইনকে উপহাস করা, আল্লাহর আয়াতের সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা—এসব কি শাস্তিকে আহবান করার মতো কাজ নয়? আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কত শহর ছিল যারা তাদের পালনকর্তা ও তাঁর রাসুলদের আদেশ অমান্য করেছিল। আর আমরা তাদের কঠোর হিসাবের মুখোমুখি করেছি এবং ভয়াবহ শাস্তি দিয়েছি। ফলে তারা তাদের কর্মের মন্দ ফল ভোগ করেছে এবং তাদের পরিণতি হয়েছে সম্পূর্ণ ধ্বংস।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ৮৯)

শাস্তি শুধু জালিমদের ওপর আসে না, এটি সামাজিক পরীক্ষাও বটে! আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা এমন এক ফিতনাকে ভয় করো, যা শুধু তোমাদের মধ্যের জালিমদের ওপরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ২৫)

অতএব, সমাজে যখন পাপ, অন্যায়, অশ্লীলতা, দুর্নীতি, দুরাচার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে, তখন শাস্তি শুধু অপরাধীদের ওপর নয়, বরং পুরো সমাজের ওপর এসে পড়ে।

Manual3 Ad Code

পাপাচার তো পশ্চিমে আরো বেশি, তবু তাদের কিছু হয় না—এই আপত্তির জবাব অনেকে বলে থাকে, ‘আমেরিকা ও ইউরোপের মতো দেশগুলোতে নৈতিক অবক্ষয় আমাদের চেয়ে বহুগুণ বেশি। তবু তাদের তো কিছু হয় না! আমরা বলি, তাদের এই বাহ্যিক সমৃদ্ধিকে শাস্তি থেকে নিরাপত্তা ভেবে নেওয়া মারাত্মক ভুল। আল্লাহ যখন কারো প্রতি ক্রুদ্ধ হন, অনেক সময় তাঁর শাস্তি সঙ্গে সঙ্গে আসে না,

বরং আল্লাহ তাদেরকে অবকাশ দেন, যেন তারা বিভ্রান্তির মধ্যে আরো ডুবে যায় এবং পরিণামে একদিন হঠাৎ করে পাকড়াও করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা যখন যে বিষয় দ্বারা উপদেশপ্রাপ্ত হয়েছিল তা ভুলে গেল, তখন আমরা তাদের জন্য সবকিছুর দরজা খুলে দিলাম। অবশেষে যখন তারা যা পেয়েছিল তাতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল, তখন আমরা হঠাৎ তাদের পাকড়াও করলাম। এবং তখন তারা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে গেল।’ (সুরা: আনআম, আয়াত : ৪৪)

মুমিনদের ক্ষেত্রে আল্লাহর রীতি কিছুটা ভিন্ন। মুমিনদের ওপর যদি বিপদ আসে—তা শাস্তি নয়, বরং শিক্ষা, সতর্কতা ও ফিরে আসার জন্য এক দয়াময় আহবান। মুমিন যদি অবাধ্য হয় বা পাপের পথে চলে—আল্লাহ কখনো কখনো দ্রুত আজাব দেন, যাতে সে জেগে ওঠে, তাওবার দিকে ফিরে আসে এবং সঠিক পথ আঁকড়ে ধরে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষের হাতের কৃতকর্মের কারণে স্থলে ও জলে বিপর্যয় দেখা দেয়, যাতে আল্লাহ তাদেরকে তাদের কাজের কিছু স্বাদ আস্বাদন করান, হয়তো তারা (এতে) ফিরে আসবে।’ (সুরা : রুম, আয়াত : ৪১)

আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) বহু আগেই এসব ঘটনার ব্যাপারে আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন। যারা ভূমিকম্পের মতো বিপর্যয় সম্পর্কে পূর্বাভাস জানতে চান, তাদের উদ্দেশে সহিহ বুখারিতে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন, ‘কিয়ামত আসবে না, যতক্ষণ না জ্ঞান কমে যায়, অজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়ে, ভূমিকম্প বৃদ্ধি পায় এবং সম্পদ প্রচুর পরিমাণে হয়ে যায়, কিন্তু তা কেউ তেমন গুরুত্ব দেয় না।’ (বুখারি, হাদিস : ৭১২১)

অতএব, আল্লাহর দিকে আন্তরিক প্রত্যাবর্তনই আমাদের পার্থিব ক্ষতি থেকে পরিত্রাণ দিতে পারে।

বিডি-প্রতিদিন

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com