বিশেষ লেখা
অভিনন্দন, প্রত্যাশা অনেক
লোটন একরাম
নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন। অনেক দিন পর একজন যোগ্য, ত্যাগী, সৎ এবং সর্বজনগ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রপতি পেল দেশ ও জনগণ। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতা-কর্মীরাও পেয়েছেন সংকট মোকাবিলায় দূরদর্শী, দক্ষ, বিশ্বস্ত, পরীক্ষিত ও আস্থাবান একজন রাষ্ট্রপতি; যা দেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সাংবিধানিক নানা সীমাবদ্ধতার পরও মির্জা ফখরুল ইসলামের কাছে অনেক বেশি প্রত্যাশা ব্যক্ত করছেন দেশবাসী। শুভ হোক ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলামের পথচলা।
একেবারেই তৃণমূলে রাজনীতি করে উঠে এসেছেন মির্জা ফখরুল। জনসেবার ব্রত নিয়ে অর্থনীতির অধ্যাপকের সরকারি চাকরি ছেড়ে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হয়ে রাজনীতির শুরুটা সার্থক হলো আজ। বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দিয়ে নানা চড়াই-উতরাই ও জেলজুলুম সহ্য করেছেন তিনি। জেলা থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব তথা মহাসচিবের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সফলভাবে সম্পন্ন করলেন।
একই সঙ্গে সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী-মন্ত্রীর পদে সৎ ও নির্লোভ থেকে পালন করেছেন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। সাংগঠনিকভাবে অভিজ্ঞ এবং বক্তব্যেও রয়েছে পরিমিতি ও সৌজন্যবোধ। শুধু রাজনীতি নয়, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ। বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার সামনে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেও বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি।
সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে খুব কাছ থেকে দেখা ও মেশার সুযোগ হয়েছে আমার। অনেক রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদকের সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলার উদাহরণ রয়েছে আমাদের সামনে। ব্যতিক্রম মির্জা ফখরুল ইসলাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে করেছেন চুলচেরা বিশ্লেষণ। মনোযোগ দিয়ে অনেক যুক্তিতর্ক শুনতেন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত এই অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ।
অতি সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ‘ক্লিন ইমেজের’ অধিকারী ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম। মন্ত্রী হওয়ার পর সরকারি বাসভবনে ওঠার আগ পর্যন্ত সপরিবার ভাড়া বাসায়ই বসবাস করেছেন। দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দলের মহাসচিব হওয়া সত্ত্বেও রাজধানীতে নিজের কোনো বাড়ি বা ফ্ল্যাট নেই। চাকরিজীবী স্ত্রীর দেওয়া সাধারণ একটি প্রাইভেট কারেই চলাফেরা করেছেন।
ছাত্র ইউনিয়ন দিয়ে রাজনীতির হাতেখড়ি মির্জা ফখরুল দলের নেতা-কর্মীদের বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সততা ও দেশপ্রেমের আদর্শ অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন সব সময়। আবার তিরস্কারও করেছেন কারও কারও জৌলুসপূর্ণ জীবনযাপন দেখে। একই সঙ্গে পেশাজীবীদের পেশায় থেকে সক্রিয় রাজনীতি করাও তাঁর তেমন পছন্দ নয়। মাঝেমধ্যে কাউকে কাউকে পেশা ক্ষতিগ্রস্ত না করে চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতি করার পরামর্শ দিতেও দেখেছি তাঁকে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে নানা সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সুখী ও সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়ার চেষ্টা করছে বিএনপি সরকার। সরকারের ১৮০ দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ বেশ প্রশংসিত হয়েছে। চলছে দলের ৩১ দফা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কাজ। সত্য অপ্রিয় হলেও বলতে কখনো দ্বিধাবোধ করেননি মির্জা ফখরুল। দেশের মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করায় প্রধানমন্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসা করে সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘শুধু প্রধানমন্ত্রী ভালো কাজ করলে হবে না। সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয়নি। এখনো অনেক কিছুই বদলায়নি। ঘুষ ও দুর্নীতি চলছে।’ তাঁর এ বিস্ফোরক বক্তব্যে নড়েচড়ে বসেছেন প্রশাসন ও সরকারের কর্তাব্যক্তিরা। সরকারপ্রধানসহ দেশের সাধারণ মানুষ মির্জা ফখরুলের অভিভাবকসুলভ বক্তব্যকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁর এই ধরনের পরামর্শ দেশ ও জাতির স্বার্থে অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদেরও মির্জা ফখরুলের কাছে প্রত্যাশা আরও বেড়ে গেছে। তাঁরা বলছেন, ‘মির্জা ফখরুল একজন খাঁটি, সৎ, সংবেদনশীল মানুষ। মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা রয়েছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এমন একজন মানুষের প্রয়োজন ছিল, যিনি দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন।’ রাষ্ট্রপতির পদে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই দেশ ও মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন-এমনটাই প্রত্যাশা সর্বস্তরের মানুষের।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও দেশের মানুষের অনেক মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়নি। একদলীয় ও স্বৈরশাসনে পিষ্ট হয়ে দুর্নীতি-লুটপাটসহ নানা কারণে পিছিয়ে আছে দেশ। সর্বশেষ চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে স্বৈরশাসক আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশ আবার ঘুরে দাঁড়াবে-এই আশা ছিল সাধারণ মানুষের। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী ক্ষমতাসীন বিএনপির কাছে এখন মানুষের সেই প্রত্যাশা।
একজন সফল রাজনীতিবিদ হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি করায় সেই প্রত্যাশা আরও বেড়েছে জনমনে। অতীতের মতো কোনো পেশাজীবী ব্যক্তিকে না করে দলের সর্বজনগ্রহণযোগ্য ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলামকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করায় বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর দেশের সাধারণ মানুষ খুশি। তাঁর এ দূরদর্শী সিদ্ধান্ত দল ও দলের বাইরে সুধীসমাজে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে।
বিএনপি সরকারের ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। এখন দেশ, গণতন্ত্র ও জনগণের স্বার্থে গৃহীত দলের ৩১ দফা নির্বাচনি ইশতেহার এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরিত দফাগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন আশা করছেন দেশবাসী। বিশেষ করে বিএনপি জাতীয় সনদে যেসব দফার সঙ্গে একমত পোষণ করেছে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন চান সবাই। এ ক্ষেত্রে সাবেক মহাসচিব এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্রপতি হওয়ায় অভিভাবকের আসন থেকে দলকে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা, গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মূল্যবান পরামর্শ দেবেন বলে আশা দেশবাসীর। যাতে কোনো ভুল সিদ্ধান্তে দেশ, দল ও গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
বিডি-প্রতিদিন