• সিলেট, সকাল ৭:৫৭, ৩রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আল্লাহতায়ালা বলেন,

admin
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬
আল্লাহতায়ালা বলেন,

Manual4 Ad Code

ডিজিটাল ফিতনার বিস্তার ও ইসলামের প্রতিকার

রফিকুল ইসলাম আল মাদানী

 

বর্তমানে আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে একটি মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ মুহূর্তেই একজন মানুষকে বিশ্বব্যাপী তথ্য প্রচারের সক্ষমতা দেয়। তথ্যপ্রযুক্তির এই বিপ্লব মানবকল্যাণে অসামান্য অবদান রাখলেও এর অপব্যবহার নতুন ধরনের এক সামাজিক ও নৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে। অমূলক ধারণা, গোপনীয়তা অনুসন্ধান, গুজব, অপপ্রচার, অপবাদ, চরিত্রহনন, ভুয়া স্ক্রিনশট, ডিপফেক (উববঢ়ভধশব), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও) দিয়ে তৈরি মিথ্যা ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বর- এসবের মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান এমনকি রাষ্ট্রকেও বিভ্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। শান্তির ধর্ম ইসলামের বিচারে এগুলো কেবল অনৈতিক কাজ নয়; বরং বহু ক্ষেত্রে মহাপাপ, ফিতনা এবং ইহ ও পরকালে কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

Manual4 Ad Code

কোরআন মানুষের চিন্তা ও তথ্য গ্রহণের নৈতিকতা দিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা অধিক ধারণা থেকে বিরত থাক; নিশ্চয় কিছু ধারণা পাপ। তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং কেউ কারও গিবত করো না।’ (সুরা আল-হুজুরাত : ১২)। এই একটি আয়াতেই ডিজিটাল যুগের বহু অপরাধের বাস্তব সমাধান বর্ণিত হয়েছে। কারণ অমূলক ধারণা থেকেই সন্দেহ জন্মায়। সন্দেহ মানুষকে অন্যের ব্যক্তিগত তথ্য অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় গুজব, অপবাদ ও চরিত্রহনন। তাই এসবই নিষিদ্ধ অপকর্ম। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি, ভিডিও বা বক্তব্যের প্রকৃত প্রেক্ষাপট না জেনেই অনেক সময় মানুষ মন্তব্য করে, বিচার করে এবং অন্যদেরও বিভ্রান্ত করে। অনেক সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এমন ভিডিও বা কণ্ঠস্বর তৈরি করা হয়, যা বাস্তব বলে মনে হয়। ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির মুখ বা কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করা এখন আর কল্পনার বিষয় নয়; এটি বাস্তব এবং দ্রুত সংক্রমিত একটি চ্যালেঞ্জ। একইভাবে ভুয়া স্ক্রিনশট, সম্পাদিত ছবি, বিকৃত অডিও কিংবা প্রসঙ্গবিচ্ছিন্ন ভিডিও ব্যবহার করে মানুষের সম্মান নষ্ট করা হচ্ছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলো প্রতারণা, মিথ্যা সাক্ষ্য এবং অপবাদের সমপর্যায়ভুক্ত।

Manual4 Ad Code

আল্লাহ আরও বলেন, ‘যদি কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও; অন্যথায় অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে পরে অনুতপ্ত হবে।’ (সুরা আল-হুজুরাত : ৬)। এই আয়াত তথ্য যাচাইয়ের এমন একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে, যা আজকের ভাষায় ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’-এর ভিত্তি। কোনো তথ্য, ছবি, ভিডিও বা অডিও যাচাই ছাড়া প্রচার ও বিশ্বাস করা একজন মুসলিমের জন্য বৈধ নয়। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শোনে তাই প্রচার করে।’ (সহিহ মুসলিম)। বর্তমান সময়ে এই হাদিসের তাৎপর্য আরও গভীর। একটি ‘শেয়ার’, ‘ফরোয়ার্ড’ কিংবা ‘রিপোস্ট’ কখনো কখনো হাজারো মানুষের কাছে মিথ্যা পৌঁছে দেয়। তাই ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারিত প্রতিটি তথ্যের দায় থেকে কেউ মুক্ত নয়। ডিজিটাল অপপ্রচারের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো চরিত্রহনন। ব্যক্তি, আলেম, শিক্ষক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ কিংবা সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে অনেক ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা চালিয়ে সামাজিক মর্যাদা ধ্বংস করা হচ্ছে। আল্লাহ বলেন, ‘যারা মুমিন পুরুষ ও নারীদের প্রতি এমন অপরাধের অপবাদ দেয় যা তারা করেনি, তারা ভয়ংকর অপবাদ ও সুস্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আল-আহযাব : ৫৮)। উল্লেখ্য, সুরা আন-নুরে ‘ইফক’-এর ঘটনা বা অপপ্রচারসম্পর্কিত আয়াতগুলো আমাদের শিক্ষা দেয় যে একটি মিথ্যা অপবাদ পুরো সমাজকে অস্থির করে দিতে পারে। তাই প্রমাণ ছাড়া কোনো অভিযোগ গ্রহণ বা প্রচার করা ইসলামি নৈতিকতার পরিপন্থি।

Manual3 Ad Code

এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ট্রেন্ড’ তৈরির নামে বিদ্বেষ ছড়ানো, ক্লিকবেইট শিরোনাম ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা, ভুয়া পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে অপপ্রচার চালানো কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি করা, নতুন ধরনের ডিজিটাল ফিতনায় পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তি নিজে ভালো বা মন্দ নয়; বরং এর ব্যবহারই তাকে কল্যাণ কিংবা অকল্যাণের মাধ্যম বানায়। এসবের জন্য এই জগতের আদালতে বিচারের সম্মুখীন না হলেও আল্লাহর আদালতে একদিন দাঁড়াতেই হবে। সেদিনটি হবে বড়ই কঠিন। তাই প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক দায়িত্ববোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অতএব ডিজিটাল যুগে প্রতিটি পোস্ট, মন্তব্য, শেয়ার ও ফরোয়ার্ড কেবল প্রযুক্তিগত কাজ নয়; বরং আল্লাহর কাছে জবাবদিহিমূলক একটি আমানত। কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করে যদি আমরা তথ্য যাচাই, সত্যনিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতা এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারি, তবে ডিজিটাল ফিতনা, গুজব, অপপ্রচার ও চরিত্রহননের বর্তমান সংকট অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। প্রযুক্তি তখন বিভাজনের অস্ত্র নয়, সত্য, ন্যায় ও মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠার কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠবে।

♦ লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা

 

বিডি প্রতিদিন

Manual7 Ad Code

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com