ভবিষ্যৎ সরকারপ্রধানকে যা করতে হবে
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের বন্দি গণতন্ত্রকে মুক্ত করার বিপুল সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। যে গণতন্ত্রের জন্য বাংলাদেশের জনগণ ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভাজনের পর থেকে সংগ্রাম করেছে, তা মেঘের আড়াল থেকে ক্ষণিকের মতো চাঁদের মতো দেখা দিয়ে আবার ঘন মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেছে। পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর ২৪ বছরেও বাঙালি গণতন্ত্রের স্বাদ পায়নি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক কেটে গেলেও গণতন্ত্র আপন চেহারায় আবির্ভূত হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতায় সামরিক শাসন অথবা সামরিক কর্তৃত্বের অধীনে বেসামরিক শাসন এসেছে। তাতে শুধু গণতন্ত্র নয়, দেশের উন্নয়নের সব পদক্ষেপ মুখ থুবড়ে পড়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এযাবৎকালের নজিরবিহীন ও সফল বিপ্লবের মধ্য দিয়ে মাত্র সাত মাস আগে কারচুপি ও প্রহসনের নির্বাচনে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকারের পতন ও দেশ ছেড়ে পালানোর ঘটনা দেশবাসীর জন্য প্রথমবারের মতো নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতায় দেখার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। দেশের সর্ববৃহৎ ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। যারা তিন মেয়াদে (১৯৭৯-১৯৮২, ১৯৯১-১৯৯৬ ও ২০০১-২০০৬) সরকারে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। সেই দলের শীর্ষ নেতা তারেক রহমান জুলাই বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে প্রত্যাবর্তন করায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপিকে বিজয়ী করার গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ২৫ ডিসেম্বর জনগণ তাঁকে যেভাবে অভ্যর্থনা জানিয়েছে, তা তাঁর ও তাঁর দলের পক্ষে দেশবাসীর আস্থারও একটি দৃষ্টান্ত।
‘গণতন্ত্র’ কী, তা বাংলাদেশের জনগণকে বুঝতে দেননি আমাদের রাজনৈতিক নেতারা। সারা জীবন গণতন্ত্রের নামে সংগ্রাম করে ক্ষমতায় আসামাত্র জনগণকে ধোঁকা দিয়ে তাদের ওপর একদলীয় স্বৈরশাসন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সদ্য স্বাধীন দেশে জনগণের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা পদদলিত করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার রাজনৈতিক নাটকের মঞ্চায়ন করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি গণতন্ত্রের নামে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু করেছিলেন, তার মাধ্যমে জনগণকে কার্যত বোঝাতে চেষ্টা করেছে যে গণতন্ত্র বাংলাদেশের জন্য নয়, বাংলাদেশও গণতন্ত্রের জন্য নয়। এর মধ্য দিয়ে তিনি একক ক্ষমতা উপভোগ করতে চেয়েছিলেন, তাঁর জীবৎকালে নির্বাচিত হয়ে অন্য কোনো দলের দেশ পরিচালনার সুযোগ লাভের সব পথ অবরুদ্ধ করে। তাঁর সে স্বপ্নসাধ পূরণ হয়নি। হওয়ার কথাও ছিল না। আধুনিক যুগে কজন মানুষ ব্যক্তিপূজার পূজারি হতে পারে? বাংলাদেশের জনগণও তাঁর পূজারি বা দাস হয়নি। সচেতন জনগণের কেউই ‘আমি’ ও ‘আমার’ দাম্ভিকতার বোলচালের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে চায়নি। শেখ মুজিব তাঁর ক্ষমতার লোভ, স্বজনপ্রীতি ও সর্বস্তরে দুর্নীতির ডালপালা গজানোর সুযোগ দিয়ে নিজের দুঃখজনক পরিণতি ডেকে এনেছিলেন। পাশাপাশি সম্ভাবনাময় সদ্য স্বাধীন দেশটির রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের যে প্রতিবন্ধকগুলো স্থাপন করে গিয়েছিলেন, যা কাটিয়ে উঠে দেশকে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে বহু বছর লেগে গেছে।
একজন ব্যক্তির ওপর একটি রাজনৈতিক দল নির্ভরশীল হয়ে উঠলে দল, দেশ ও জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের আশা করা যায় না। আইউব খানও পারেননি, জনগণের বিপুল সমর্থনপুষ্ট শেখ মুজিবুর রহমানও পারেননি। বরং দেশকে তাঁরা বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য ও অরাজকতার মধ্যে রেখে বিদায় নিয়েছেন
বাংলাদেশের জনগণ যেহেতু জীবনের বিনিময়ে হলেও ‘গণতন্ত্র’ ছাড়া আর কিছু কিছু চায় না। তারা তাদের পরিচালনাকারী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও গণতন্ত্র চায় এবং এটাও দেখতে চায় যে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক সরকার কর্তৃক পরিচলিত হোক। কিন্তু তারা দুঃখের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করে যে যে দলগুলোকে তারা পছন্দ করে এবং ভোট দিয়ে সরকারে পাঠায়, সেই দলগুলোর শীর্ষ পদ আজীবন আঁকড়ে রাখেন একজন মাত্র ব্যক্তি। দলগুলোতে যদি একজন মাত্র ব্যক্তি যুগের পর যুগ দলটির দলের শীর্ষ পদ দখল করে রাখেন, তাহলে তাঁরা জনগণকে ‘গণতান্ত্রিক সরকার’ দেবেন কীভাবে? দল ব্যক্তিসর্বস্ব বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠলে জনগণ আর গণতন্ত্র আশা করতে পারে না। বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানের অংশ ছিল, তখন জনগণ একক ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট আইউব খানকে গণতন্ত্রের অভিনব রূপ ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ দিতে দেখেছে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করলে ওই সময়ের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বাকশাল’-এর ছদ্মাবরণে একদলীয় ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র’ উপহার দিতে দেখেছে। তারা তাদের দ্বারা সংজ্ঞায়িত ‘গণতান্ত্রিক সরকার’ উপহার দিয়েছিলেন দেশবাসীকে। কিন্তু আইউব বা মুজিবের মস্তিষ্কপ্রসূত নিজস্ব ‘গণতন্ত্র’ জনগণ ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। উভয় শাসকের স্থান হয়েছে ইতিহাসের ভাগাড়ে। রাজনৈতিক দলে গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকলে গণতন্ত্রের কী হাল হতে পারে আইউব ও মুজিবের উদ্যোগই এর উত্তম দৃষ্টান্ত। একজন ব্যক্তির ওপর একটি রাজনৈতিক দল নির্ভরশীল হয়ে উঠলে দল, দেশ ও জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের আশা করা যায় না। আইউব খানও পারেননি, জনগণের বিপুল সমর্থনপুষ্ট শেখ মুজিবুর রহমানও পারেননি। বরং দেশকে তারা বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য ও অরাজকতার মধ্যে রেখে বিদায় নিয়েছেন।
কেবল জনসমর্থন, দম্ভ, আস্ফালন, বলপ্রয়োগ, জ্বালাময়ী ভাষণ ও একগুঁয়েমি দ্বারা রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনা করা যায় না। তাহলে বাংলাদেশে শেখ মুজিবই হয়তো হতে পারতেন সেরা শাসক। কিন্তু তিনি যেভাবে রাষ্ট্রপরিচালনার নীতি স্থির করেছিলেন, তা রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো ব্যাকরণের মধ্যে বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কোনো সংজ্ঞায় ফেলা যায় না। ক্ষমতার মোহ পরিহার করে তিনি যদি রাষ্ট্রচিন্তায় স্থায়ী ছাপ রেখে যেতেন, রাজনৈতিক দার্শনিকদের দেওয়া পরামর্শ ও রাষ্ট্রপরিচালনার রীতিনীতি ও কৌশল প্রয়োগ করতেন এবং বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর নজির অনুসরণ করতেন, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি নিন্দিত শাসক হিসেবে চিহ্নিত হতেন না।
যা হোক তারেক রহমান দেশে ফিরে আসার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট সহসাই পাল্টে গেছে। তার উপস্থিতিতে এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের অস্তিত্বও অনেকটা ম্লান হয়ে গেছে। বিএনপি তো দল হিসেবে তাঁকে বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায়, সামগ্রিকভাবে জনগণও সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী বলে বিবেচনা করতে শুরু করেছে। তিনি যদি মাত্র দেড় মাস পর অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সে ক্ষেত্রে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পুত্র হিসেবে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের পদে একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবেন। তারেক রহমান হয়তো নিজেও তা বিশ্বাস করেন। কিন্তু এরই মধ্যে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে যে সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে তাঁকে ঝামেলায় পড়তে হতে পারে তাঁর নিজের দলের মধ্য থেকেই, যারা বিরোধী দলে থাকবে, তাদের পক্ষ থেকে নয়।
আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর পুত্র দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সব কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে, বিনা বিচারে কারাগারে বছরের পর বছর আটক রেখে এবং বিএনপি নেতা-কর্মীদের হত্যা করে বিএনপিকে কার্যত নেতৃত্বশূন্য করে ফেলেছে। বিকল্প কোনো নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়নি। ফলে ২০২৪ পর্যন্ত দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরে বিএনপির পক্ষে আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে, এমনকি খালেদা জিয়াকে তাঁর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া ও তাঁকে নানাভাবে হেনস্তা করার প্রতিবাদে একটি কার্যকর আন্দোলন পর্যন্ত করতে পারেনি। জুলাই বিপ্লবের পর নেতৃত্বহীন বিএনপির মাঝারি নেতা ও মাঠপর্যায়ের কর্মীরা দেশজুড়ে যেভাবে চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্যে নিয়োজিত হয়েছিলেন, সেই ধারাবাহিকতা এখনো বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন স্থানে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সংঘর্ষ, হতাহতের ঘটনাও থেমে নেই। এসব ঘটনায় অভিযুক্ত অনেককে দল থেকে বহিষ্কারসহ দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ব্যবস্থাও গৃহীত হয়েছে। কিন্তু তা পর্যাপ্ত প্রমাণিত হয়নি। বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে সুযোগসন্ধানীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। তারেক রহমান যদি এখনই এ ব্যাপারে কঠোর না হতে পারেন, তাহলে তাঁকে ভবিষ্যতে দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হবে।
১৭ বছর আগের চেয়ে তারেক রহমান নিঃসন্দেহে রাজনীতিতে যথেষ্ট পরিপক্ব হয়েছেন বলে বিশ্বাস করি। তিনি ২৫ ডিসেম্বর তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে আগত জনতার উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের বিখ্যাত উক্তি ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ উদ্ধৃত করে তাঁর আই হ্যাভ আ প্ল্যান-এর কথা বলেছেন। এটিও একটি বড় স্বপ্ন। তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে তাঁকে প্রথমেই দলের জঞ্জাল সাফ করার কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ-এর মতো তাঁকে প্রথমেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে গ্রহণ করতে হবে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। লি কুয়ান বিশ্বাস করতেন যে দুর্নীতি শুরু হয় উচ্চপর্যায় থেকে। দায়িত্ব গ্রহণ করার দুই বছরের মধ্যে দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তিনি তিনজন মন্ত্রী ও একজন পার্লামেন্ট সদস্যসহ উচ্চপর্যায়ের বহু ব্যক্তিকে পদচ্যুত করেছিলেন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ানের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারেন। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতাও তাঁকে অবশ্যই শিখিয়েছে যে রাষ্ট্র পরিচালনায় কতটা কুশলী হওয়া আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে সততা ও স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থাকার দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী তাঁর পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক পাথেয় হতে পারে।
তারেক রহমান যদি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সত্যিই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেন তাহলে ফরাসি রাজনৈতিক দার্শনিক রুশোর রাষ্ট্রচিন্তা মাথায় রাখা সংগত হবে। রুশো বলেছেন : ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণে সর্বোচ্চ নেতাকে জনগণের অবিভাজ্য ও যৌথ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে হবে এবং নিজেকে ও তাঁর মন্ত্রীদের জনগণের শাসক নয়, সেবক বিবেচনা করতে হবে। তাতে জনগণ উপলব্ধি করবে যে তাদের সম্মতিই রাষ্ট্র ও সরকারের কর্তৃত্বের একমাত্র উৎস।’ কুটবুদ্ধির রাজনৈতিক দার্শনিক হিসেবে খ্যাত মেকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তা থেকেও কিছু ভালো বিষয় তিনি গ্রহণ করতে পারেন, তা হলো : ‘একজন নেতার প্রাথমিক দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রকে নিরাপদ ও শক্তিশালী করার জন্য কঠোর হওয়া। শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য রাষ্ট্রে আইনের শাসন থাকতে হবে, কিন্তু হুমকি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করতে হবে।’
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক
বিডি প্রতিদিন