সন্তানের প্রতি আমাদের দায়
শায়খ আহমাদুল্লাহ
পৃথিবীতে আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সন্তান। আর এই সময়ে সন্তান লালন পালন সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজগুলোর একটি। কারণ আমরা এমন একসময়ে বাস করছি, যা সর্বগ্রাসী অবক্ষয়ের যুগ। চারপাশের এই অবক্ষয় খুব সহজেই আমাদের সন্তানদের প্রভাবিত করছে এবং তাদের বিপথগামী করে তুলছে।
সম্প্রতি অপ্রতিম হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের সামনে আবারও কিশোর অপরাধের ভয়াবহ বাস্তবতা আলোচনায় এসেছে। যদিও কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, মাদক, মারামারি, ইভ টিজিং, অনলাইন আসক্তিসহ বিভিন্ন ধরনের ভয়াবহ অপরাধে কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার খবর প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে।
কিন্তু এ নিয়ে আমাদের মধ্যে যথেষ্ট সচেতনতা বোধ নেই। অথচ শিশু-কিশোরের জন্য নিরাপদ ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা পরিবার ও সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি। একজন কিশোর এক দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই বিপথগামী হয়ে যায় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়া। পরিবেশ, পরিবারের অমনোযোগ, ভুল বন্ধুত্ব, অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা, আবার কখনো সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের দূরত্ব-এমন বহুবিধ কারণে ধীরে ধীরে একটি কিশোরের সংবেদনশীলতা কমতে থাকে। অন্যায়কে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে এবং তাতে সে মজাও পেতে থাকে। এভাবে একসময় যে কাজটি দেখে সে ভয় পেত, সেটিই তার কাছে সাহসিকতা মনে হয়।
তাই কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু অপরাধী কিশোরকে গ্রেফতার করা কিংবা শাস্তি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। অপরাধী তৈরি হওয়ার আগেই আমাদের সন্তানদের আগলে রাখতে হবে। আর সেই দায়িত্বের সবচেয়ে বড় জায়গা পরিবার। কিন্তু এই দায়িত্ব পালনে আমরা যথেষ্ট অমনোযোগী।
ব্যবসাবাণিজ্য, চাকরি কিংবা ক্যারিয়ার গড়ার পেছনে আমরা প্রচুর সময়, মনোযোগ, অর্থ ও মেধা বিনিয়োগ করি। কিন্তু দিনের একটি সামান্য সময়ও অনেক বাবা-মা সন্তানকে দেন না। অথচ পৃথিবীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলা। একজন সু-সন্তান ইহকালের শান্তির উৎস তো বটেই, পরকালের অনন্ত জীবনেরও সদকায়ে জারিয়ারও মাধ্যম। তাই বলা যায়, একজন পিতা-মাতার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রজেক্টই হলো তার সন্তান। প্রত্যেক পিতা-মাতার উচিত সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া এবং তার চলাফেরা, বন্ধুত্ব ও মানসিক অবস্থার খোঁজ রাখা।
অনেক বাবা-মা ভাবেন, সন্তানকে একটা ভালো স্কুল-কলেজ বা নামিদামি মাদ্রাসায় ভর্তি করে মোটা অঙ্কের ফি পরিশোধ করলেই সে ভালো মানুষ হয়ে উঠবে। আজকাল অনেক বাবা-মা এভাবেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ মনে করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অভিভাবকের প্রত্যক্ষ সময়, ভালোবাসা ও তদারকি ছাড়া কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে কোনো সন্তানকে কাক্সিক্ষত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক সন্তান ইসলামের স্বভাবের ওপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার মা-বাবাই তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান কিংবা অগ্নি-উপাসক বানায় (বুখারি)।’
সন্তানের বন্ধুবান্ধব, মেলামেশা, সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটি বাবা-মায়ের বিশেষভাবে নজরে রাখা জরুরি। কারণ কৈশোর এমন একটি সময়, যখন বন্ধুদের প্রভাব খুব গভীরভাবে পড়ে। সন্তান ঘরে বাবা-মায়ের কথা যতটুকু না শোনে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় বন্ধুদের কথাকে। তাই সন্তান কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে-এসবের খোঁজ রাখা অভিভাবকের দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রসুল (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর আদর্শের ওপর থাকে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ্য করে, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে’ (তিরমিজি, ২৩৭৮)। আর পৃথিবীতে একজন সু-সন্তান গড়ে রেখে যেতে পারা হলো বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। কারণ মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই পার্থিব জীবনের সমস্ত সম্পদ ও সাফল্য শেষ হয়ে যায়, কিন্তু সন্তানের দোয়া ও আমল পিতা-মাতার কবরেও পৌঁছাতে থাকে।
আল্লাহর রসুল (সা.) বলেছেন, মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়; কেবল তিনটি মাধ্যম ব্যতীত-১. সদকায়ে জারিয়া, ২. এমন জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়, এবং ৩. এমন সৎ সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে (মুসলিম)।’ তাই সন্তানকে দীনদার, মুত্তাকি ও চরিত্রবান করে রেখে যাওয়া হলো পরকালের সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও সফল বিনিয়োগ। সুতরাং সন্তান লালনপালন কেবল একটি পারিবারিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি ইবাদত এবং জীবনের সবচেয়ে বড় মিশন। ঘরবাড়ি ও ক্যারিয়ারের পেছনে আমরা যে মনোযোগ ও মেধা ব্যয় করি, তার চেয়ে বহু গুণ বেশি মনোযোগ ও সময় সন্তানের পেছনে দেওয়া প্রয়োজন। যদি আমরা সন্তানকে একজন খাঁটি মুমিন, দেশপ্রেমিক ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, তবেই আমাদের জীবন সার্থক হবে।
জুমার মিম্বর থেকে
♦ গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম
বিডি প্রতিদিন