সিলেট চার লেন মহাসড়কের ‘স্বপ্ন’ এখন ‘দুঃস্বপ্ন’, বাড়ছে মৃ ত্যু ঝুঁ কি
এহিয়া আহমদ
চার লেনে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে সিলেট-তামাবিল মহাসড়কে। গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক করিডরপথে বালুভর্তি ট্রাক, অসংগঠিত লেন ব্যবহার আর বছরের পর বছর সংস্কারহীনতার কারণে প্রতিদিন ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। রাস্তার ডান পাশ দিয়ে উল্টো পথে গাড়ি চালানোর প্রবণতা তো আছেই, তার ওপর বৃহৎ খানা-খন্দে ভরা পুরো মহাসড়কটি এখন স্থানীয়দের কাছে ‘মরণফাঁদ’ নামেই পরিচিত।
সিলেট–তামাবিল মহাসড়ক ঘুরে দেখা যায়, ৫৬ দশমিক ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি একদিকে সিলেট নগরের কেন্দ্রকে, অন্যদিকে ভারত সীমান্ত সংলগ্ন তামাবিল স্থলবন্দর এলাকার সঙ্গে যুক্ত করেছে। ঢাকা–সিলেট জাতীয় মহাসড়ক (এন-২)-এর ২২৮ দশমিক ৩ কিলোমিটার থেকে ২৮৪ দশমিক ৪৫৭ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এই অংশটি আন্তর্জাতিক যোগাযোগপথ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, সিলেট সদর উপজেলা পেরোলেই জৈন্তিয়া গেইট থেকে শুরু হয় সড়কের প্রকৃত দুর্দশা। তামাবিল পর্যন্ত পুরো পথে অধিকাংশ জায়গাই ভাঙাচোরা, কোথাও কার্পেটিং উঠে গেছে, কোথাও আবার বড় বড় গর্ত তৈরি হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে পাখিটিকি, দরবস্ত (শেলটেকের সামনে) বাঁধ এলাকা, দরবস্ত বাজার, সারিঘাট বাজার, জৈন্তা ডিগ্রি কলেজের সামনে, সারিঘাট উত্তর ও দক্ষিণ পাড়, হাইওয়ে পুলিশ সম্মুখ, কদমখাল, রাংপানি, ৪ নম্বর আসামপাড়া এবং ৪ নম্বর বাংলাবাজারের বাঘের সড়ক এলাকা-এসব স্থানে গর্ত এতটাই গভীর যে সামান্য ভুল হলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। অনেক জায়গায় গাড়ি গর্তে পড়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত।
দেখা গেছে, মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে গভীর গর্ত ও ধস এড়াতে চালকদের অনেকেই ডান দিকে উঠে যান। আর এই উল্টো লেন ব্যবহারের প্রবণতাই ঘটাচ্ছে প্রায়শই ভয়াবহ দুর্ঘটনা। এমনই এক করুণ ঘটনার উল্লেখ করেন স্থানীয়রা। ২০২৩ সালের ৮ জুলাই, জৈন্তাপুরে সিলেট–তামাবিল মহাসড়কের সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর সামনে শ্রীখেল নামক অংশে ভাঙা রাস্তা পাশ কাটাতে ডান দিকে চলে আসা একটি বাসের সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে পাঁচজন নিহত এবং অন্তত ১৫ জন আহত হন। স্থানীয়দের ভাষায়-‘এ রাস্তায় এমন দুর্ঘটনা খুব সাধারণ ঘটনা। শুধু বড় হলে খবর হয়, বাকি ঘটনাগুলোর হিসাবও থাকে না।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ছয়-সাত বছর ধরে সড়কটি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। কোথাও কার্পেটিং উঠে গেছে, কোথাও পাথর সরে গেছে, কোথাও পুরো অংশ বসে গেছে। সবশেষ আড়াই বছর আগে নামকাওয়াস্তে কিছু সংস্কার করা হলেও তা টেকেনি। বর্ষার প্রথম ঝড়েই উঠে গেছে সেই কার্পেটিং।
বাসিন্দারা জানান, এত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মহাসড়ক অথচ বছরের পর বছর কোনো স্থায়ী সংস্কার হয় না। রাস্তা যখন একেবারেই খারাপ হয়ে যায়, তখন সামান্য ইট বিছিয়ে বা প্রলেপ দিয়ে শুধু নামমাত্র জোড়াতালি দেওয়া হয়, যা কয়েকদিনের ব্যবহারে আবার আগের চেয়েও খারাপ হয়ে পড়ে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) বড় ধরনের কোনো কাজই করছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। কারণ হিসেবে তাঁরা চার লেন প্রকল্পের দায়ভার হস্তান্তর–সংক্রান্ত জটিলতার কথা বলছেন। আর এই প্রশাসনিক ধাক্কাধাক্কির মাঝেই প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে হাজারো মানুষকে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলেন, ‘সিলেট–তামাবিল মহাসড়কটি শুধু একটি আঞ্চলিক সড়ক নয় এটি এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পর্যটনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ একটি মহাসড়ক বছরের পর বছর অবহেলা আর অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে আজ পুরোপুরি বেহাল হয়ে পড়েছে। রাস্তার অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে যে স্থানীয়দের কাছে এটি এখন আর যোগাযোগপথ নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ ‘মৃত্যুফাঁদ’। প্রতিদিনই কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটছে। বড় দুর্ঘটনা হলে খবর হয়, কিন্তু ছোট ছোট দুর্ঘটনার হিসাবই মেলে না।’
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জৈন্তাপুর উপজেলার ১ নম্বর নিজপাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইন্তাজ আলী, ৪ নম্বর দরবস্ত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাহারুল আলম বাহার ও স্থানীয় বাসিন্দা ও জাফলং ইউনিয়নের বাসিন্দা স্কুল শিক্ষক নজমুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা বহুবার সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের সঙ্গে কথা বলেছি। তখন সওজ জানায় ‘মহাসড়কটি এখন ফোর লেন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, সওজের আর কোনো ক্ষমতা নেই।’ আবার ফোর লেন কর্তৃপক্ষকে অবগত করলে তারা বলে, ‘আমরা অর্থ পাই না, বরাদ্দ নেই, তাই কাজ শুরু করতে পারছি না।’ অর্থাৎ দুই পক্ষই দায়িত্ব এড়িয়ে চলছে, আর এই দোষারোপের খেলায় ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ মানুষ। প্রতিদিন রাস্তায় জীবন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে যাত্রী, চালক ও স্থানীয়দের।
এদিকে দক্ষিণ সুরমার পীর হাবিবুর রহমান চত্বর থেকে তামাবিল পর্যন্ত মোট ৫৬.১৬ কিলোমিটার সড়ককে চার লেনে উন্নীত করার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ার উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সীমান্ত বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বৈদেশিক-দেশীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নিরাপদ, টেকসই সড়কব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রকল্পের অগ্রগতি না থাকায় উদ্দেশ্য এখন বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। প্রকল্পের কাজ ঝুলে থাকায় সড়ক ও জনপথ বিভাগও (সওজ) বড় ধরনের সংস্কার করতে পারছে না। কারণ, প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকায় স্থায়ী সংস্কার সওজের পক্ষে আর করা সম্ভব নয়। ফলে বছরের পর বছর ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে থাকা এই মহাসড়কটি এখন আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) সিলেট সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের পরিচালক আবু সাঈদ মো. নাজমুল হুদা বলেন, ‘অতিরিক্ত ওজনবাহী ট্রাকের চাপেই মূলত সিলেটমুখী লেনের বাম পাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেউ আইন মানে না। সবই ডান দিক দিয়ে চলে আসে-এটা আমি জানি। আইন না মানার জন্য দিন দিন দুর্ঘটনা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে সকলের উচিৎ আইন মেনে গাড়ি চালানো তাহলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে।’
তিনি বলেন, ‘সড়কের সংস্কারের বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়রসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ইতোমধ্যে সওজ প্রধান ও সচিবের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থের আবেদন করা হয়েছে। বরাদ্দ মিললে দ্রুতই মহাসড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে কার্পেটিংসহ জরুরি সংস্কার করা হবে। সাড়া ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাহী প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কিছু সময় লাগলেও আগামী এক মাসের মধ্যেই কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। এখন বর্ষা নেই, তাই বড় ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো কেটে সমান করে যান চলাচলের উপযোগী করা হবে। তবে কার্পেটিং পরবর্তী পর্যায়ে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে করা হবে। সম্প্রতি পরিদর্শনকারী একটি প্রতিনিধি দলের বিষয়ে তিনি জানান, প্রায় সম্প্রতি কিছু দিন আগে পরিকল্পনা কমিশন, আইএমইডি, বিআরটিএ, মন্ত্রণালয় ও সওজের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছে। প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর সুপারিশ তারা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আনুষ্ঠানিক সুপারিশ এখনো সওজকে জানানো হয়নি। কাগজপত্র হাতে এলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে বলে জানান তিনি।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া