• সিলেট, রাত ৮:০৯, ৫ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

হাদিস বর্ণনায় সতর্কতা আবশ্যক

admin
প্রকাশিত আগস্ট ৫, ২০২৬
হাদিস বর্ণনায় সতর্কতা আবশ্যক

Manual6 Ad Code

হাদিস বর্ণনায় সতর্কতা আবশ্যক

মুফতি দিদার হুসাইন

 

বর্তমানে হাদিসের ক্ষেত্রে অবহেলা ও অসতর্কতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। হাদিসের নামে কিছু পেলেই তা গ্রহণ করা হচ্ছে। যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই তা বর্ণনা করা হচ্ছে। ফলে সমাজে বিভিন্ন প্রকার মুনকার, ভিত্তিহীন ও জাল বর্ণনা ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে গেছে। অথচ হাদিস কোরআনের মতো ওহি এবং দ্বিনের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস। সুতরাং হাদিসের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে গ্রহণ করা ও বর্ণনা করা আবশ্যক।

এ প্রসঙ্গে এখানে কিছু দিক তুলে ধরা হলো—

১. সঠিকভাবে হাদিস বর্ণনাকারীর জন্য নবীজির

Manual6 Ad Code

দোয়া : আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মহানবী (সা.)-কে এ কথা বলতে শুনেছি যে ‘আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তিকে সজীব রাখুন, যে ব্যক্তি আমার থেকে কোনো হাদিস শুনেছে, এরপর তা অনুধাবন করেছে ও সংরক্ষণ করেছে এবং তা পৌঁছে দিয়েছে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৬৫৮)

Manual4 Ad Code

ইমাম মুসলিম (রহ.) বলেন, মহানবী (সা.) তাঁর হাদিস শ্রবণকারী ও প্রচারকারীর জন্য যখন দোয়া করেছেন তখন এই শর্তারোপ করেছেন যে সে তা যথাযথভাবে হেফাজত করবে এবং যেভাবে শুনেছে সেভাবেই পৌঁছাবে।

Manual4 Ad Code

সুতরাং যে ওই হাদিস ধারণাপ্রসূত ও অনুমানভিত্তিক বর্ণনা করবে, সে রাসুল (সা.)-এর শর্তের বিপরীত বর্ণনাকারী সাব্যস্ত হবে এবং রাসুল (সা.)-এর দোয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে না। (কিতাবুত তাময়িজ, পৃষ্ঠা : ৫৮-৫৯)

২. শুধু নির্ভরযোগ্য হাদিসই বর্ণনা করা যাবে : অনুমানভিত্তিক হাদিস বর্ণনা করা জায়েজ নেই।

কেবল তখনই হাদিস বর্ণনা করা যাবে, যখন নিশ্চিতভাবে জানা যাবে যে এটি নির্ভরযোগ্য কিতাবে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে যা পৌঁছেছে তা অন্যকে পৌঁছে দাও। যদিও তা একটি আয়াত হয়। এবং বনি ইসরাঈল থেকে বর্ণনা করো; কোনো অসুবিধা নেই। আর যে ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে মিথ্যা বলবে, সে যেন জাহান্নামকে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।’
(বুখারি, হাদিস : ৩৪৬১)

ইবনে হিব্বান (রহ.) বলেন, মহানবী (সা.) কর্তৃক উম্মতকে তাঁর থেকে পরবর্তীদের কাছে হাদিস পৌঁছানোর আদেশ দেওয়া এবং তাঁর (সা.) ব্যাপারে মিথ্যাবাদীর জন্য জাহান্নাম অবধারিত হওয়ার উল্লেখ করাটা এই কথার প্রমাণ বহন করে যে তিনি তাঁর পক্ষ থেকে এমন বিষয়ই পৌঁছানোর আদেশ করেছেন, যা তাঁর থেকে প্রমাণিত।
(কিতাবুল মাজরুহিন, ভূমিকা : ১/১৫)

৩. জাল হাদিস বর্ণনা করা কবিরা গুনাহ : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ব্যাপারে এমন কথা বলবে, যা আমি বলিনি, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।’ (বুখারি, হাদিস : ১০৯)

৪. হাদিস বর্ণনায় সাহাবায়ে কেরামের সতর্কতা : সাহাবায়ে কেরাম হাদিস বর্ণনায় সর্বোচ্চ সতর্ক ও আমানতদার ছিলেন। তাঁদের সতর্কতা অবলম্বনের অনেক ঘটনা হাদিসের কিতাবে পাওয়া যায়। আবদুল্লাহ বিন জুবাইর (রা.) বলেন, আমি আমার পিতা জুবাইর (রা.)-কে বললাম, আমি আপনাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে হাদিস বর্ণনা করতে দেখি না, যেমন—অমুক অমুক সাহাবি বর্ণনা করেন? তিনি বললেন, আমি কখনো নবীজির সঙ্গ ত্যাগ করিনি। কিন্তু আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করবে, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।’ (বুখারি, হাদিস : ১০৭)

৫. যাচাই-বাছাই ছাড়া হাদিস বর্ণনা করা মিথ্যার

অন্তর্ভুক্ত : আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘এবং তুমি এমন জিনিসের পেছনে পোড়ো না, যার ব্যাপারে তোমার নিশ্চিত জ্ঞান নেই। জেনে রেখো, কান, চোখ ও অন্তর—এসব সম্পর্কে তোমাদের জিজ্ঞেস করা হবে।’
(সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩৬)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা-ই শুনে তা-ই বর্ণনা করে দেয়।’ (মুকাদ্দিমা সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫)

Manual4 Ad Code

উল্লিখিত আয়াত ও হাদিস দ্বারা বোঝা গেল, কোনো কথা বা সংবাদ শোনা বা পাওয়া মাত্রই বলা যাবে না। এমনকি জাগতিক বিষয়েও না। বলতে হলে আগে যাচাই করতে হবে, এটা সঠিক কি না? বর্ণনাযোগ্য কি না? যাচাই-বাছাই ছাড়া বর্ণনা করলে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হবে এবং গুনাহগার হবে।

এ যদি হয় সাধারণ বিষয়ের অবস্থা, তাহলে নবীজির হাদিসের অবস্থা কেমন হবে তা তো সহজেই অনুমেয়। রাসুল (সা.)-এর হাদিস অত্যন্ত বেশি সতর্কতার সঙ্গে তাহকিক করে বর্ণনা করতে হবে, অন্যথায় বড় অপরাধী ও মিথ্যুক হিসেবে বিবেচিত হবে। অসতর্কতার সঙ্গে বর্ণনা করলে হাদিসের নামে মুনকার, ভিত্তিহীন ও অবাস্তব বিষয় প্রসার লাভ করবে, যা উম্মতের জন্য ক্ষতিকর।

৬. লোকমুখে প্রচলিত বর্ণনার ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন জরুরি : দুঃখজনক কথা হলো আমাদের সমাজে প্রচুর পরিমাণে ‘মুনকার’, ‘ওয়াহি’ ও ভিত্তিহীন হাদিস প্রসিদ্ধ হয়ে গেছে। এমনকি যে বিষয়ে সহিহ হাদিস রয়েছে, সে ক্ষেত্রেও সহিহ হাদিসের পরিবর্তে জাল হাদিস স্থান করে নিয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো আমরা যেকোনো বিষয়ে হাদিস বলাকে সহজ মনে করেছি। কিন্তু হাদিসের তাহকিক ও যাচাই-বাছাইকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না। এটা কোনোভাবেই উচিত নয়। এটা হাদিস বর্ণনার নীতিমালাবিরোধী কাজ।

কেউ কেউ লোকমুখে প্রসিদ্ধ হওয়াকে প্রমাণিত হওয়ার সমার্থক মনে করেন। অথচ প্রসিদ্ধ হওয়াটা প্রমাণিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। হাদিস প্রসিদ্ধ হয়ে দুর্বলও হতে পারে, হতে পারে ভিত্তিহীন। এমনকি কিছু প্রসিদ্ধ বিষয় এমনও আছে, যার কোনো সনদও নেই।

সুতরাং এ ধরনের বর্ণনার ক্ষেত্রে আরো অধিক সতর্কতা অবলম্বন ও যাচাই-বাছাই করতে হবে।

৭. ইসরাঈলি বর্ণনা : ইসরাঈলি বর্ণনা বলা হয় ওই সব বর্ণনাকে, যা ইহুদি-নাসারা থেকে বর্ণিত। এগুলোর কিছু বাইবেলে তালমুদ থেকে গৃহীত। কিছু এসেবের ব্যাখ্যাগ্রন্থ থেকে। আর কিছু তাদের মৌখিক রেওয়ায়েত থেকে বর্ণিত। ইসরাঈলি বর্ণনার ক্ষেত্রেও শরিয়তের মূলনীতি হলো যাচাই-বাছাই করে বর্ণনা করতে হবে। কোরআন-হাদিস বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য দলিল দ্বারা কোনো ইসরাঈলি বর্ণনার অসারতা প্রমাণিত হলে তা পরিহার করতে হবে। তেমনিভাবে যা নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত নয়, তা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। আকিদা ও বিধি-বিধান বিষয়ে ইসরাঈলি বর্ণনা তো কোনোভাবেই উল্লেখ করা যাবে না।

কিন্তু আমাদের সমাজে এ ক্ষেত্রেও চরম শিথিলতা দেখা যায়। অনেকে কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়া সত্য-মিথ্যা সব ধরনের ইসরাঈলি রেওয়ায়েত বর্ণনা করছে ও লিখছে। ফলে সমাজে অনেক মিথ্যা, উদ্ভট ও কোরআন-হাদিস বিরোধী ইসরাঈলি বর্ণনা প্রসিদ্ধ হয়ে গেছে। কেউ কেউ তো এগুলোকে সত্য বা হাদিসই মনে করে। সুতরাং ইসরাঈলিয়াতের ক্ষেত্রেও পূর্ণ সতর্কতা ও সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে। (আল-ইসরাঈলিয়্যাত ওয়াল মাওজুআত ফি কুতুবিত তাফসির : ৮, প্রচলিত জাল হাদিস : ১/১৬৫-১৭২)

৮. দুর্বল হাদিসের ব্যাপারে সতর্কতা : কিছু শর্তসাপেক্ষে আমলের ফজিলত সম্বলিত দুর্বল হাদিস বর্ণনা করা জায়েজ। যেমন—‘মুনকার’, ‘মাতরুহ’ এবং অত্যধিক দুর্বল না হতে হবে। আর জইফকে জইফ হিসেবেই বর্ণনা করতে হবে। সহিহ, হাসান-এর মতো বর্ণনা করা যাবে না। কিন্তু এসব শর্তের ব্যাপারে শিথিলতা ও অবহেলার কারণে দুর্বল হাদিস বর্ণনায় অসতর্কতা আজ সর্বত্র ব্যাপক হয়ে পড়েছে।

মোটকথা, সর্বপ্রকার হাদিসের ব্যাপারে আমাদের পূর্ণ সচেতন থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই তাহকিক করে জানতে হবে যে হাদিসটি বর্ণনাযোগ্য ও আমলযোগ্য কি না? উলামায়ে কেরামের মতভেদ থাকলে জানতে হবে যে নির্ভরযোগ্য মতানুসারে সে হাদিসটি বর্ণনাযোগ্য কি না? আর এসবের জন্য নিরাপদ তরিকা হলো হাদিসশাস্ত্রে পারদর্শীদের শরণাপন্ন হওয়া।

 

 

বিডি প্রতিদিন

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com