সিলেটে খাদ্যে ভেজাল, দুই কারখানা সিলগালা
নিজস্ব প্রতিবেদক
সিলেটে খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনে নানা অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের দুই মাসের অভিযানে। মানুষের খাবারে পশুখাদ্যের উপকরণ, বিষাক্ত টেক্সটাইল রং, নিষিদ্ধ ঘন চিনি ও হাইড্রোজ ব্যবহার, পচা ডিম ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য মজুতের মতো গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেছে। কোথাও আবার মরিচা ধরা ছাঁচে তৈরি হচ্ছিল পাউরুটি।
এসব অনিয়মের দায়ে গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ১৫১টি প্রতিষ্ঠান তদারকি করে ১৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় এবং দুটি কারখানা সিলগালা করা হয়েছে। একই সময়ে বাজার থেকে অপসারণ করা হয়েছে ৬ হাজার ১৫৩ দশমিক ৯ কেজি পোড়া তেল।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সিলেট জেলা কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলা প্রশাসন ও জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে এসব অভিযান পরিচালনা করা হয়। সিলগালা করা দুটি কারখানার একটি লেচু বাগানে এবং অন্যটি আলমপুর বিসিকের বৈশাখী বেকারি। তবে লেচু বাগানের সিলগালা করা কারখানাটির নাম প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং সেপ্টেম্বরে ৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। সেপ্টেম্বর মাসে লেচু বাগানের ‘রূপালি বিস্কুট’কে নিরাপদ খাদ্য আইনে ১ লাখ টাকা, রায়নগরের মিতালী এলাকার ‘মডার্ণ সুরমা ফুডস’কে ২ লাখ টাকা এবং খাদিমনগর বিসিকের ‘ময়মনসিংহ এগ্রো লিমিটেড’কে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইনে ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া আলমপুর বিসিকে বৈশাখী বেকারি সিলগালা করার পাশাপাশি ‘রিয়েল ফুডস’কে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
আগস্টে ‘মুসলিম সুইটমিট’কে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইনে ৭৫ হাজার টাকা, ‘ভাই ভাই বেকারি’কে নিরাপদ খাদ্য আইনে ২ লাখ টাকা এবং ‘শ্রমিক ড্রাইভার রেস্টুরেন্ট’কে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইনে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
সিলেটভিউর অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২ সেপ্টেম্বর লেচু বাগানে অভিযান চালিয়ে ক্ষতিকর পোড়া তেল, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য, পচা ডিম ও টেক্সটাইল রং পাওয়া যায়। একই এলাকায় নিষিদ্ধ ঘন চিনি ও হাইড্রোজ ব্যবহারের দায়ে একটি কারখানা সিলগালা করা হয়। ওই দিন পীরেরবাজারে পোড়া তেল ব্যবহারের দায়ে একটি প্রতিষ্ঠানকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
৮ সেপ্টেম্বর রায়নগরে পণ্যে আগাম ডেট কোডিং এবং কাপড়ে ব্যবহৃত বিষাক্ত রং ব্যবহারের দায়ে একটি প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই দিনে খাদিমনগর বিসিকের একটি বেকারিতে পেইন্টিং ব্রাশের ব্যবহার, মেয়াদোত্তীর্ণ চকলেট মজুত এবং ছাঁচে মরিচা পাওয়ায় ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।
১৩ ও ১৬ সেপ্টেম্বর খাদিমনগর ও আম্বরখানায় নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে পরিচালিত সামারি ট্রায়ালে খাদ্যপণ্যের মানসংক্রান্ত বিষয় পরীক্ষা করা হয়। ২০ সেপ্টেম্বর বন্দরবাজারের মধুবন সুপার মার্কেটে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ব্যবসা পরিচালনার দায়ে দুটি দোকানকে যথাক্রমে ৬ হাজার ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায় ২৩ সেপ্টেম্বর গোটাটিকর বিসিক এলাকায়। সেখানে মানুষের খাদ্য তৈরিতে প্রাণিখাদ্যের উপকরণ ‘সোডিয়াম বাই-কার্বোনেট ফিড গ্রেড’ ব্যবহার করা হচ্ছিল। কারখানাটিতে তীব্র দুর্গন্ধের পাশাপাশি পোকামাকড়ের উপদ্রবও ছিল। এসব অনিয়মের দায়ে প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করা হয়।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই মাসে তদারকি করা ১৫১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আগস্টে ছিল ৮১টি এবং সেপ্টেম্বরে ৭০টি। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬৬টি হোটেল ও রেস্টুরেন্ট, ২১টি বেকারি, ১৮টি মিষ্টির দোকান ও কারখানা, ১১টি খাদ্য কারখানা, ১১টি পাইকারি বাজার, ১০টি খুচরা বাজার, ৮টি মুদিদোকান, ৩টি কাঁচাবাজার এবং ৩টি খামার বা ফার্ম রয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতেও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা করা হয়। এ ছাড়া খাদ্যকর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে আগস্টে ৪০ জন এবং সেপ্টেম্বরে ১১০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
খাবারে বারবার পোড়া তেল ব্যবহারের প্রবণতা ঠেকাতে ‘মুয়েনজার বাংলা প্রাইভেট লিমিটেড’ ও ‘বায়োটেক এনার্জি লিমিটেড’-এর মাধ্যমে সেপ্টেম্বরে সিলেট জেলা ও মহানগর এলাকা থেকে ৬ হাজার ১৫৩ দশমিক ৯ কেজি পোড়া তেল সংগ্রহ করে অপসারণ করা হয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সিলেট জেলা কার্যালয় ও সিলেট মেট্রোপলিটনের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা সৈয়দ সারফরাজ হোসেন সিলেটভিউকে বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের সহায়তায় সিলেট জেলা ও মহানগর এলাকায় নিয়মিত মোবাইল কোর্ট, বিশেষ অভিযান ও তদারকি চালানো হচ্ছে। শিশুদের খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। প্রতি মাসে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হচ্ছে। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যে সিলেট বিভাগের জন্য বরাদ্দকৃত মোবাইল ল্যাবের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জনস্বার্থে ভেজালবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। দুই মাসে ১৫১টি প্রতিষ্ঠানে তদারকি, ১৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা এবং দুটি কারখানা সিলগালা করার তথ্যের পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনে পাওয়া অনিয়মগুলো জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব অনিয়মের পুনরাবৃত্তি রোধ এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা অব্যাহত রাখাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সিলেটভিউ২৪ডটকম