হঠাৎ হওয়া কোটিপতি এবং নির্বাচনের রাজনীতি
অদিতি করিম
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, ‘নির্বাচন এখন কোটি টাকার খেলা। সৎ মানুষের জন্য নির্বাচন এখন শুধু কঠিন নয়, অসম্ভব।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভেবেছিলাম সেই অবস্থার অবসান ঘটবে। সৎ এবং যোগ্য প্রার্থী, যাদের বিপুল পরিমাণ উৎসহীন সম্পদ নেই কিন্তু জনগণের কল্যাণে কাজ করতে চান, তারাও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। কিন্তু প্রার্থীদের দাখিলকৃত হলফনামায় সম্পদের বিবরণ দেখে মনে হচ্ছে, নতুন বাংলাদেশে কিছুই বদলায়নি। এবারও নির্বাচন হবে কোটিপতিদের খেলাই। কোটিপতি কিংবা বিত্তবান হওয়াটা দোষের কিছু নয়। একজন মানুষ তার মেধা, শ্রম আর উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে ধনী হতেই পারেন। এ রকম ধনীরা দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করেন, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেন। কিন্তু একজন ব্যক্তি যদি হঠাৎ করেই বনে যান কোটিপতি, রাতারাতি যদি পাল্টে যায় তার জীবনাচার, তাহলে তিনি সমাজ কিংবা রাষ্ট্রকে কিছুই দিতে পারেন না। তিনি শুধু নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্যই কাজ করেন। এ ধরনের মানুষ নির্বাচন করেন আরও বিত্তশালী হওয়ার জন্য। ক্ষমতাবান হয়ে নিজের অবৈধ সম্পদ রক্ষা করতে চান। এসব ব্যক্তির দ্বারা আর যা-ই হোক জনগণের কল্যাণ আশা করা যায় না।
গণ অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনে এ রকম ধনী প্রার্থীর সংখ্যা শতকরা ৫০ ভাগের বেশি। সবচেয়ে বেশি কোটিপতি প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি থেকে। এরপর আছে জামায়াত।
স্বতন্ত্র কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যাও কম নয়। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী তার হলফনামায় উল্লেখ করেছেন যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা, পাম জুমেইরাহ ও মারসাতে তিনটি ফ্ল্যাট আছে। এ টাকা কি তিনি বৈধ পথে নিয়েছেন? গত সাত বছরে তার নগদ অর্থ বেড়েছে ২৭ গুণের বেশি। দল গঠনের এক বছরের কম সময়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির অনেক প্রার্থীরই শিক্ষাজীবন শেষ হয়েছে মাত্র এক-দেড় বছর আগে এবং প্রথমবারের মতো অংশ নিচ্ছেন জাতীয় নির্বাচনে। এর পরও দলটির প্রার্থীর মধ্যে অনেকের হলফনামায় উঠে এসেছে বিপুল সম্পদের হিসাব। দলটির কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যা চার।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুনামগঞ্জের পাঁচ আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, স্বতন্ত্রসহ ৩৯ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দাখিলকৃত মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিয়েছেন হলফনামাও। হলফনামায় প্রার্থীদের বার্ষিক আয়, মোট সম্পদ, শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ বিভিন্ন তথ্যের বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে। প্রার্থীদের হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এবার প্রতিটি আসনে এমন একাধিক প্রার্থী রয়েছেন যাদের সম্পত্তি কোটি টাকার বেশি। বলা যায়, সংসদ নির্বাচনে সুনামগঞ্জে এবার কোটিপতি প্রার্থীর ছড়াছড়ি।
ঢাকা জেলা ও মহানগরীর ২০ আসনের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ১৭টিতে প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে ১৩ জন কোটিপতি। সবচেয়ে বেশি সম্পদ বিএনপি প্রার্থীদের। তবে ঢাকায় বিএনপির কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যা ১১।
চট্টগ্রামের আসনগুলোতে বিএনপি ও জামায়াতের অধিকাংশ প্রার্থীরই কোটি কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। সম্পদের এ ‘প্রতিযোগিতায়’ বিএনপি এগিয়ে রয়েছে। দলটির ১৬ জন প্রার্থী কোটিপতি, যেখানে জামায়াতের কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যা ১২। অনেক প্রার্থীর সম্পদের পরিমাণ কয়েক কোটি থেকে শুরু করে ১০০ কোটি টাকার বেশি।
রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামা বিশ্লেষণে ব্যাপক আর্থিক অসংগতির চিত্র উঠে এসেছে। আয়, সম্পদ, নগদ অর্থ, জমি ও স্বর্ণের ঘোষিত মূল্যের সঙ্গে বাস্তব বাজারমূল্যের বড় ধরনের গরমিল লক্ষ করা গেছে।
হলফনামা সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির বেশির ভাগ প্রার্থীর সম্পদ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতের অধিকাংশ প্রার্থী লাখপতি হলেও কয়েকটি আসনে কোটিপতি প্রার্থী রয়েছেন। তবে উভয় দলের প্রার্থীদের ক্ষেত্রেই অস্বাভাবিক কম দামে জমি, ফ্ল্যাট, স্বর্ণের মূল্য ঘোষণাসহ নানান অসংগতি দেখা গেছে। একাধিক প্রার্থীর স্ত্রী গৃহিণী বা আয়ের কোনো উৎস না থাকলেও তাদের নামে কোটি টাকার সম্পদ থাকার তথ্য উঠে এসেছে।
গত বছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা মোটেও ভালো ছিল না। দারিদ্র্যের হারে ঊর্ধ্বগতি, নতুন কর্মসংস্থানের স্থবিরতা ও আয়বৈষম্যের ফলে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে; যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নতুন হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। বিদায়ি বছরে মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করতে হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির এই বেহাল অবস্থার মধ্যেও কিছু মানুষ ফুলে ফেঁপে উঠেছে। এ সময়েই দেশে নতুন আরও ৯ হাজার কোটিপতি আমানতকারী সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও চমকে দেওয়ার মতো তথ্য; এক বছরে কোটিপতিদের অ্যাকাউন্টে ৫৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি নতুন অর্থ জমা হয়েছে। যেখানে মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ভাঙছে, নিম্নবিত্ত ঋণে ডুবছে, ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ কমাচ্ছেন; সেখানে এত বিপুল টাকা কারা জমাচ্ছেন এবং কেন? বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে কোটিপতি আমানতকারী ছিলেন ১ লাখ ১৯ হাজার ১৫৪ জন। আর চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে এ সংখ্যা ১ লাখ ২৮ হাজার ৭০। অর্থনৈতিক ধসের সময় কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা প্রায় ৭.৫% বেড়ে যাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে ‘স্বাভাবিক বাজারের আচরণ নয়’।
৫০ কোটি টাকার ওপরে আমানতকারীর সংখ্যা গত বছর ছিল ১ হাজার ৮০০ আর এ বছর ১ হাজার ৯৪৭। এই ১৪৭ জন নতুন বড় কোটিপতি কীভাবে এ সময়েই ৫০ কোটি টাকা বা তার বেশি অর্থ জমাতে পেরেছেন, এ প্রশ্ন ব্যাংক খাতেও উচ্চারিত হচ্ছে। শুধু সংখ্যা নয়, তাদের অ্যাকাউন্টে জমা অর্থ বেড়েছে ২১ হাজার কোটি। তাহলে কী পরিবর্তন হলো? ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়া। অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা। কিন্তু নির্বাচনে কোটিপতি প্রার্থীর প্রাধান্য আর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও ব্যাংকে কোটিপতি গ্রাহকের সংখ্যাবৃদ্ধি আমাদের একটা বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে-আসলেই কিছু বদলেছে, নাকি শুধু লোক বদল হয়েছে?
বিডি প্রতিদিন