• সিলেট, সকাল ১০:৩৫, ২৭শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আলোকচিত্র, ড্যাডির সেলফ পোর্ট্রেট

admin
প্রকাশিত জানুয়ারি ১০, ২০২৬
আলোকচিত্র, ড্যাডির সেলফ পোর্ট্রেট

Manual3 Ad Code

আলোকচিত্র,
ড্যাডির সেলফ পোর্ট্রেট

গোলাম কাসেম ড্যাডির ২৮তম মৃত্যুদিন উপলক্ষে এই লেখাটি ফিরে তাকায় এক শতাব্দীরও বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত এক আলোকচিত্র-যাত্রার দিকে। বাঙালির ফটোগ্রাফি চর্চার শুরুর দিকের যে কজন পথিকৃৎ নিঃশব্দে ইতিহাস নির্মাণ করেছেন, ড্যাডি তাঁদের অন্যতম। চাকরির ব্যস্ততা, সময়ের সীমাবদ্ধতা আর প্রযুক্তিগত জটিলতার মধ্যেও তিনি ক্যামেরাকে করেছেন আত্ম-অনুসন্ধানের মাধ্যম। তাঁর আত্মপ্রতিকৃতিগুলো শুধু ব্যক্তিগত দলিল নয়, বাংলা আলোকচিত্রের প্রারম্ভিক ভাষারও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

সাহাদাত পারভেজ

 

Manual8 Ad Code

আইএ পাস করতে করতে বয়স হয়ে গেছে চব্বিশ। বাবা দেখলেন, বিএ পাস করতে গেলে ছেলের চাকরির বয়স পেরিয়ে যাবে। ফটোগ্রাফি আর লেখালেখি নিয়ে যতটা মাতামাতি, তাতে ছেলে বিএ পাস করতে পারবে কি না সন্দেহ। সবকিছু ভেবে বাবা বললেন, দেখো, তোমার তো চব্বিশ বছর পার হয়ে যাচ্ছে, পঁচিশে গিয়ে পড়বে। এখন যদি বিএ পড়তে যাও, তাহলে পাস করতে আরও দুই বছর লাগবে। বয়স বেড়ে গেলে আর চাকরি পাবে না। আমি থাকতে থাকতে একটা চাকরি ধরো। বাবার কথায় সম্মতি জানালেন গোলাম কাসেম ড্যাডি।

ড্যাডির বাবা খান সাহেব গোলাম রাব্বানী তখন কলকাতা আইজিপি দপ্তরের পুলিশ সুপার। নিজের পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে ছেলের চাকরির ব্যবস্থা করলেন সাব-রেজিস্ট্রার পদে। তখন ১৯১৯ সাল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কেবল শেষ হয়েছে। শুরুতে ছয় মাসের একটি প্রশিক্ষণ। প্রথম পোস্টিং হাওড়ায়। তারপর পাদুংয়ে। সেখান থেকে বদলি হয়ে গেলেন বাঁকুড়ায়। বাঁকুড়ায় তিনি বহু বছর ছিলেন। ড্যাডির যে তিনটি সেলফ পোর্ট্রেট বা আত্মপ্রতিকৃতি আমাদের দেখা—এর মধ্যে দুটিই তাঁর চাকরিজীবনের শুরুর দিকে তোলা। প্রথম সেলফ পোর্ট্রেটটি ১৯২০ সালে হাওড়ায় তোলা।

Manual8 Ad Code

ড্যাডির যে তিনটি সেলফ পোর্ট্রেট বা আত্মপ্রতিকৃতি আমাদের দেখা—এর মধ্যে দুটিই তাঁর চাকরিজীবনের শুরুর দিকে তোলা। প্রথম সেলফ পোর্ট্রেটটি ১৯২০ সালে হাওড়ায় তোলা। এটিই ভারতীয় উপমহাদেশে কোনো বাঙালি মুসলমানের প্রথম সেলফ পোর্ট্রেট বলে এখন পর্যন্ত স্বীকৃত।

এটিই ভারতীয় উপমহাদেশে কোনো বাঙালি মুসলমানের প্রথম সেলফ পোর্ট্রেট বলে এখন পর্যন্ত স্বীকৃত। ৯০ বছর পর্যন্ত এই সেলফ পোর্ট্রেটটি লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল। এই অন্তরাল ভেঙে পোর্ট্রেটটি সবার নজরে আনেন বরেণ্য প্রতিকৃতিশিল্পী নাসির আলী মামুন। ২০১১ সালের ইত্তেফাক ঈদসংখ্যায় ‘পূর্ব বাংলার ফটোগ্রাফি: রাজসাক্ষী গোলাম কাসেম ড্যাডি’ শিরোনামে তাঁর দশ পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ওই প্রবন্ধের ইনারে (৪৯৩ পৃষ্ঠায়) ড্যাডির এই সেলফ পোর্ট্রেটটি ছাপা হয়।

 

পোর্ট্রেটটির পেছনে কালো কাপড়। ওই আমলে ছবি তোলার জন্য সাধারণত এই ধরনের কালো কাপড় ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সাদা টি-শার্টের ওপর কোট পরা ড্যাডি। তাকানোটা ঠিক ক্যামেরার দিকে নয়। একটু অন্যদিকে, ক্যামেরা থেকে খানিক ওপরে। চেহারায় কিছুটা ক্লান্তির ছাপ। বিশ্বযুদ্ধ থেকে ফিরে দীর্ঘ সময় যে ম্যালেরিয়ায় ভুগেছিলেন, তার ধকলও হতে পারে। একটা টুলের ওপর বসে এক হাত পরিমাণ শাটার রিলিজ কেবল বাটন প্রেস করে বক্স ক্যামেরায় ছবিটি তুলেছিলেন তিনি। ছবিটির ওপরের দিকের কিছু অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। ছবিটির সংগ্রাহক নাসির আলী মামুনের কাছে ব্যক্তিগতভাবে জেনেছি, দীর্ঘদিন কাগজের ভেতর থাকতে থাকতে মূল নেগেটিভের ওপরের দিকের ইমালশান উঠে গেছে।

Manual1 Ad Code

ড্যাডি দ্বিতীয় সেলফ পোর্ট্রেটটি ১৯২২ সালে তোলা। এই ছবিতেও তাকানোটা ঠিক ক্যামেরার দিকে নয়। সাদা শার্ট আর কালো কোট গায়ে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছেন ড্যাডি। হাঁটুর ওপর হাত রাখা। মাথার এক পাশে সিঁথি। সাহেবি ভাব। কিন্তু চেহারায় একটা শীতল অভিব্যক্তি। এই সেলফ পোর্ট্রেটটির মূল নেগেটিভও নাসির আলী মামুনের সংগ্রহে রয়েছে। তিনি ১৯৮৮ সালে ড্যাডির কাছ থেকে ফটোজিয়ামের জন্য সংগ্রহ করেন। ওই সময় নাসির আলী মামুনকে ড্যাডি জানিয়েছিলেন, কলকাতায় তখন তিনি আর কারও সেলফ পোর্ট্রেট দেখেননি। শত বছরের বেশি পুরোনো সেলফ পোর্ট্রেট দুটি এখন বাংলার প্রতিকৃতি আলোকচিত্রের প্রথম দিককার নিদর্শন।

 

ড্যাডির বহুল দেখা সেলফ পোর্ট্রেটটি ১৯৫১ সালে তোলা। ছবিটি তিনি তাঁর ৭৩ নম্বর ইন্দিরা রোডের বাড়ির শয়নকক্ষে তোলেন। মিডিয়াম ফরম্যাট টুইন লেন্স রিফ্লেক্স ক্যামেরা ড্যাডির গলায় ঝোলানো। ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখা। বিশাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত দিয়ে শক্ত করে ক্যামেরাটি ধরে রেখেছেন। তাই শাটার রিলিজ বাটন প্রেস করার সময় তাঁর ডান হাতের শিরাগুলো বটগাছের শিকড়ের মতো ফুলে উঠেছে। তিনি যখন এই নিরীক্ষাধর্মী ছবিটি তোলেন, তখন তাঁর বয়স ৫৭!

ড্যাডির বহুল দেখা সেলফ পোর্ট্রেটটি ১৯৫১ সালে তোলা। ছবিটি তিনি তাঁর ৭৩ নম্বর ইন্দিরা রোডের বাড়ির শয়নকক্ষে তোলেন। মিডিয়াম ফরম্যাট টুইন লেন্স রিফ্লেক্স ক্যামেরা ড্যাডির গলায় ঝোলানো। ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখা। বিশাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত দিয়ে শক্ত করে ক্যামেরাটি ধরে রেখেছেন।

দুনিয়ার প্রথম সেলফ পোর্ট্রেটটি তুলেছিলেন ফিলাডেলফিয়ার আলোকচিত্রী রবার্ট কর্নেলিয়াস। ধারণা করা হয়, এই সেলফ পোর্ট্রেটটি কর্নেলিয়াস তোলেন ১৮৩৯ সালে লুই দাগুয়েরের ক্যামেরা আবিষ্কারের কয়েক মাস পর। কালো কোট পরিহিত কর্নেলিয়াস তাঁর মাথা, এলোমেলো চুল আর কাঁধের প্রতিকৃতি তুলেছিলেন লেন্স এবং অপেরা গ্লাসভর্তি একটি বাক্স ব্যবহার করে।

Manual1 Ad Code

লাইব্রেরি অব কংগ্রেস ১৯৯৬ সালে এই সেলফ পোর্ট্রেটটি সংগ্রহ করে। তাঁদের দাবি, এটিই পৃথিবীর প্রথম সেলফি। এই সেলফির সঙ্গে ১৯২২ সালে তোলা ড্যাডির দ্বিতীয় সেলফ পোর্ট্রেটটির বেশ মিল। কর্নেলিয়াস মারা যান ১৮৯৩ সালে, ড্যাডির জন্মের ঠিক এক বছর আগে। কর্নেলিয়াসের সেলফ পোর্ট্রেটটি ড্যাডি দেখেছিলেন কি না—তা আর এখন জানার উপায় নেই। কর্নেলিয়াস ছবি তুলেছিলেন মাত্র তিন বছর। আর ড্যাডি এই চর্চার সঙ্গে ছিলেন ৮৬ বছরের বেশি সময়।

এই সেলফির যুগে যাঁরা মোবাইল ফোন কিংবা ডিজিটাল ক্যামেরায় সেলফি তোলেন, তাঁরা কল্পনাও করতে পারবেন না কতটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে সেলফ পোর্ট্রেট তোলার চেষ্টা করেছেন ড্যাডি। অনেকের মনে হতে পারে, তাঁর এই আত্মপ্রতিকৃতির কম্পোজিশনগুলো খুবই সাধারণ ও সরল। আসলে সরলতাই হচ্ছে শিল্পের আসল সৌন্দর্য। এই সরলতাকে তিনি বহু সাধনার মধ্য দিয়ে রপ্ত করেছিলেন। তাঁর ছবিগুলো বলে দেয় তিনি নিজেও ছিলেন এক সরল মানুষ। এই সরলতা দিয়ে তিনি সৃষ্টি করে গেছেন অসাধারণ সব শিল্পকর্ম।
প্রথম আলো

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com