• সিলেট, রাত ৮:৪১, ২৬শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

‘যারা জানে আর যারা জানে না উভয়ে সমান নয়’

admin
প্রকাশিত জুলাই ২৬, ২০২৬
‘যারা জানে আর যারা জানে না উভয়ে সমান নয়’

Manual4 Ad Code

‘যারা জানে আর যারা জানে না উভয়ে সমান নয়’

 

উম্মে আহমাদ ফারজানা

 

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, যারা জানে আর যারা জানে না-তারা কি কখনো সমান হতে পারে? উপদেশ গ্রহণ করে তো শুধু বিবেকবানরাই।’ (সুরা : ঝুমার, আয়াত : ৯)

এই আয়াতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বহু শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা আছে।

তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিম্নে তুলে ধরা হলো-

প্রথমত, ইসলাম জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানীদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। কোরআনের সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াতই ছিল-‘পড়ুন, আপনার সেই রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আল-আলাক, আয়াত : ১)

এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।’ (সহিহুল জামে, হাদিস নম্বর : ৩৯১৪)

এ থেকেই বোঝা যায়, ইসলামের ভিত্তিই জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

দ্বিতীয়ত, দ্বিন ও দুনিয়ার কল্যাণকর জ্ঞান অর্জনের প্রতি আন্তরিক হওয়া। একজন সৌভাগ্যবান মুসলিমের কর্তব্য হলো এমন জ্ঞান অর্জনে আন্তরিক হওয়া, যা তার দ্বিন ও দুনিয়ার কল্যাণ বয়ে আনে। আল্লাহ তাআলা তাদের নিন্দা করেছেন, যারা কেবল দুনিয়াবি জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থাকে। তিনি বলেন, ‘তারা পার্থিব জীবনের বাহ্যিক বিষয়ই শুধু জানে, কিন্তু আখিরাত সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ উদাসীন।’ (সুরা : আর-রুম, আয়াত : ৭)

ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘বেশির ভাগ মানুষ দুনিয়ার জীবন, উপার্জন ও এর নানা বিষয় ছাড়া আর কিছুই জানে না। তারা দুনিয়ার সম্পদ অর্জনে অত্যন্ত দক্ষ ও বিচক্ষণ; কিন্তু আখিরাতে যা তাদের উপকার করবে, সে সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ উদাসীন। যেন তাদের কোনো বিবেক বা দূরদৃষ্টি নেই।’

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বিনের গভীর জ্ঞান দান করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১)

ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘এই হাদিসে জ্ঞানের মর্যাদা, দ্বিনের গভীর জ্ঞান অর্জনের ফজিলত এবং এর প্রতি উৎসাহ আছে। কারণ দ্বিনের জ্ঞানই মানুষকে আল্লাহভীতির দিকে পরিচালিত করে।’

Manual1 Ad Code

তৃতীয়ত, যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকা। যে বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নেই, সে বিষয়ে মতামত দেওয়া বা ফতোয়া দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান ছাড়াই জটিল রোগের চিকিৎসা মানুষের কাছে বলে বেড়ায়, তবে সে মানুষের ক্ষতির কারণ হতে পারে; এমনকি নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানিরও কারণ হতে পারে। তখন অনুশোচনা করেও কোনো লাভ হবে না। এ প্রসঙ্গে ইমাম ইবন হাজার আল-আসকালানি (রহ.)-এর বিখ্যাত উক্তি-‘কোনো ব্যক্তি যখন নিজের বিষয়ের বাইরে কথা বলে, তখন সে বিস্ময়কর ভুল করে বসে।’

চতুর্থত, জ্ঞানের কোনো শেষ নেই। জ্ঞান এমন এক মহাসাগর, যার কোনো তীর নেই। পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।’ (সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ২৮২)

আর মানুষের অবস্থা হলো তারা জ্ঞানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তরে অবস্থান করে। আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক জ্ঞানীর ওপরে আছেন আরো অধিক জ্ঞানী।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৭৬)

পঞ্চমত, সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণের শিক্ষা। এই আয়াত মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়-জ্ঞানী ও অজ্ঞ কি কখনো সমান হতে পারে?

ইমাম তাবারি (রহ.) বলেন, ‘অজ্ঞ ব্যক্তি অন্ধকারে পথহারা মানুষের মতো। সে ভালো কাজের প্রতিদান আশা করে না এবং মন্দ কাজের শাস্তিকেও ভয় করে না।’

অতএব, সফল মানুষ সেই, যার হৃদয় জ্ঞান অর্জনের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় তাওফিক হলো মানুষ যেন বৈধ সব উপায়ে জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করে এবং প্রত্যেক বিষয়ে নির্ভরযোগ্য, সৎ, আল্লাহভীরু ও সুপ্রতিষ্ঠিত আলেমদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।

Manual8 Ad Code

ষষ্ঠত, প্রকৃত আলেম সেই, যে নিজের জ্ঞান অনুযায়ী আমল করে। জ্ঞান অর্জনের সর্বোচ্চ মর্যাদা তখনই লাভ হয়, যখন একজন ছাত্র বা আলেম নিজেই তার জ্ঞানের প্রথম উপকারভোগী হয়। সে নিজের জ্ঞান অনুযায়ী কথা বলে এবং আমল করে। ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘যারা প্রকৃত জ্ঞানী, তারা নিজের জ্ঞান দ্বারা উপকৃত হয় এবং সে অনুযায়ী আমল করে। আর যে ব্যক্তি নিজের জ্ঞানের দ্বারা উপকৃত হয় না এবং সে অনুযায়ী আমলও করে না, সে যেন অজ্ঞ ব্যক্তিরই সমতুল্য।’

সপ্তমত, আজ জ্ঞান অর্জন থেকে দূরে থাকার কোনো অজুহাত নেই। আল্লাহর অনুগ্রহে বর্তমান যুগে জ্ঞান অর্জনের অসংখ্য সহজ মাধ্যম সৃষ্টি হয়েছে। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, অনলাইন লাইব্রেরি, ইসলামী অ্যাপ, নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অনলাইন দারস ও ক্লাস-সবই জ্ঞান অর্জনের পথ সহজ করে দিয়েছে। তবে জ্ঞান গ্রহণের ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে-নির্ভরযোগ্য উৎস নির্বাচন করতে হবে। বিশুদ্ধ আকিদা ও সঠিক মানহাজ অনুসরণ করতে হবে। কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে চলতে হবে। সালাফে সালেহিনের মধ্যপন্থী ও ভারসাম্যপূর্ণ আদর্শকে অনুসরণ করতে হবে।

অষ্টমত, এই আয়াত জীবনের সব ধরনের জ্ঞানের ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে। এই আয়াত শুধু শরিয়তের জ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইসলামী জ্ঞান, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, প্রশাসন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, এবং মানবজীবনের সব উপকারী জ্ঞানের ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে। মানুষের মর্যাদা তার জ্ঞান ও দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। যে ব্যক্তি নিজের পছন্দের বা কর্মক্ষেত্রের বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করে, সে সমাজে আস্থা, সম্মান ও নেতৃত্বের স্থান লাভ করে।

Manual2 Ad Code

নবমত, ব্যক্তি, সমাজ ও জাতির উন্নতির মূল চাবিকাঠি হলো জ্ঞান। যে ব্যক্তি সমাজ বা জাতি জ্ঞান অর্জনকে জীবনের অংশ বানিয়ে নেয়, আল্লাহ তাকে বিরাট সফলতা দান করেন।

বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়-

শিক্ষিত ব্যক্তি ও অশিক্ষিত ব্যক্তির মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। শিক্ষিত সমাজ ও অশিক্ষিত সমাজের উন্নতির ব্যবধানও অত্যন্ত বড়। একটি জাতির অগ্রগতি, সভ্যতা, স্থিতিশীলতা ও নেতৃত্ব অনেকাংশেই তার শিক্ষার মানের ওপর নির্ভরশীল।

তাই জ্ঞানার্জন, জ্ঞানচর্চা এবং জ্ঞানের প্রসারই ব্যক্তি, সমাজ ও জাতির কল্যাণ, স্থিতিশীলতা, উৎকর্ষ ও উন্নতির সর্বোত্তম ও একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ।

এই আয়াত আমাদের শেখায় যে জ্ঞান মানুষকে মর্যাদাবান করে, সত্যের পথে পরিচালিত করে এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার দ্বার উন্মুক্ত করে। তবে সেই জ্ঞানই প্রকৃত কল্যাণকর, যা আল্লাহভীতি বৃদ্ধি করে, আমলে পরিণত হয় এবং মানুষের উপকারে আসে।

বিডি প্রতিদিন

Manual5 Ad Code

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com