ইসলামে বর্জ্য অপসারণের গুরুত্ব ও প্রয়োজনিয়তা
মুফতি ওমর বিন নাছির
ইসলামের দৃষ্টিতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য অপসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। এমনকি এ অভ্যাস ঈমানের অংশও বটে। তাই ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র-সর্বত্র পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার শিক্ষা দিয়েছে। একটি শহরের সৌন্দর্য, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং বসবাসযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করে এর বর্জ্যব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতার ওপর। রাস্তাঘাট, ড্রেন, বাজার, পার্ক ও জনসমাগমস্থলে আবর্জনা ফেলে রাখা যেমন পরিবেশ দূষণ ও রোগব্যাধির কারণ হয়, তেমনি তা মানুষের জন্য কষ্ট ও দুর্ভোগও সৃষ্টি করে। ইসলাম এমন সব কাজকে নিরুৎসাহিত করেছে, যা মানুষের ক্ষতি বা অসুবিধার কারণ হয়।
বরং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াকে সদকা ও নেক আমল হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাই শহরকে বর্জ্যমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন রাখা শুধু নাগরিক দায়িত্ব নয়, বরং ইসলামী মূল্যবোধেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সেখানে এমন লোকেরা রয়েছে, যারা ভালোভাবে পবিত্রতা অর্জন করতে পছন্দ করে। আর আল্লাহ তায়ালা পবিত্রতা অর্জনকারীদের পছন্দ করেন।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১০৮)
আরও বর্ণিত আছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদের।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২২)
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সময় কোরবানিদাতাদের অবহেলার কারণে কোরবানির বর্জ্যে পরিবেশ দূষিত হয়ে যায়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কোরবানির পশুর রক্ত, মজ্জা, হাড়গোড় আর বিষ্ঠায় কোনো কোনো এলাকা বিশাল ভাগারে পরিণত হয়। উৎকট গন্ধে ঈদের আনন্দটাই ম্লান হয়ে যায়। পরিচ্ছন্নতা নিয়ে এমন অবহেলা অন্তত ঈমানদার ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে মোটেও কাম্য নয়।
অথচ জুমার দিন অতিরিক্ত লোকসমাগমের ফলে ঘামের দুর্গন্ধে অন্যদের কষ্ট হওয়ার আশঙ্কা ছিল বলে মহানবী (সা.) সাহাবায়ে কেরামদের গোসল করে পরিষ্কার কাপড় পরে সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে আসার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কোরবানির পর পরিবেশ দূষণের জন্য প্রথম দায়ী হচ্ছেন কোরবানিদাতা। তাদের অনেকে মনে করেন, কোরবানির পশুর দেহ থেকে চামড়া ছাড়ানো, গোশত সংগ্রহ এবং বণ্টনেই তাদের দায়িত্ব শেষ। বর্জ্য অপসারণ শুধু সিটি করপোরেশনের কাজ-এ ধারণা কিছুতেই ঠিক নয়। বর্জ্য অপসারণের দায়িত্ব তো প্রথমে কোরবানিদাতার। যথাসময়ে বর্জ্য অপসারণে অবহেলা করায় তা প্রতিবেশী, আশপাশের মানুষের কষ্টের কারণ হলে এর দায় কোরবানিদাতাকেই নিতে হবে।
যেখানে কোরবানির বর্জ্য ফেলে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার অধিকার ইসলাম কাউকেই দেয়নি। এমনকি তা জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার অন্যতম কারণ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (স.) বলেন, ‘যার কষ্ট থেকে আশপাশের মানুষেরা নিরাপদ নয় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ২২৪০, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৬৮)
পক্ষান্তরে যথাসময়ে বর্জ্য অপসারণের মাধ্যমে জনসাধারণকে এ কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকলে রয়েছে মহান পুরস্কারের ঘোষণা। আবু সায়িদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি হালাল খাদ্য খেয়ে জীবনযাপন করবে, সুন্নত অনুসারে আমল করবে এবং কোনো মানুষ তার দ্বারা কষ্ট পাবে না সে জান্নাতি হবে।’ (তিরমিজি : হাদিস নং : ৬৬৯)।
তাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাই সচেতন না হলে শুধু রাষ্ট্রের পক্ষে এ বিশাল বর্জ্য অপসারণ খুবই কঠিন হয়ে দাড়াবে। মহানবী (সা.) বলেন, ইমানের ৭০টিরও বেশি শাখা আছে, এর মধ্যে ন্যূনতম শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৩৫)
ঈমানের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতি যত্নবান হলে বিনিময়ে মিলবে আল্লাহর পক্ষ থেকে। নবীজি (স.) বলেন, ‘এক ব্যক্তি রাস্তায় চলতে চলতে একটি কাঁটাওয়ালা ডাল দেখতে পায়, সে ডালটি সরিয়ে দেয়। আল্লাহ তার এ কাজ কবুল করেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ২৩৩, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ১৫২১)
মনে রাখতে হবে, পরিবেশের মালিক আমি নই। আমাকে কেবল ভোগের অধিকার দেওয়া হয়েছে। সেই ভোগের অধিকার আমার একার নয়, অবাধও নয়। আমার ব্যবহারের ফলে পরিবেশকে দূষিত করার অধিকার ইসলাম আমাকে দেয়নি। আমার চেতনা থাকবে, কোরবানি বর্জ্য আমিই অপসারণ করব। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সঠিক বোধ দান করুন। আমিন।
অতএব, একটি পরিচ্ছন্ন ও বর্জ্যমুক্ত শহর সুস্থ সমাজ, নিরাপদ পরিবেশ এবং উন্নত নাগরিক জীবনের ভিত্তি রচনা করে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নিজ নিজ অবস্থান থেকে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলা এবং অন্যদেরও এ বিষয়ে সচেতন করা। মনে রাখতে হবে, রাস্তা-ঘাট ও জনপদকে পরিষ্কার রাখা শুধু সভ্যতার পরিচয় নয়; এটি ইসলামের শিক্ষা, মানবতার দাবি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। যে সমাজ পরিচ্ছন্নতাকে গুরুত্ব দেয়, সে সমাজই প্রকৃত অর্থে সুস্থ, সুন্দর ও কল্যাণময় সমাজে পরিণত হয়।
বিডি প্রতিদিন