• সিলেট, রাত ১:০৬, ৩১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ইমামের সামাজিক মর্যাদা ও দায়িত্ব

admin
প্রকাশিত মে ৯, ২০২৬
ইমামের সামাজিক মর্যাদা ও দায়িত্ব

Manual1 Ad Code

ইমামের সামাজিক মর্যাদা ও দায়িত্ব

মুফতি আতাউর রহমান

 

মসজিদ মুসলিম সমাজের প্রাণকেন্দ্র। মদিনার মসজিদে নববী থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের। আর মসজিদের মিম্বার থেকে মুসলিম জাতির নেতৃত্ব দিয়েছেন মহানবী (সা.) ও ইসলামের মহান চার খলিফা। তাই মুসলিম সমাজে মসজিদের ইমামের মর্যাদা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের।

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘মহানবী (সা.)-এর ইমামতি ও খুলাফায়ে রাশেদার ইমামতি শাসক ও বিচারকের মতো মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব ছিল।’ (শরহু উমদাতিল ফিকহ, পৃষ্ঠা-১৩৯)

নিম্নে মসজিদের ইমামের মর্যাদা, যোগ্যতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

ইমামের সম্মান ও মর্যাদা

ইমামের সম্মান ও মর্যাদা কোরআন ও হাদিস দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। যেমন—

১. ইমামতি আল্লাহর অনুগ্রহ : ইমাম বা মানুষের ধর্মীয় নেতা হওয়া মহান আল্লাহর অনুগ্রহস্বরূপ।

মহান আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-এর প্রতি তাঁর অনুগ্রহ প্রকাশ করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাকে মানুষের ইমাম বানিয়েছি।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১২৪)
উল্লিখিত আয়াতে যদিও ইমাম দ্বারা সামগ্রিক ধর্মীয় নেতৃত্ব উদ্দেশ্য, তবে এর ভেতর নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতও অন্তর্ভুক্ত আছে।

২. প্রার্থিত বিষয় : মুসল্লি ও দ্বিনদার মানুষের ইমাম বা নেতা হওয়া একটি প্রার্থিত বিষয়। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের প্রার্থনার বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে, ‘যারা প্রার্থনা করে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করো, যারা হবে আমাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর এবং আমাদের করো মুত্তাকিদের জন্য ইমাম (অনুসরণযোগ্য)। ’ (সুরা : ফোরকান, আয়াত : ৭৪)

Manual6 Ad Code

৩. মহানবী (সা.)-এর উৎসাহ : মহানবী (সা.) ইমামতি করার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি নবীজি (সা.)-এর কাছে এসে বলল, আমাকে একটি আমলের কথা বলুন, যা আমি করতে পারি। তিনি বললেন, তুমি তোমার গোত্রের ইমাম হও। লোকটি বলল, যদি আমি সক্ষম না হই? তিনি বললেন, তবে তুমি তাদের মুয়াজ্জিন হও। (শরহু উমদাতিল ফিকহ, পৃষ্ঠা-১৩৯)

Manual8 Ad Code

৪. পরকালে পুরস্কার : যারা মানুষের নামাজের ইমামতি করবে, পরকালে আল্লাহ তাদের পুরস্কৃত করবেন।

মহানবী (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন তিন ধরনের ব্যক্তি মিসকের (সুগন্ধির) টিলায় থাকবে। এক. সেই দাস, যে আল্লাহর হক আদায় করে নিজ মনিবের হকও আদায় করেছে; দুই. সেই ব্যক্তি, যে মানুষের নামাজের ইমামতি করেছে আর মানুষ তার ওপর সন্তুষ্ট রয়েছে; তিন. সেই ব্যক্তি, যে দিনরাত সব সময় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য আজান দিয়েছে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৫৬৬)

ইমাম হওয়ার শর্ত

ফকিহ আলেমরা নামাজের ইমাম হওয়ার জন্য কিছু শর্ত আরোপ করেছেন। তা হলো—,

১. মুসলিম হওয়া : কোনো অমুসলিম মুসলমানের নামাজের ইমামতি করতে পারবে না। পাশাপাশি এমন ভ্রান্ত মতবাদ, যা ঈমানের পরিপন্থী, তাতে বিশ্বাসী ব্যক্তির জন্য ইমামতি করা বৈধ নয়। যদিও এই ব্যক্তি নিজেকে মুসলিম বলে পরিচয় দেয়।

২. বালেগ হওয়া : বেশির ভাগ ইমাম এ বিষয়ে একমত যে কোনো নাবালক শিশু ফরজ নামাজের ইমামতি করতে পারবে না। তবে মাসআলা জানা ও বুঝমান হওয়ার শর্তে নফল বা সুন্নত নামাজের ইমামতি করতে পারবে। যেমন—তারাবির নামাজ।

৩. পুরুষ হওয়া : আল্লাহ ইমামতির দায়িত্ব শুধু পুরুষের ওপরই ন্যস্ত করেছেন। তাই নারীর ইমামতি শুদ্ধ নয়।

৪. সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া : পাগলের জন্য নামাজের ইমামতি করা বৈধ নয়।

৫. কিরাত শুদ্ধ হওয়া : ইমাম হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো ব্যক্তির কিরাত শুদ্ধ হওয়া। যার কিরাত শুদ্ধ নয় তার পেছনে নামাজ পড়া বৈধ নয়। বিপরীতে যার কিরাত অধিক বিশুদ্ধ সে ইমামতির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে।

Manual7 Ad Code

৬. পবিত্র হওয়া : ইমাম হওয়ার জন্য ব্যক্তির দেহ ও পোশাক পবিত্র হওয়া আবশ্যক।

৭. শারীরিকভাবে সুস্থ হওয়া : কোনো ব্যক্তির যদি এমন রোগ থাকে, যা নামাজ আদায়ে প্রতিবন্ধক, তবে তার জন্য ইমামতি করা বৈধ নয়। যেমন—সর্বদা প্রস্রাব বের হতে থাকা, দাঁড়ানো-রুকু করা বা সিজদা করতে অক্ষম হওয়া। এমন ব্যক্তির জন্যও ইমামতি বৈধ নয় মুখের জড়তার কারণে যে আরবি হরফগুলো বিশুদ্ধভাবে উচ্চারণ করতে পারে না।

(আল ফিকহু আলা মাজাহিবিল আরবাআ : ১/৩৭১)

ইমামের অন্যান্য যোগ্যতা

প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, উল্লিখিত শর্তগুলোর বাইরে ইমামের আরো কিছু যোগ্যতা থাকা আবশ্যক। যেমন—

১. আলেম হওয়া : একজন ইমামের সামগ্রিক ধর্মীয় জ্ঞান থাকা জরুরি। কেননা তিনি মানুষের ধর্মীয় নেতৃত্ব দেন এবং ধর্মীয় নানা সমস্যার সমাধান প্রদান করেন। এখন ইমাম নিজে আলেম না হলে সে অন্যদের বিভ্রান্ত করবে। উত্তম হলো ইমাম যদি মুফতি হন।

২. আল্লাহভীরু হওয়া : মসজিদের ইমাম হিসেবে আল্লাহভীরু ব্যক্তিকে মনোনীত করা আবশ্যক। কেননা আল্লাহ বলেছেন, ‘তারাই আল্লাহর মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করবে, যারা ঈমান আনে আল্লাহ ও আখিরাতে, নামাজ কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং শুধু আল্লাহকে ভয় করে। অতএব, আশা করা যায়, তারা হবে সত্প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১৮)

৩. মধ্য বয়সী হওয়া : মসজিদের ইমাম মধ্য বয়সী হওয়া উত্তম। কেননা তরুণদের ভেতর নানা ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করে আর অতি বৃদ্ধরা সমাজের নেতৃত্ব দানে অক্ষম হয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে আলেমরা নবীদের ৪০ বছরে নবুয়ত লাভের বিষয়টিকে দলিল হিসেবে পেশ করেন।

ইমামের সামাজিক দায়িত্ব

ইসলামী জীবনব্যবস্থায় একজন ইমামের দায়িত্ব নামাজ পড়ানোতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো মুসলিম সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব প্রদান করা তাঁর দায়িত্ব। পাশাপাশি রাষ্ট্রের আনুকূল্যে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বগুলো আঞ্জাম দেওয়া তাঁর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। নিম্নে ইমামের কিছু দায়িত্বের বিবরণ দেওয়া হলো—

১. সুপথ দেখানো : মানুষকে সুপথ দেখানো ইমামের একটি অপরিহার্য দায়িত্ব, বিশেষত যখন সমাজে কোনো অবক্ষয় শুরু হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি তাদের মধ্যে থেকে ইমাম (নেতা) মনোনীত করেছিলাম, যারা আমার নির্দেশ অনুসারে পথপ্রদর্শন করত, যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল। আরা তারা ছিল আমার নিদর্শনাবলিতে দৃঢ় বিশ্বাসী।’

(সুরা : সাজদা, আয়াত : ২৪)

২. ধর্মীয় জ্ঞানের বিস্তার ঘটানো : ইমাম একজন মুসলিম সমাজের জন্য একজন শিক্ষকও বটে। তাই তাঁর দায়িত্ব সমাজে ধর্মীয় জ্ঞানের বিস্তার ঘটানো। বর্তমানে সাধারণ মানুষ ধর্মীয় জ্ঞান থেকে বিমুখ, শিশুরা ধর্মীয় জ্ঞান থেকে দূরে, তাই মানুষ যেন ফরজ জ্ঞান সহজে অর্জন করতে পারে সে বিষয়ে লক্ষ রাখা প্রয়োজন। ইমামের উচিত তাঁর বয়ান ও আলোচনায় ধর্মীয় জ্ঞান, বিশেষত ফরজ জ্ঞানকে প্রাধান্য দেওয়া এবং বিভিন্ন উপলক্ষে মসজিদে জ্ঞানের মজলিস করা।

৩. অপরাধ ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করা : একজন ইমামের দ্বিনি দায়িত্ব হলো সমাজে কোনো পাপ বা অন্যায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে তার প্রতিবাদ করা। ব্যক্তিগত ও সামাজিক সংকটের ভয় থাকলে অন্যায়কারীকে চিহ্নিত না করে শুধু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, যেন মানুষ এই পাপ ও অন্যায়ের ব্যাপারে সতর্ক হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদের পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত দেবে এবং সৎ কাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহর ইচ্ছাধীন।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৪১)

৪. ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করা : সমাজের নেতা হিসেবে একজন ইমামের দায়িত্ব হলো মুসলমানদের ভেতর ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করা। মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করা আনসার ও মুহাজির সাহাবিদের ভেতর ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন; বিশেষত পারিবারিক বা সামাজিক কারণে যখন দুই ব্যক্তি, দুটি পরিবার, দুটি মহল্লার ভেতর মনোমালিন্য থাকে, তখন ইমাম প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে আইনের সীমার মধ্যে থেকে তা নিরসনের উদ্যোগ নিতে পারেন। আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই; সুরতাং তোমরা ভাইদের ভেতর শান্তি স্থাপন কোরো আর আল্লাহকে ভয় কোরো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০)

৫. সেবামূলক কাজে আত্মনিয়োগ করা : একজন আদর্শ ইমাম সমাজের অনুগ্রহের পাত্র হয়ে থাকতে পারেন না, বরং তিনি সমাজের অসহায় মানুষের জন্য সহায় হবেন। একজন ইমামের দায়িত্ব সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের খোঁজখবর রাখা এবং তাদের সংকট দূর করার উদ্যোগ নেওয়া। প্রয়োজনে এ বিষয়ে সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের সহযোগিতা গ্রহণ করা। মহানবী (সা.) নিয়মিত সমাজের দুস্থ ও অসহায় মানুষের খোঁজখবর রাখতেন, এমনকি কেউ নামাজের জামাতে উপস্থিত না হলে তিনি বাড়ি গিয়ে তার কারণ জানার চেষ্টা করতেন। মনে রাখতে হবে, একজন ইমাম সমাজের নেতা। আর ইসলামের শিক্ষা হলো, ‘গোত্রের নেতা তাদের সেবক।’

(সিলসিলাতুদ দয়িফা, হাদিস : ১৫০২)

আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।

Manual5 Ad Code

 

বিডি প্রতিদিন/

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com