কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও বান্দরবানের লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে প্রতিমা আনা হয় সমুদ্রসৈকতে।
বিসর্জনে বিদায়, লাখো মানুষের ঢল
অনলাইন ডেস্ক
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। সিঁদুরে বরণ, ঢাক-ঢোল আর উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান ভক্তরা।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে সৈকতের তীরে প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। ধর্মীয় উৎসব ঘিরে সৈকতজুড়ে তৈরি হয় সম্প্রীতি ও মিলনমেলার আবহ।
কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও বান্দরবানের লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে প্রতিমা আনা হয় সমুদ্রসৈকতে। আয়োজকদের হিসাবে, সৈকতে আড়াই শতাধিক প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি দোলন ধর জানান, এবার ৩৫০টির বেশি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। চকরিয়া ও পেকুয়ার প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় মাতামুহুরী নদীতে।
বিসর্জনকে ঘিরে লাবণী পয়েন্ট থেকে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পর্যটকেরাও এ আয়োজনে অংশ নেন। দুর্গাপূজা ও প্রবারণা পূর্ণিমার ছুটিতে লাবণী, সুগন্ধা, হিমছড়ি ও ইনানীসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ছিল দর্শনার্থীদের ভিড়।
কক্সবাজার হোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত অনেক হোটেলের কক্ষ শতভাগ বুকিং হয়েছে। শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউসে প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার মানুষের রাতযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে।
বিসর্জন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাংলাদেশের ঐতিহ্য। এ সম্প্রীতি অটুট রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। পর্যটন নগরী কক্সবাজারে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করাও সবার দায়িত্ব।
এবার কক্সবাজার জেলায় ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৫টিতে প্রতিমাপূজা এবং ১৬৯টিতে ঘটপূজা হয়। পাঁচ দিনের পূজা শেষে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানিয়ে ভক্তদের প্রার্থনা—অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির বার্তা নিয়ে আগামী বছর আবারও ফিরে আসবেন মা দুর্গা।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় বাড়তি নজরদারি
টানা ছুটিতে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা ছুটে এসেছেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে। ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসনিক তৎপরতা ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সি-সেইফের উদ্ধারকর্মী মো. সেলিম উদ্দীন বলেন, সাগরে নামার সময় পর্যটকদের সতর্ক থাকতে হবে। লাইফগার্ডদের নির্দেশনা মেনে নির্ধারিত এলাকায় গোসল করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ অহিদুর রহমান জানান, পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সমুদ্রসৈকতসহ জেলার বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশের সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
উৎসবের আমেজে প্রাণবন্ত সৈকত
টানা ছুটিতে কক্সবাজারে এসে সৈকতে কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলছেন, আবার কেউ উপভোগ করছেন সমুদ্রের ঢেউ। উৎসবের আমেজ আর ছুটির আনন্দে সৈকতজুড়ে তৈরি হয়েছে প্রাণবন্ত পরিবেশ।
পরিবার নিয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেখতে কক্সবাজারে এসেছেন নিতাই রায়। তিনি বলেন, কক্সবাজার তাঁর পছন্দের জায়গা। দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন এখানে হয় বলেই উৎসব উপভোগের পাশাপাশি ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা করেছেন। আবহাওয়াসহ সার্বিক পরিবেশও তাঁর বেশ ভালো লেগেছে।
বেলা আড়াইটার দিকে সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিসর্জন অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর অতিথিরা শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন। বক্তারা কক্সবাজারের অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য তুলে ধরেন। তাঁদের মতে, দুর্গাপূজাকে ঘিরে কক্সবাজারে যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়, তা দেশের অন্য কোথাও সচরাচর দেখা যায় না।
বিকেল ৩টার পর থেকে বিভিন্ন মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জন মঞ্চে আসতে শুরু করে। ট্রাকে রং ছিটিয়ে ও বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে প্রতিমার বহর নিয়ে সৈকতে আসেন ভক্তরা। বক্তব্য পর্ব শেষে বিকেল ৫টার দিকে সমুদ্রের নোনাজলে প্রতিমা বিসর্জন শুরু হয়। একে একে প্রতিমা বিসর্জনের সময় ভক্তদের মধ্যে কান্না, আনন্দ ও আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে গিয়ে কেউ কেঁদেছেন, আবার কেউ মেতেছেন উৎসবের আনন্দে।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের আয়োজনে অনুষ্ঠানে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছাড়াও জেলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। এ ছাড়া বক্তব্য দেন কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য শামীম আরা স্বপ্না, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান, পুলিশ সুপার সাজেদুল ইসলাম, ট্যুরিস্ট পুলিশের পুলিশ সুপার নিশাদ এঞ্জেলা এবং হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি দোলন ধর।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু।
বিডি-প্রতিদিন/