বল এখন রাজনৈতিক দলের কোর্টে
অদিতি করিম
অবশেষে বহুলপ্রতীক্ষিত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলো। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আনুষ্ঠানিকভাবে এ তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ২৯ ডিসেম্বর। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি। রিটার্নিং অফিসারের আদেশের বিরুদ্ধে কমিশনে আপিল দায়েরের শেষ তারিখ ১১ জানুয়ারি। কমিশনে দায়েরকৃত আপিল নিষ্পত্তির তারিখ ১২ থেকে ১৮ জানুয়ারি। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দ ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনি প্রচার চলবে ২২ জানুয়ারি থেকে ভোট গ্রহণ শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত তথা ১০ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সব রাজনৈতিক দল এ তফসিলকে স্বাগত জানিয়েছে। দলগুলো নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। নির্বাচন কমিশন নিশ্চয়ই অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে নিরপেক্ষ এবং নির্মোহভাবে নির্বাচন পরিচালনা করবে। প্রধান উপদেষ্টা এ নির্বাচন উৎসবমুখর করার জন্য সব প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন।
তবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দায়িত্ব একমাত্র নির্বাচন কমিশন বা সরকারের নয়। বিশেষ করে এবারের নির্বাচন সফল করতে সব দলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। এ নির্বাচন শুধু জয়-পরাজয়ের নয়, এটি জুলাই বিপ্লবের পূর্ণতা অর্জনের নির্বাচন। রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রমাণ করতে হবে যে, যে গণতন্ত্রের জন্য তারা লড়াই করেছে সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তারা আন্তরিক। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তাই গণতন্ত্রের আন্দোলনের চূড়ান্ত ধাপ। দলগুলোকে তাই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। যে কোনো মূল্যে জয়ী হওয়ার চেয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।
একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করতে দলগুলোকে পাঁচটি দায়িত্ব অবশ্যই পালন করতে হবে। প্রথমত মনে রাখতে হবে, এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভোটারদের অংশগ্রহণ। নির্বাচনে যদি বিপুলসংখ্যক ভোটার ভোট দিতে যান, তারা যদি নির্ভয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন তাহলেই এ নির্বাচন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক বিবেচিত হবে। ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার প্রধান দায়িত্ব রাজনৈতিক দলের। কাজেই নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের প্রধান কাজ হবে ভোটের দিন বেশিসংখ্যক ভোটারকে কেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করা। মনে রাখতে হবে, নির্বাচন কমিশন বা সরকারের কথায় জনগণ ভোট দিতে যাবে না। জনগণ ভোট দেবে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের কারণে। দ্বিতীয়ত ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির কোনো বিকল্প নেই। সশস্ত্র বাহিনী এবং পুলিশ যতই নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করুক না কেন, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা যদি দায়িত্বশীল এবং সহনশীল আচরণ না করেন তাহলে নির্বাচনকালীন সহিংসতা বন্ধ হবে না। নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের কারণেই অধিকাংশ সহিংসতা ঘটে। প্রার্থীরা মাঠ দখল রাখতে পেশিশক্তির প্রয়োগ করেন। সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন প্রার্থীর পৃষ্ঠপোষকতায় বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ভোটের আগে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল, বিরুদ্ধ প্রার্থীর সমর্থকদের ওপর আক্রমণের ঘটনা শুধু নির্বাচনি পরিবেশ নষ্ট করে না, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। বিশেষ করে ভোটের দিন কেন্দ্র ও বুথ দখল সংস্কৃতি বাংলাদেশে অনেক পুরোনো। এবারের নির্বাচনে যদি দলগুলো এ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারে, তাহলে এ নির্বাচনও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন একটি ভালো সরকার গঠন করতে পারবে না।
তৃতীয়ত নির্বাচন একটি রাজনৈতিক খেলা। এ খেলায় কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। এজন্যই নির্বাচন কমিশন আচরণবিধি তৈরি করেছে। এ আচরণবিধি হলো রুলস অব দ্য গেম। নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এতে নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট হয়। নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার পথে অন্যতম অন্তরায় হলো আচরণবিধি অমান্য। এবার নির্বাচন নানান কারণেই আলাদা। একটি রক্তস্নাত আন্দোলনের মাধ্যমে এ নির্বাচনের পটভূমি তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কারের আকাক্সক্ষা লালন করে রক্ত দিয়েছেন তরুণরা। তাদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে এ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই আচরণবিধি মানতে হবে। তা না হলে এ নির্বাচন একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন হবে না, বরং আরেকটি বিতর্কিত নির্বাচন হিসেবে জনগণের মধ্যে হতাশা ছড়াবে।
চতুর্থত নির্বাচন এলেই প্রার্থীরা প্রশাসন এবং নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের পক্ষে টানার অনভিপ্রেত এবং অনাকাক্সিক্ষত প্রতিযোগিতা শুরু করেন। নির্বাচনের সঙ্গে দায়িত্ব পালনকারীদের হয় ভয়ভীতি অথবা প্রলোভন দেখানো হয়। যাতে তাঁরা বিশেষ প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অনেক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলেন। এতে নির্বাচনের সর্বনাশ হয়। রাজনৈতিক দল এবং সব প্রার্থীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করবে না। নির্বাচনের দায়িত্ব পালনকারীদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে না। ‘আমার লোক’ খোঁজার প্রবণতা থেকে সরে আসবে। প্রার্থীরা যদি প্রশাসনের ওপর নির্ভর না করেন তাহলে প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকতে বাধ্য।
পঞ্চমত নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক দলে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং অবৈধ দখলদারদের কদর বাড়ে। এরা প্রার্থীদের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ করে। এদের মাধ্যমেই নির্বাচনে কালো টাকা আর পেশিশক্তির প্রভাব বাড়ে। এরা জনগণকে ভয় দেখায়, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোর করে নির্বাচনের জন্য অর্থ আদায় করে। এর ফলে শুধু যে নির্বাচনের পরিবেশই নষ্ট হয় তা নয়, দেশে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের অশুভ আঁতাত গণতন্ত্র, সুশাসন এবং দেশের উন্নয়নে বড় বাধা। এবার নির্বাচনে যদি প্রার্থীরা জনগণের চেয়ে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের ওপর নির্ভর করেন, তাহলে গণতন্ত্র পথ হারাবে।
প্রধান উপদেষ্টা তাঁর কথা রেখেছেন। ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। এবার রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রমাণ করতে হবে তারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তরিক এবং দায়িত্বশীল। নির্বাচন এমন একটি খেলা যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোই খেলোয়াড়। সরকার এবং নির্বাচন কমিশন এখানে রেফারি মাত্র। খেলোয়াড়রা যদি ফাউল করে তাহলে কখনো খেলা সুন্দর হয় না। তফসিল ঘোষণার পর এখন দলগুলোর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। তাদের কাজের ওপর নির্ভর করবে আগামী নির্বাচন সেরা নির্বাচন হবে, নাকি নির্বাচনি ট্রেন মাঝ পথে লাইনচ্যুত হবে।
বিডি প্রতিদিন