সিলেটসহ সারাদেশে ইউপি নির্বাচন: ব্যয়ের সাথে জামানতও বাড়ছে কয়েক গুণ!
অনলাইন ডেস্ক
সিলেটসহ সারাদেশে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে প্রার্থীদের নির্বাচনি ব্যয়ের সীমা প্রায় দ্বিগুণ এবং জামানত পাঁচগুণ বাড়াচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইউপি নির্বাচন বিধিমালার সংশোধনীতে চেয়ারম্যান প্রার্থীর সর্বোচ্চ নির্বাচনি ব্যয় ৫ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্য (মেম্বার) প্রার্থীর ব্যয় ১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত ৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা এবং মেম্বার প্রার্থীর জামানত ১ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সংশোধনীটি আইন মন্ত্রণালয় থেকে ভেটিং হয়ে এসেছে। সব ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহে কমিশন এসআরও নম্বর দেওয়ার জন্য এটি আবার মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। পাশাপাশি উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন বিধিমালাও পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিধিমালাটি ভেটিংয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, অন্তত কিছু নির্বাচন চলতি বছর করার চেষ্টা করছি। চলতি মাসেই তপশিল দেওয়া হতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়েই ভোট শুরু করার সিদ্ধান্ত রয়েছে।
তবে নির্বাচন শুরুর সময় নির্ধারণে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষাও বিবেচনায় নিচ্ছে কমিশন। এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ভোটকেন্দ্র হিসেবে স্কুল-কলেজ ব্যবহার করা হয় এবং এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করেন। তাই পরীক্ষা চলাকালে নির্বাচন করা সম্ভব নয়। সম্ভব হলে বার্ষিক পরীক্ষার আগে এক ধাপ নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
ইসি সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে চলতি সপ্তাহেই সার্বিক সিদ্ধান্তে আসতে পারে ইসি। ইউনিয়ন পরিষদসহ অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ভোটের দিনক্ষণ কিংবা কবে থেকে নির্বাচন শুরু করা যায়—এসব বিষয়ে কমিশন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
জানা যায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে মাঠপর্যায়ে সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের তালিকা চূড়ান্ত করেছে ইসি। প্রতিটি স্তরের স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ২৫ দিন আগে ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ করা হবে।
৩১ জুলাই পর্যন্ত নতুন ভোটার হওয়ার সুযোগ দেওয়ার পর তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪০৩ জন। এতে দেশে মোট ভোটার দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৫৫ লাখ ১০ হাজার ৬৬৫, নারী ৬ কোটি ৩২ লাখ ৬৫ হাজার ৭১১ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৬৭ জন। ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, এসব ভোটার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোট দেবেন। ভোটার এলাকা স্থানান্তরের আবেদনের সময় ছিল ৭ সেপ্টেম্বর এবং তা নিষ্পত্তির শেষ সময় ছিল ১০ সেপ্টেম্বর। এখন ভোটার তালিকা মুদ্রণে যাবে বলে জানিয়েছে সূত্র।
এদিকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন ও বিধিতে বেশ কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে ইসি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোনো আসনে একক প্রার্থী থাকলে ‘না’ ভোটের বিধান চালু করা হলেও ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আইন ও বিধির সংশোধনীতে তা যুক্ত করা হয়নি। এ ছাড়া সিটি করপোরেশন ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার যে সুযোগ ছিল, সেটিও বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে ইসি। স্থানীয় সরকার আইন ও বিধি সংশোধনের প্রস্তাব এরই মধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন সংশোধনের প্রস্তাবে হলফনামায় নতুন তথ্য যুক্ত করা এবং অসত্য তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। দ্বৈত নাগরিক এবং ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের নির্বাচনে অযোগ্য করার প্রস্তাবও রয়েছে।
প্রস্তাবে নির্বাচনি অপরাধে সাজা বাড়ানোর পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে নির্বাচন বন্ধ করার ক্ষমতা ইসির হাতে রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে প্রার্থীদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করেনি কমিশন। তাই আগের মতোই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকছে না।
চূড়ান্ত প্রস্তাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে যুক্ত করা হয়েছে। দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অযোগ্য করার প্রস্তাব থাকলেও কেউ অন্য দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
এ ছাড়া এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বক্ষণিক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাকরিতে থেকে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ঋণখেলাপি ও বিলখেলাপি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র জমা হয়েছে, তাদেরও নির্বাচনে অযোগ্য করার প্রস্তাব রয়েছে।
সূত্র জানায়, এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধিমালা সংশোধন করা হয়েছে। বর্তমানে নির্বাচন বিধিমালা সংশোধনের কাজ চলছে। আর ইসির পাঠানো প্রস্তাবগুলো আইনে যুক্ত না হলে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ভোটের আয়োজন করবে কমিশন।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকবে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তবে স্থানীয়ভাবে বিএনপি-সমর্থিত নির্দিষ্ট প্রার্থী থাকতে পারেন বলে জানান তিনি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলেও কোনো প্রার্থী কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত, তা স্থানীয়ভাবে ভোটারদের কাছে পরিচিত হতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতায় এর প্রভাব পড়বে না।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপলক্ষে আচরণবিধির যথাযথ প্রতিপালন নিশ্চিতে করতে সংশ্লিষ্ট সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার বা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে জরিমানা আরোপের ক্ষমতা দেওয়া এবং সহকারী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ইউপিতে ভোটে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব দেওয়ার চিন্তা করছে ইসি। এ বিষয়ে সম্প্রতি ইসির এক সমন্বয় সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে অনুমোদনের জন্য নথি উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে। ওই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোন কোন ভোটকেন্দ্রে সিটি ক্যামেরা রয়েছে, তার তথ্য চেয়ে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি মাঠপর্যায়ে চিঠি দিয়েছে বলেও জানা গেছে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থী, সমর্থক ও ভোটারদের আচরণবিধি প্রতিপালনে তপশিল ঘোষণার পর মাঠপর্যায়ে যাবেন নির্বাচন কমিশনাররা। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে যে ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রাখা প্রয়োজন, তার সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তপশিল ঘোষণার পর প্রয়োজনে আমরা মাঠপর্যায়ে যাব।
সিলেটভিউ২৪ডটকম