• সিলেট, রাত ১১:০৫, ২৭শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সদকাতুল ফিতরের প্রয়োজনীয় মাসআলা

admin
প্রকাশিত মার্চ ১৪, ২০২৬
সদকাতুল ফিতরের প্রয়োজনীয় মাসআলা

Manual4 Ad Code

সদকাতুল ফিতরের প্রয়োজনীয় মাসআলা

জাওয়াদ তাহের

 

ইসলামে ‘সদকাতুল ফিতর’ একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত। মাহে রমজানের সিয়াম সাধনা শেষে ঈদুল ফিতরের আনন্দ যেন সমাজের সর্বস্তরের মানুষ, বিশেষ করে অভাবী ও দুস্থরা সমানভাবে উপভোগ করতে পারে, সে জন্যই আল্লাহ তাআলা এই সদকা ওয়াজিব করেছেন। এটি শুধু দরিদ্রের প্রতি করুণা নয়, বরং রোজাদারের রোজার ত্রুটিবিচ্যুতির পরিমার্জক এবং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম।

প্রবাসীদের ফিতরা আদায়ের নিয়ম

বর্তমানে অনেক প্রবাসী বিদেশে অবস্থান করে স্বদেশে ফিতরা আদায় করতে চান।

এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা হলো ফিতরা আদায়কারী ব্যক্তি যেখানে অবস্থান করবেন, সেখানকার দ্রব্য মূল্যই হিসাব করতে হবে। অর্থাৎ একজন প্রবাসী যদি সৌদি আরবে থাকেন এবং বাংলাদেশে তাঁর ফিতরা আদায় করতে চান, তবে তাঁকে সৌদি আরবের সর্বনিম্ন ফিতরার হার অনুযায়ী টাকা পাঠাতে হবে। বাংলাদেশের সর্বনিম্ন হার (যেমন ১০০ টাকা) দিলে তাঁর ফিতরা আদায় হবে না—যদি সৌদিতে তার হার বেশি (যেমন ২০০ টাকা) হয়।
অনুরূপভাবে প্রবাসীর নাবালেগ সন্তানদের ফিতরা আদায়ের দায়িত্ব পিতার ওপর, তাই তাদের ফিতরাও পিতার অবস্থানস্থলের মূল্য অনুযায়ী হবে।

তবে প্রবাসীর স্ত্রী ও বালেগ সন্তানরা যদি দেশে থাকেন, তবে তাঁদের ফিতরা দেশের বাজারমূল্য অনুযায়ী আদায় করা যাবে, কারণ তাঁদের ফিতরা মূলত তাঁদের নিজেদের ওপরই আবশ্যক। (আল-বাহরুর রায়েক : ২/৩৫৫)

Manual7 Ad Code

চাল দিয়ে ফিতরা আদায়ের সঠিক পদ্ধতি

আমাদের দেশে চাল প্রধান খাদ্য হওয়ায় অনেকে চাল দিয়ে সরাসরি ফিতরা দিতে চান। কিন্তু হাদিস শরিফে সরাসরি চালের কথা উল্লেখ নেই। নবী করিম (সা.) পাঁচটি দ্রব্যের কথা উল্লেখ করেছেন : গম, যব, খেজুর, কিশমিশ ও পনির।

Manual6 Ad Code

যব, খেজুর, পনির ও কিশমিশ দ্বারা আদায় করলে এক ‘সা’ (৩২৭০.৬০ গ্রাম) এবং গম দ্বারা আদায় করলে আধা ‘সা’ (১৬৩৫.৩১৫ গ্রাম) দিতে হবে। কেউ যদি চাল দিতে চান, তবে তাঁকে এই পাঁচটির যেকোনো একটির মূল্যের সমপরিমাণ চাল দিতে হবে। সরাসরি এক সা’ বা আধা সা’ চাল দিলে ফিতরা সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে আদায় হবে না। (কিফায়াতুল মুফতি : ৪/৩১২)

মূল্য দ্বারা ফিতরা আদায়ের বৈধতা

অনেকে মনে করেন খাদ্যদ্রব্য ছাড়া টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করা জায়েজ নেই। অথচ সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈদের আমল দ্বারা এটি প্রমাণিত।

Manual1 Ad Code

বিশিষ্ট তাবেঈ আবু ইসহাক আস সাবিয়ি (রহ.) বলেন, আমি সাহাবায়ে কেরামকে খাবারের সমমূল্যের দিরহাম দিয়ে ফিতরা দিতে দেখেছি। খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) পত্রে লিখেছিলেন আধা সা’ গম বা তার সমমূল্য আধা দিরহাম আদায় করতে। বর্তমান যুগে দরিদ্রদের প্রয়োজন পূরণে টাকার উপযোগিতা বেশি হওয়ায় ফকিহরা একে উত্তম বলেছেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা : ১০৩১৭; আদ্দুররুল মুখতার : ২/৩৬৬)

সামর্থ্য অনুযায়ী ফিতরার হার নির্বাচন

আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে সবাই শুধু গমের সর্বনিম্ন হার অনুযায়ী ফিতরা আদায় করেন। প্রকৃত পক্ষে যার সামর্থ্য আছে তার উচিত কিশমিশ, খেজুর বা পনিরের মূল্য অনুযায়ী ফিতরা দেওয়া। ঢালাওভাবে সামর্থ্যবানদের শুধু গমের মূল্যে ফিতরা দেওয়া সমীচীন নয়। নিজের আর্থিক অবস্থা অনুযায়ী দামি দ্রব্যের হিসাব ধরাটাই তাকওয়ার পরিচয়।

Manual8 Ad Code

জাকাত ও ফিতরার নিসাবের পার্থক্য

অনেকে মনে করেন যার ওপর জাকাত ফরজ নয়, তার ওপর ফিতরাও নেই। এটি ভুল। জাকাত শুধু সোনা-রুপা, নগদ টাকা ও ব্যবসার মালের ওপর হয়। কিন্তু সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হয় প্রয়োজন অতিরিক্ত সব ধরনের সম্পদের ওপর (যেমন : অতিরিক্ত জমি, আসবাব, ঘরবাড়ি)। ঈদের দিন সকালে যার কাছে এই পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব। তেমনিভাবে জাকাত দিতে পারেন না এমন ব্যক্তিও যদি নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হন, তবে তাঁকে ফিতরা নিতে দেওয়া যাবে না। (আদ্দুররুল মুখতার : ২/৩৬০)

আদায়ের সময় ও বণ্টন পদ্ধতি

সদকাতুল ফিতর আদায়ের সর্বোত্তম সময় হলো ঈদের দিন ঈদগাহে যাওয়ার আগে। তবে রমজানের শেষ দশকে বা দু-তিন দিন আগেও আদায় করা যায়, যেন দরিদ্ররা কেনাকাটা করতে পারে। যদি কেউ ঈদের নামাজের আগে দিতে না পারেন, তবে পরে হলেও তা আদায় করতে হবে, কারণ এটি একটি ওয়াজিব হক। (বুখারি, হাদিস : ১৫০৯; আবু দাউদ, হাদিস : ১৬০৬)

ফিতরা কাদের দেওয়া যাবে ও যাবে না?

ফিতরা পাওয়ার হকদার শুধু অভাবী মুসলমান। আত্মীয়দের মধ্যে যারা অভাবী (যেমন—ভাই, বোন, চাচা, ফুফু) তাদের দেওয়া সবচেয়ে উত্তম, এতে সদকা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক, উভয় সওয়াব পাওয়া যায়। অমুসলিমদের ফিতরা দেওয়া জায়েজ নয়। নিজের ঊর্ধ্বতন (পিতা-মাতা, দাদা-দাদি) এবং নিজের অধস্তন (ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি) এবং স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে ফিতরা দেওয়া বৈধ নয়।

বাড়ির কাজের লোক যদি অভাবী হয়, তবে তাকে ফিতরা দেওয়া যাবে, তবে শর্ত হলো এটি তার পারিশ্রমিক বা বোনাস হিসেবে দেওয়া যাবে না। ফিতরা দিতে হবে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে। এ ছাড়া মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ, রাস্তাঘাট বা জনকল্যাণমূলক কাজে ফিতরা ব্যয় করলে ফিতরা আদায় হবে না। কারণ ফিতরার টাকা সরাসরি গরিবের মালিকানায় পৌঁছানো জরুরি। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ৬৯৪৭; রদ্দুল মুহতার : ২/২৫৮)

রোজা না রাখলে ফিতরার বিধান

কেউ কেউ মনে করেন কোনো কারণে রোজা রাখতে না পারলে ফিতরা দিতে হয় না। এটি ভুল। সদকাতুল ফিতর একটি স্বতন্ত্র ইবাদত। রোজা রাখা বা না রাখার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। যদি কেউ অসুস্থতা বা অন্য কোনো ওজরে রোজা রাখতে না পারেন, কিন্তু তিনি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তবে তাঁকে অবশ্যই ফিতরা আদায় করতে হবে।

আদায়ের সময় ও বিলম্বের হুকুম

ঈদের দিন ঈদগাহে যাওয়ার আগেই ফিতরা আদায় করা মুস্তাহাব। তবে রমজানের শেষ দিকে বা দু-তিন দিন আগেও আদায় করা উত্তম, যেন দরিদ্ররা ঈদের কেনাকাটা করতে পারে। যদি কেউ ঈদের নামাজের আগে দিতে না পারেন, তবে তাঁকে পরে অবশ্যই আদায় করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যথাসময়ে আদায় না করার কারণে হাদিসে বর্ণিত বিশেষ সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে নামাজের আগে আদায় করবে তা মাকবুল সদকা, আর যে নামাজের পর দেবে তা সাধারণ সদকা।’

(বুখারি, হাদিস : ১৫০৯; আবু দাউদ, হাদিস : ১৬০৯)

একজনের ফিতরা কয়েকজনকে দেওয়া

সদকাতুল ফিতর বণ্টনের ক্ষেত্রে শরিয়তে শিথিলতা রয়েছে। একটি ফিতরা একাধিক দরিদ্র ব্যক্তিকে ভাগ করে দেওয়া জায়েজ। উদাহরণস্বরূপ, একজনের ফিতরার টাকা ১০০ টাকা হলে তা ২০-৩০ টাকা করে তিন-চারজনকেও দেওয়া যাবে। তবে একটি পূর্ণ ফিতরা একজন দরিদ্রকে দেওয়া উত্তম। একইভাবে কয়েকজনের ফিতরা একত্র করে একজন দরিদ্রকেও দেওয়া বৈধ। (বাদায়েউস

সানায়ে : ২/২-৮; আল-বাহরুর রায়েক : ২/২৫৫)

আধুনিক মাধ্যমে (বিকাশ/নগদ) ফিতরা প্রেরণ

বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে ফিতরা পাঠালে ‘ক্যাশ আউট’ চার্জ দাতা নিজেকেই বহন করতে হবে। কারণ ফিতরার পুরো টাকা গরিবের হাতে পৌঁছানো শর্ত। চার্জ বাবদ টাকা কেটে রাখা হলে ওই পরিমাণ ফিতরা আদায় হবে না। একইভাবে ফিতরার খাদ্যদ্রব্য পাঠাতে পরিবহন ভাড়া বা শ্রমিকের মজুরি দাতার নিজস্ব সম্পদ থেকে দিতে হবে, ফিতরার টাকা থেকে নয়। (ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ : ৬/২১৭)

সদকাতুল ফিতর আমাদের ইবাদতের ত্রুটি মোচন করে এবং সমাজের অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটায়। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত সঠিক মাসআলা জেনে বিশুদ্ধ নিয়তে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোত্তম মানের দ্রব্যমূল্য হিসাব করে এই ওয়াজিব ইবাদতটি পালন করা।

 

বিডি প্রতিদিন

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com