• সিলেট, রাত ১২:৩৭, ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

রমজান-পরবর্তী মুমিনের জীবন

admin
প্রকাশিত মার্চ ২৯, ২০২৬
রমজান-পরবর্তী মুমিনের জীবন

Manual4 Ad Code

রমজান-পরবর্তী মুমিনের জীবন

 

মুফতি মুহাম্মদ আনিসুর রহমান রিজভি

 

পুণ্যের বসন্ত মাস মাহে রমজান। এ মহিমান্বিত মাস রমজান আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে। রমজান বিদায় নেওয়ার পর সংযম ও সাধনার জীবন পরিহার করছে বহু মানুষ, ফিরে গেছে আগের গুনাহমাখা জীবনের দিকে। অথচ মাহে রমজানের দাবি হলো, পাপমুক্ত যে জীবনের অনুশীলন মুমিনরা রমজানে করেছিল, তা রমজানের পরও অব্যাহত থাকবে এবং আল্লাহমুখী, ইবাদতমুখর যে সময় সে কাটিয়েছিল, তাতে কোনো ধরনের পরিবর্তন আসবে না।

আল্লাহর ভয় ধারণ করা : দীর্ঘ এক মাস রোজা আদায়ের প্রধান উদ্দেশ্য তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল পূর্ববর্তীদের ওপর; যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৩)

সুতরাং রমজান-পরবর্তী জীবনে যদি আল্লাহর ভয় অন্তরে ধারণ করে চলা যায়, তবে দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনা সার্থক বলে গণ্য হবে। আর আল্লাহভীতিই মুমিন জীবনে সাফল্যের মাপকাঠি।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার পথ প্রশস্ত করে দেন এবং তাকে ধারণাতীত উৎস থেকে জীবিকা দান করেন।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ২-৩)

আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা : রমজান হলো মুমিনের জন্য ভালো কাজের প্রশিক্ষণ নেওয়ার মাস। সে এই মাসে তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধি অর্জন এবং ভালো কাজ করা ও মন্দ কাজ পরিহারের অভ্যাস করবে; অতঃপর বছরের অবশিষ্ট দিনগুলোতে সে অনুযায়ী জীবনযাপন করবে। সুতরাং রমজান মাসে যেসব নেক আমল করা হতো তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে।

মহানবী (সা.) আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষায় উৎসাহিত করেছেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবী (সা.) বলেছেন, তোমরা সাধ্যানুযায়ী (নিয়মিত) আমল করবে। কেননা তোমরা বিরক্ত না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ প্রতিদান দেওয়া বন্ধ করেন না। মহান আল্লাহ ওই আমলকে ভালোবাসেন, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়। তিনি কোনো আমল করলে তা নিয়মিত করতেন।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ১৩৬৮)

আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.)-কে তিনি বলেন, ‘হে আবদুল্লাহ! অমুকের মতো হইয়ো না। সে তাহাজ্জুদ আদায় করত, অতঃপর তা ছেড়ে দিয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৫২)

পাপ কাজে ফিরে না যাওয়া : পাপ কাজ পরিহার করার পর আবার তাতে লিপ্ত হওয়া আল্লাহর দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয়। আল্লাহ কোরআনের একাধিক স্থানে এই শ্রেণির মানুষের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সেই নারীর মতো হইয়ো না, যে তার সুতা মজবুত করে পাকানোর পর তা খুলে নষ্ট করে দেয়।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯২)

অন্য আয়াতে আল্লাহ এমন পরিস্থিতি থেকে মুক্তির দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! সরল পথপ্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্য লঙ্ঘনপ্রবণ কোরো না এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের করুণা দাও। নিশ্চয়ই তুমি মহাদাতা।’ (সুরা : আলে-ইমরান, আয়াত : ৮)

Manual4 Ad Code

হালাল রোজগার করা : উপার্জনের রয়েছে দুটি দিক। বৈধ ও অবৈধ। অবৈধভাবে উপার্জিত খাবার খেয়ে ইবাদত করলে সওয়াব পাওয়া যাবে না এমনকি ওই ইবাদতের মাধ্যমে জান্নাতেও যাওয়া যাবে না বলে হাদিসে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। উপার্জন হালাল না হলে বান্দার দোয়াও কবুল হয় না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে শরীর হারাম পেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে, তা জান্নাতে যাবে না।’ (মুসনাদু আবি ইয়ালা, ১/৮৪)

এ জন্য ইসলাম হালাল উপার্জনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করার নির্দেশ দেয়। এমনকি ফরজ ইবাদতের পর হালাল পন্থায় উপার্জন করাকে ফরজ সাব্যস্ত করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘ফরজ আদায়ের পর হালাল পন্থায় উপার্জনও ফরজ।’ (বায়হাকি)

Manual8 Ad Code

তাহাজ্জুদের নামাজের অভ্যাস ধরে রাখা : রমজানে তাহাজ্জুদের প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আকর্ষণ আরো বেড়ে যেত। তিনি রমজানে বেশি পরিমাণ তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন। বিশেষত রমজানের শেষ দশকে তিনি ইতিকাফ করতেন এবং রাত জাগরণ করতেন। এ সময় তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও রাতে আমলের জন্য ডেকে দিতেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রমজানের শেষ দশকে রাসুলুল্লাহ (সা.) রাত জেগে ইবাদত করতেন, তাঁর পরিবারকে ডেকে দিতেন এবং লুঙ্গি শক্ত করে বেঁধে নিতেন।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

Manual8 Ad Code

অন্য হাদিসে এসেছে, শুধু রমজান নয়, সারা বছর রাসুল (সা.) তাঁর পরিবারকে তাহাজ্জুদের নামাজের তাগিদ দিতেন। এ ব্যাপারে কোনো ধরনের আলস্য দেখলে তিনি সতর্ক করতেন।

কোরআন তেলাওয়াতের অভ্যাস ধরে রাখা : রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে পরবর্তী যুগের সব মনীষী রমজান মাসে কোরআন চর্চা বাড়িয়ে দিলেও বছরের কোনো সময় তাঁরা কোরআন চর্চা থেকে একেবারেই বিরত থাকতেন না। ইসলামী আইনজ্ঞরা কোরআন থেকে বিমুখ হওয়াকে হারাম বলেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে কোরআন পরিত্যাগকারীদের বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে অভিযোগ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘রাসুল (সা.) বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় এই কোরআনকে পরিত্যাজ্য মনে করে।’ (সুরা : ফোরকান, আয়াত : ৩০)

তাই রমজান চলে গেলেও কোরআন তেলাওয়াতের অভ্যাস ধরে রাখতে হবে।

বছরজুড়ে নফল রোজা রাখা : রমজানের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) শাওয়াল মাসে গুরুত্বের সঙ্গে ছয় রোজা পালন করতেন। একাধিক বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা শাওয়ালের ছয় রোজার মর্যাদা ও ফজিলত প্রমাণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর তার সঙ্গে সঙ্গে শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন পূর্ণ বছরই রোজা রাখল।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৬৪)

Manual5 Ad Code

এ ছাড়া মহানবী (সা.) বছরের বিভিন্ন সময়ে নফল রোজা রাখতেন। বিশেষত প্রতি মাসে আইয়ামে বিজ তথা চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখতেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আমার বন্ধু (সা.) আমাকে তিনটি বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন, প্রতি মাসে তিন দিন করে সাওম পালন করা, দুই রাকাত সালাতুদ-দুহা আদায় এবং ঘুমানোর আগে বিতর নামাজ পড়া।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৮১)

পরিশেষে, আমরা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের মাহে রমজানের ইবাদতের প্রশিক্ষণ নিয়ে রমজান-পরবর্তী সময়ে ইবাদত-বন্দেগি করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার মাধ্যমে গুনাহমুক্ত ইসলামী জীবন লাভ করার তাওফিক দান করেন। আমিন।

লেখক : প্রভাষক (আরবি), মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া

সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম

বিডি প্রতিদিন

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com