• সিলেট, ভোর ৫:৪৪, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ঋণ হোক মানবিক সহানুভূতির নাম

admin
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৬
ঋণ হোক মানবিক সহানুভূতির নাম

Manual3 Ad Code

ঋণ হোক মানবিক সহানুভূতির নাম

মাইমুনা আক্তার

 

Manual5 Ad Code

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধানের নাম। এটি মানুষের জীবনকে সহজ, নিরাপদ ও মানবিক করতে চায়। অর্থনীতি, লেনদেন ও সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ইসলাম এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা দিয়েছে, যেখানে কারো কঠিন বিপদ বা দুঃখকে পুঁজি করে লাভ করার সুযোগ নেই, বরং মানুষের কষ্ট লাঘব করাকে ইবাদতের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই ইসলাম সুদকে কঠোরভাবে হারাম করেছে এবং নিঃস্বার্থ ঋণকে (করজে হাসানা) উৎসাহিত করেছে।

সুদের ভয়াবহতা : সুদ এতটাই ভয়াবহ একটি পাপ যে সুদখোরের সঙ্গে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুল যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা মুমিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না করো তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও আর যদি তোমরা তাওবা করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের জুলুম করা হবে না।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৭৮-২৭৯)

তাফসিরবিদদের মতে, আলোচ্য আয়াতে সুদ পরিত্যাগের নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণকারীদের কঠোর শাস্তির কথা শোনানো হয়েছে। অর্থাৎ তোমরা যদি সুদ পরিহার না করো, তবে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও। কুফর ছাড়া অন্য কোনো বৃহত্তম গুনাহের কারণে পবিত্র কোরআনে এত বড় শাস্তির কথা আর উচ্চারিত হয়নি। (মাআরিফুল কুরআন)

তা ছাড়া সুদ এমন এক ব্যবস্থা, যা সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যকে প্রকট করে।

ধনীকে আরো ধনী করে এবং দুর্বল ও দরিদ্রকে ধীরে ধীরে নিঃস্ব করে ফেলে। বহু মানুষ ঋণের চাপে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, পরিবার ধ্বংস হয়, এমনকি সুদি মহাজনদের মানসিক অত্যাচারে কখনো কখনো মানুষ মৃত্যুর পথও বেছে নিতে বাধ্য হয় (যদিও ইসলামের দৃষ্টিতে এটিও জঘন্য হারাম)। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু সুদ গ্রহীতাকেই নয়, বরং সুদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) অভিসম্পাত করেছেন সুদখোরের ওপর, সুদদাতার ওপর, এর লেখকের ওপর ও তার সাক্ষী দুজনের ওপর এবং বলেছেন এরা সবাই সমান।

(মুসলিম, হাদিস : ৩৯৮৫)

Manual7 Ad Code

এটি প্রমাণ করে, সুদ শুধু ব্যক্তিগত গুনাহ নয়; এটি একটি সামাজিক অপরাধ।

সুদ সমাজে সমৃদ্ধি বা শান্তি আনে না, বরং অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
নিঃস্বার্থ ঋণের ফজিলত : কাউকে ঋণ দিয়ে বিপদে পাশে দাঁড়ানো অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। এটি আল্লাহর কাছে উত্তম বিনিয়োগ করার মতো। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে, ফলে তিনি তার জন্য বহু গুণে বাড়িয়ে দেবেন? আর আল্লাহ সংকীর্ণ করেন ও প্রসারিত করেন এবং তাঁরই নিকট তোমাদের ফেরানো হবে।’

(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৪৫)

এই আয়াতের একাধিক ব্যাখ্যা আছে। তবে একটি ব্যাখ্যা হলো, আল্লাহকে ঋণ দেওয়ার একটি অর্থ এও বলা হয়েছে যে তাঁর বান্দাদের ঋণ দেওয়া এবং তাদের অভাব পূরণ করা। কেননা রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান অপর মুসলমানকে দুইবার ঋণ দিলে সে সেই পরিমাণ সম্পদ একবার দান-খয়রাত করার সমান সওয়াব পায়।’

(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪৩০)

ঋণ আদায়ে নম্রতার গুরুত্ব : মানুষের প্রয়োজনে ঋণ প্রদানের পাশাপাশি তা আদায়ে নম্র হওয়ার প্রতিও উৎসাহ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যদি সে (ঋণ গ্রহণকারী) দরিদ্র হয়, তবে সচ্ছল অবস্থা আসা পর্যন্ত অবকাশ দেবে আর মাফ করে দেওয়া তোমাদের পক্ষে অতি উত্তম, যদি তোমরা জানতে!’

Manual7 Ad Code

(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮০)

ইসলামের পূর্বে জাহেলি যুগে ঋণ পরিশোধ না হলে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের ওপর সুদ বাড়তে বাড়তে মূলধনে যোগ হতো। ফলে সামান্য অর্থ একটি পাহাড় হয়ে দাঁড়াত এবং তা পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ত। মহান আল্লাহ এর বিপরীত নির্দেশ দিয়ে বললেন, ‘যদি ঋণগ্রহীতা অভাবগ্রস্ত হয়, তাহলে (সুদ নেওয়া তো দূরের কথা মূলধন নেওয়ার ব্যাপারেও) সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে সময় দাও। আর যদি ঋণ একেবারে মাফ করে দাও, তাহলে তা আরো উত্তম।’ হাদিসসমূহেও এর বড়ই ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। বুরায়দাহ আল-আসলামি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি (ঋণগ্রস্ত) অভাবী ব্যক্তিকে অবকাশ দেবে, সে দান-খয়রাত করার সওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি ঋণ শোধের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ও সময় বাড়িয়ে দেবে সেও প্রতিদিন দান-খয়রাত করার সওয়াব পাবে।

(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪১৮)

ইচ্ছাকৃত ঋণ পরিশোধে বিলম্ব : আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ঋণ নেওয়া ধ্বংসাত্মক। মহানবী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি মানুষের মাল (ধার) নেয় পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলা তা আদায়ের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে তা নেয় বিনষ্ট করার নিয়তে আল্লাহ তাআলা তাকে ধ্বংস করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩৮৭)

আবার কেউ যদি সংকট না থাকা সত্ত্বেও পাওনাদারের পাওনা আদায়ে টালবাহানা করে, তা-ও নিন্দনীয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ধনী ব্যক্তির (ঋণ আদায়ে) গড়িমসি করা জুলুম। (বুখারি, হাদিস : ২৪০০)

অর্থ বাড়ানোর উদ্দেশ্য হলে ব্যাবসায়িক বিনিয়োগের সুযোগ : ঋণ দেওয়া উচিত মানুষের বিপদ দূর করার জন্য। আর যদি কারো ইচ্ছা এমন হয় যে তার অর্থ সম্পদ বাড়াবে তাহলে তার উচিত ব্যাবসায়িক বিনিয়োগ করা। মহান আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, “যারা সুদ খায়, তারা সেই লোকের মতো দাঁড়াবে, যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা বেহুঁশ করে দেয়, এ শাস্তি এ জন্য যে তারা বলে, ‘ক্রয়-বিক্রয় সুদের মতোই’, অথচ কারবারকে আল্লাহ হালাল করেছেন এবং তিনি সুদকে হারাম করেছেন। সুতরাং যার নিকট তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে উপদেশবাণী পৌঁছল এবং সে বিরত হলো, পূর্বে যা (সুদের আদান-প্রদান) হয়ে গেছে, তা তারই, তার বিষয় আল্লাহর জিম্মায় এবং যারা আবার আরম্ভ করবে তারাই অগ্নির বাসিন্দা, তারা তাতে চিরকাল থাকবে।”

(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৭৫)

একাকী ব্যবসা করার সুযোগ বা দক্ষতা না থাকলে কোনো নির্ভরযোগ্য ও হালালভাবে ব্যবসা করে এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায় বিনিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে। ইসলামে মুরাবাহা, মুশারাকা ইত্যাদির মতো অনেক পদ্ধতি রয়েছে, যেগুলো অবলম্বন করে হালালভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে।

এক কথায় বলতে গেলে ঋণ হতে হবে নিঃস্বার্থ সহযোগিতা, আর ব্যবসা হতে হবে ঝুঁকি ও লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্বে। যাতে ঋণের চাপে কোনো মানুষকে মৃত্যুর পথ বেছে নিতে না হয়। যাতে আর্থিক বিনিয়োগ শোষণের হাতিয়ার না হয়। ঋণ হোক সহানুভূতির নাম, শোষণের নয়। আর ব্যবসা হোক শরিয়াহসম্মত পদ্ধতিতে, সুদের নয়।

বিডি-প্রতিদিন

Manual5 Ad Code

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com