ইহকাল-পরকালে মায়ের খিদমতের উপকারিতা
মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
পৃথিবীতে ব্যবহৃত সবচেয়ে মধুর শব্দ মা। যে ভাষায়ই হোক না কেন, মাকে সম্বোধন করতে মানুষ যে শব্দ ব্যবহার করে, সে শব্দই তার কাছে সবচেয়ে মধুর শব্দ হয়।
মা মহান আল্লাহ প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। পৃথিবীতে সন্তানের প্রতি সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ত্যাগ ও মমতার প্রতীক হলেন মা। ইসলাম মায়ের মর্যাদাকে এত উঁচু স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে যে আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের নির্দেশের সঙ্গে মা-বাবার প্রতি সদাচরণের নির্দেশও দিয়েছেন। যে ব্যক্তি মায়ের খিদমত করে, তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মান, বরকত ও সফলতার অগণিত দ্বার খুলে যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না। আর তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বোলো।” (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৩)।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে মায়ের কষ্টের কথা স্মরণ করিয়ে বলেন, ‘আর আমি মানুষকে তার মা-বাবার ব্যাপারে (সদাচরণের) নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে; সুতরাং আমার ও তোমার মা-বাবার শুকরিয়া আদায় করো। প্রত্যাবর্তন তো আমার কাছেই।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৪)।
এ কারণেই ইসলামে মায়ের অধিকারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার উত্তম সঙ্গ লাভের সবচেয়ে বেশি হকদার কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি বলল, অতঃপর কে? মহানবী (সা.) বলেন, তোমার মা। সে বলল, তারপর কে? তিনি বলেন, তোমার মা। লোকটি বলল, অতঃপর কে? তিনি বললেন, অতঃপর তোমার বাবা। (বুখারি, হাদিস : ৫৯৭১)।
এই হাদিস প্রমাণ করে যে মায়ের খিদমত ও সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে একজন মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে। মায়ের খিদমত মানুষের সম্মান বৃদ্ধি করে। ইতিহাসে বহু মনীষী ও আল্লাহর প্রিয় বান্দার জীবনে এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাবেঈ উওয়াইস আল-কারনী (রহ.) রাসুল (সা.)-এর যুগে জীবিত থাকা সত্ত্বেও মায়ের সেবায় নিয়োজিত থাকার কারণে মদিনায় এসে সাক্ষাৎ করতে পারেননি। কিন্তু তাঁর মাতৃসেবার বরকতেই তিনি এমন মর্যাদা লাভ করেছিলেন যে রাসুল (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে তাঁর কাছে দোয়া চাইতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। (মুসলিম, হাদিস : ৬৩৮৫)।
বোঝা গেল, মায়ের খিদমত মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। এটি দুনিয়া ও আখিরাতে সন্তানের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে সহায়ক। মায়ের খিদমতের অন্যতম বড় প্রতিদান হলো জান্নাত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মায়ের পদতলে জান্নাত।’ (নাসায়ি, হাদিস : ৩১০৪)।
অর্থাৎ মায়ের সন্তুষ্টি ও সেবার মধ্যেই জান্নাতের পথ নিহিত রয়েছে। যে সন্তান মায়ের সেবা করে, আল্লাহ তার ওপর খুশি হন, ফলে তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ হয়ে যায়। তা ছাড়া মা-বাবার দোয়া আল্লাহর দরবারে খুব দ্রুত কবুল হয়। যে সন্তান মা-বাবার হৃদয় জয় করতে পারে, সে আল্লাহর রহমত ও মানুষের ভালোবাসা লাভ করে। সমাজে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং জীবনে বরকত নেমে আসে। অন্যদিকে মাকে কষ্ট দেওয়া, অবাধ্য হওয়া বা তাঁর অধিকার নষ্ট করা ইসলামে কবিরা গুনাহ।
আজকের ব্যস্ত ও স্বার্থকেন্দ্রিক সমাজে অনেক সময় বৃদ্ধ মায়েরা অবহেলার শিকার হন। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো তাঁরা নিজ ঘরে মৃত্যুবরণ করে পচে গলে যান, কিন্তু সন্তানদের কোনো খবর থাকে না- এমন নজিরও পৃথিবীতে আছে। অথচ মায়ের খিদমত শুধু একটি নৈতিক দায়িত্ব নয়; এটি মহান ইবাদত। তাঁর পাশে বসা, কথা শোনা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, প্রয়োজন পূরণ করা, স্নেহ ও সম্মানের সঙ্গে আচরণ করা- সবই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।
সুতরাং একজন মুমিনের উচিত মায়ের জীবদ্দশায় তাঁর সর্বোচ্চ খিদমত করা এবং মৃত্যুর পর তাঁর জন্য দোয়া, সদকা ও নেক আমলের মাধ্যমে উপকার পৌঁছানো। যে ব্যক্তি মায়ের সেবা করে, আল্লাহ তাকে মানুষের অন্তরে সম্মান দান করেন, তার জীবনে বরকত নাজিল করেন এবং আখিরাতে জান্নাতের সুসংবাদ দান করেন। তাই মায়ের খিদমত শুধু পারিবারিক কর্তব্য নয়; এটি সম্মান, সফলতা ও মুক্তির অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। মহান আল্লাহ সবাইকে সুবুদ্ধি দান করুন। আমিন।
বিডি-প্রতিদিন