• সিলেট, রাত ৩:৫৪, ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

নতুন বছর ও সময়ের জবাবদিহি

admin
প্রকাশিত জানুয়ারি ২, ২০২৬
নতুন বছর ও সময়ের জবাবদিহি

Manual3 Ad Code

নতুন বছর ও সময়ের জবাবদিহি

আসআদ শাহীন

 

Manual7 Ad Code

সময় এমন এক নীরব স্রোত, যা থামে না, ফিরে তাকায় না, কাউকে সুযোগ দিয়ে অপেক্ষা করে না। জানুয়ারি এলেই মানুষ ঘোষণা দেয়—পুরনো বছর বিদায় নিয়েছে, নতুন বছর এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বছর কি সত্যিই নতুন হয়, নাকি পুরনোই থাকে—শুধু আমাদের বয়স, আমল আর দায়বদ্ধতার খাতায় আরো একটি পৃষ্ঠা যোগ হয়?

প্রথম জানুয়ারি—বিশ্বজুড়ে এক উৎসবের দিন। আতশবাজি, আলোকসজ্জা, নাচ-গান, মদপান, উন্মত্ততা আর লাগামহীন ভোগের নামে এই দিনটি পালিত হয়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব উদযাপনে ধর্মীয় চেতনা, মানবিক দায়িত্ব কিংবা সমাজকল্যাণের কোনো স্থান নেই। বরং পাপাচার, অশ্লীলতা ও অবাধ্যতার এক নগ্ন প্রদর্শনীই সেখানে প্রধান হয়ে ওঠে।
যদি আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তবে দেখব : এই ধরনের আনন্দে মত্ত মানুষ মূলত সময়ের প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে উদাসীন। তারা জীবনের আসল উদ্দেশ্য থেকে বহু দূরে সরে গেছে।

অথচ ইসলামে সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি নিঃশ্বাস—অমূল্য এক আমানত। সময় এমন এক মূলধন, যার ওপর ভিত্তি করেই আখিরাতে মানুষের চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ হবে।
এই দুনিয়ায় যে ব্যক্তি তার সময়কে কল্যাণের পথে ব্যয় করবে, আখিরাতে তার ফলও হবে কল্যাণময়।

আর যে ব্যক্তি সময়কে গুনাহ, অবহেলা ও উদাসীনতায় নষ্ট করবে, তার পরিণতিও হবে ভয়াবহ। দুনিয়া মূলত এক পরীক্ষাগার, সময় তার প্রশ্নপত্র আর আমল তার উত্তরপত্র।

মুমিন ও কাফিরের জীবনের মধ্যে মূল পার্থক্য এখানেই। কাফির এই দুনিয়াকে ভোগবিলাস, খাওয়া-পরা আর আত্মতৃপ্তির ক্ষেত্র হিসেবে দেখে। সে জীবনকে ব্যয় করে আরাম ও প্রবৃত্তির পেছনে ছুটে।

এর পরিণতিতে আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারণ করেন। পক্ষান্তরে মুমিন দুনিয়াকে আখিরাতের প্রস্তুতির ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে। আল্লাহর ভয়, জাহান্নামের আশঙ্কা ও জান্নাতের প্রত্যাশা তাকে কুফর ও গুনাহ থেকে বিরত রাখে এবং ঈমান ও সৎকর্মের পথে পরিচালিত করে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, আল্লাহ তাদের এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার নিচ দিয়ে ঝরনাধারা প্রবাহিত হবে। আর যারা কুফর করেছে, তারা দুনিয়ায় ভোগ করছে এবং চতুষ্পদ জন্তুর মতো খাচ্ছে; আর জাহান্নামই হবে তাদের আবাস।’ (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ১২)

Manual8 Ad Code

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সেই গভীর তাৎপর্যপূর্ণ উক্তিটি স্মরণযোগ্য, যা ইমাম ইবনে মুবারক (রহ.) তাঁর ‘আজ-জুহদ ওয়াল রাকায়েক’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘মানুষের ওপর এমন এক যুগ আসবে, যখন মানুষের প্রধান চিন্তা হবে পেট ভরানো, আর তার প্রবৃত্তিই হবে তার দ্বিন।’

আজ মুসলিম সমাজের দিকে তাকালে দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে স্বীকার করতে হয়, আমরা ঠিক সে যুগেই এসে পৌঁছেছি। আমাদের জীবনে সেই ঈমানি চরিত্র আর দৃঢ়তা খুব কমই পরিলক্ষিত হয়, যা আল্লাহ কোরআনে মুমিনদের জন্য বর্ণনা করেছেন। একদিকে হালাল-হারামের তোয়াক্কা না করে শুধু পেট ভরানোই হয়ে উঠেছে জীবনের লক্ষ্য; অন্যদিকে দুনিয়াপূজা, নফসপূজা, কবরপূজা, ব্যক্তিপূজা এবং বিদআত ও ভ্রান্তিকে দ্বিনের নামে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হচ্ছে।

দুনিয়াপ্রীতি আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য থেকে এতটাই বিচ্যুত করে ফেলেছে যে মাস ও বছর কী অদ্ভুত দ্রুততায় গড়িয়ে যাচ্ছে—সে বিষয়ে আমাদের অনুভূতি ও সচেতনতা ক্রমেই লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আজ মনে হয়, বছর শেষ হয়ে গেল, কিন্তু কবে গেল, কিভাবে গেল তার কোনো স্পষ্ট হিসাব আমাদের কাছে নেই। এই অনুভূতিহীনতা শুধু মানসিক অবস্থা নয়; বরং তা কিয়ামতের এক গুরুত্বপূর্ণ আলামত। রাসুলুল্লাহ (সা.) সুস্পষ্টভাবে এ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘কিয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত কায়েম হবে না, যতক্ষণ না সময় সংকুচিত হয়ে যাবে। তখন এক বছর একটি মাসের মতো হয়ে যাবে, একটি মাস একটি সপ্তাহের মতো, একটি সপ্তাহ একটি দিনের মতো, একটি দিন একটি ঘণ্টার মতো আর একটি ঘণ্টা আগুন থেকে ছিটকে পড়া এক চিংড়ির মতো হয়ে যাবে।’ (সহিহ তিরমিজি, হাদিস : ২৩৩২)

সময় সংকুচিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে ঘড়ির কাঁটা দ্রুত চলবে বা সূর্য-চন্দ্রের গতি বদলে যাবে; বরং এর প্রকৃত তাৎপর্য হলো, সময়ের বরকত ও কল্যাণ ক্রমে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। মানুষের জীবন হবে ক্ষতিগ্রস্ত ও শূন্যতায় ভরা। আরো একটি গভীর অর্থ হলো, মানুষ দুনিয়ার মোহে এমনভাবে ডুবে যাবে যে দিন-রাত, মাস-বছর কিভাবে কেটে যাচ্ছে, তার কোনো অনুভবই আর থাকবে না।

Manual8 Ad Code

আজকের বাস্তবতা এই হাদিসের এক জীবন্ত ব্যাখ্যা। আমাদের হাতে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন এসেছে, যা একদিকে জ্ঞান ও যোগাযোগের অসাধারণ মাধ্যম, অন্যদিকে সময় নষ্টের সবচেয়ে নীরব ও ভয়াবহ হাতিয়ার। রাত হোক কিংবা দিন—একবার মোবাইল হাতে নিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কিভাবে কেটে যায়, তার কোনো হিসাব থাকে না। চোখের পলকে সময় ফুরিয়ে যায়, অথচ আত্মা থাকে শূন্য।

একইভাবে বিশ্বব্যাপী ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, টেস্ট সিরিজ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি খেলাধুলা—যেগুলো মাসের পর মাসজুড়ে চলে—শুধু খেলোয়াড়দের নয়, দর্শক, শ্রোতা ও আয়োজকদেরও জীবনের অমূল্য সময় গ্রাস করে নিচ্ছে। খেলাধুলার প্রকৃত অর্থ হওয়া উচিত অল্প সময়ের বিনোদন কিংবা শরীরচর্চা; কিন্তু আজ তা অনেকের কাছে জীবনের উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে। অথচ জীবন ও সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য এক বিরাট নিয়ামত। এই নিয়ামতের সংরক্ষণ ও সদ্ব্যবহার করা আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব। অথচ বাস্তবতা হলো, এই দায়িত্ব পালনে আমরা অধিকাংশই উদাসীন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে অত্যন্ত সংক্ষেপে কিন্তু গভীর অর্থে সতর্ক করে বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামত এমন, যেগুলোর ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত : সুস্থতা ও অবসর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪১২)

আরেক হাদিসে রাসুল (সা.) এক সাহাবিকে জীবনঘনিষ্ঠ কয়েকটি অমূল্য উপদেশ প্রদান করে বলেছেন,

‘পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটির আগে গনিমত মনে করো : তোমার জীবনকে তোমার মৃত্যুর আগে, তোমার যৌবনকে তোমার বার্ধক্যের আগে, তোমার সুস্থতাকে তোমার অসুস্থতার আগে, তোমার অবসরকে তোমার ব্যস্ততার আগে এবং তোমার সচ্ছলতাকে তোমার দারিদ্র্যের আগে।’ (সহিহ আল-জামে, হাদিস : ১০৭৭)

কী অপরিসীম মূল্যবান এই উপদেশগুলো! যে ব্যক্তি এগুলোকে নিজের জীবনের নীতিতে পরিণত করতে পারবে—নিঃসন্দেহে তার দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই আলোকিত হয়ে উঠবে।

লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক জামিয়া মাদানিয়া শুলকবহর, চট্টগ্রাম
arfasadibnsahin@gmail.com

Manual8 Ad Code

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com