জাতির ভালোবাসার ঋ ণ
রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল। কৃতজ্ঞ জাতি তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে যেভাবে দলমতনির্বিশেষে উপস্থিত হয়েছিল, তা এক কথায় নজিরবিহীন। এটি যেমন বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রতি দেশবাসীর শ্রদ্ধা-ভালোবাসার ইঙ্গিত। একইভাবে গণমানুষের রাজনৈতিক সংগঠন বিএনপির প্রতি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করা অনুভূতিরও বহিঃপ্রকাশ। এর মাত্র পাঁচ দিন আগে ২৫ ডিসেম্বর দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ দেড় যুগ পর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকালে একই অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে। মানুষের এই ভালোবাসা বিএনপিকে অশেষ ঋণে আবদ্ধ করেছে। যে ঋণ শোধ করতে হবে জনগণের প্রতি ভালোবাসা দেখিয়ে। দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং দেশ ও জনগণের উন্নয়ন নিশ্চিত করে।
জননেতা তারেক রহমান দেশে ফিরে লাখ লাখ মানুষের সংবর্ধনার জবাবে বলেছেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান।’ সোজা কথায় তিনি জানিয়ে দিলেন দেশকে নিয়ে তিনি ভাবেন। ভাবেন জনগণকে নিয়ে। যারা তাঁর রাজনীতির ভরসা। লাখো-কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত এই ফিরে আসা যদি কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ থাকত, তবে এর তাৎপর্য হতো ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু তাঁর বক্তব্য ও অবস্থান স্পষ্ট করে দেয়, এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণের একটি সোনালি সূচনা। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিং বলেছিলেন আই হ্যাভ আ প্ল্যান। তিনি এই বক্তব্য দিয়ে আমেরিকায় সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার। আর তারেক রহমান বলেছেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’। এই একটি বাক্যেই তিনি তাঁর রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। জনগণের জন্য, দেশের জন্য, রাষ্ট্র কীভাবে চলবে, প্রতিষ্ঠান কীভাবে শক্ত হবে, গণতন্ত্র কীভাবে কার্যকর হবে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়াই ছিল তাঁর বক্তব্যের মূল সুর। তারেক রহমানের বক্তব্যটি মূলত এই জায়গাতেই আলাদা হয়ে দাঁড়ায়। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাস্তব চাহিদাকে সরাসরি স্পর্শ করে। তারেক রহমান স্পষ্টভাবে বলেছেন, বিদেশে কর্মসংস্থান আর কেবল শ্রম রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভাষাভিত্তিক দক্ষতা, দেশভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও অঞ্চলভিত্তিক স্কিল ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে উচ্চ আয়ের চাকরিতে বাংলাদেশিদের প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে খেলাধুলাকে শখ নয়, পেশা হিসেবে গড়ে তোলার কথা তিনি বলেছেন। জাতীয় পর্যায়ে কাঠামোবদ্ধ স্পোর্টস একাডেমি এবং ‘নতুন কুঁড়ি’ কর্মসূচিকে আধুনিকভাবে পুনর্গঠন করে দেশজুড়ে প্রতিভা শনাক্ত করার পরিকল্পনার মাধ্যমে। স্বাস্থ্য খাতে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিরোধমূলক। সব নাগরিকের জন্য প্রিভেন্টিভ হেলথকেয়ার এবং তাৎক্ষণিক চাপ সামাল দিতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার। ডিজিটাল প্রজন্মের জন্য তিনি কম খরচের ইন্টারনেট, সাশ্রয়ী কো-ওয়ার্কিং স্পেস, অনলাইন উদ্যোক্তা সহায়তা এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতা গড়ে তোলার কথা বলেছেন, যাতে তরুণরা কেবল চাকরির সন্ধান নয়, বরং নতুন কাজ সৃষ্টি করতে পারে। কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও প্রতিভা এই চার স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো একটি বাস্তবসম্মত ভবিষ্যৎ রূপরেখা কার্যত তুলে ধরেছেন তিনি। এই পরিকল্পনার সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ হলো তাঁর প্রণীত ৩১ দফা রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কার প্রস্তাব। এটি কোনো নির্বাচনি স্লোগান নয়; এটি রাষ্ট্রকে নতুন করে দাঁড় করানোর রূপরেখা। এর লক্ষ্য একটি স্বনির্ভর ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ। যেখানে অর্থনীতি উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর দাঁড়াবে। রাষ্ট্র চলবে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। আর জাতীয় সিদ্ধান্ত আসবে জনগণের ইচ্ছা থেকে। বাইরের চাপ বা ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতা থেকে নয়। একই সঙ্গে এটি একটি নিরাপদ রাষ্ট্রের ধারণা তুলে ধরেছে। যেখানে নিরাপত্তা মানে কেবল বাহিনী নয়, বরং ন্যায়বিচার, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্র-নাগরিক আস্থার সম্পর্ক। নিরাপত্তার প্রশ্নে তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। তিনি বলেছেন, একটি দেশ তখনই সত্যিকার অর্থে নিরাপদ হয়, যখন সেই নিরাপত্তা শিশু থেকে প্রবীণ, নারী-পুরুষ, প্রতিবন্ধী মানুষ, সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়। এটি ঘরে, রাস্তায়, কর্মক্ষেত্রে এবং মতপ্রকাশে ভয়ের অনুপস্থিতির কথা। নারীর নিরাপত্তা মানে কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা। প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষেত্রে করুণা নয়, মর্যাদা ও সুযোগের সমতা।
এই ভবিষ্যৎ ভাবনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের ধারাবাহিকতা। জাতীয় আত্মমর্যাদা, বহুদলীয় গণতন্ত্র, আপসহীন ভোটাধিকার এবং জনগণের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন। এই মূল্যবোধগুলোকে তিনি উত্তরাধিকার হিসেবে নয়, বরং দায়িত্ব হিসেবে বহন করার কথা বলছেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আলোকে শহীদ জিয়াউর রহমান যে ‘রেইনবো স্টেট’-এর ধারণা দিয়েছিলেন, সমতল ও পাহাড়, সব ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষকে এক ছাতার নিচে আনার রাষ্ট্রভাবনা। তারেক রহমান সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক চিন্তাকেই সামনে আনছেন। এখানে রাষ্ট্র কোনো একক পরিচয়ের নয়; বৈচিত্র্যই রাষ্ট্রের শক্তি। কেউ প্রান্তে থাকবে না, কেউ মূলধারা থেকে বাদ পড়বে না, এই নীতিই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ভিত্তি।
এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ এক সংগ্রামের ইতিহাস। বছরের পর বছর নির্বাসনে থেকেও তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলকে ভেঙে পড়তে দেননি। মামলা, রাজনৈতিক চাপ, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, সবকিছুর মধ্যেও তিনি দলীয় কাঠামো ধরে রেখেছেন। আন্দোলন সংগ্রামের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এটি কোনো আরামদায়ক প্রবাসজীবন ছিল না; এটি ছিল টিকে থাকার এবং সংগঠনকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। জুলাইয়ের গণ অভ্যুত্থানে সরাসরি অংশ নিতে না পারলেও তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল স্পষ্ট। আন্দোলনের ভাষা ও লক্ষ্য নির্ধারণে তাঁর প্রভাব ছিল সরাসরি। তাঁর রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়েছিল আরও আগে, ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময়। পরে ২০০১ সালে, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়ন, রাজনৈতিক বার্তা গঠন এবং সাংগঠনিক কৌশল নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সরকারে কোনো আনুষ্ঠানিক পদ নেওয়ার চেয়ে তিনি দলীয় সংগঠন ও তৃণমূল রাজনীতিতে মনোযোগ দেন। যা তাঁকে একটি পরিকল্পনাভিত্তিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
ইতিহাসে দেখা যায়, নির্বাসন থেকে ফিরে আসা নেতারা কেবল দেশে ফেরেন না, তাঁরা জনগণের মাধ্যমে এক ধরনের অভিষেক লাভ করেন। নেলসন ম্যান্ডেলা কিংবা নেপোলিয়ন বোনাপার্ট কিংবা আয়াতুল্লাহ খোমেনির প্রত্যাবর্তন ছিল রাষ্ট্রীয় নয়, জনমানসের স্বীকৃতির ঘটনা। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও বিমানবন্দর ও জনসমাগমে অর্ধকোটি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি সেই বাস্তবতাই ইঙ্গিত করে। এই প্রত্যাবর্তন তাই শুধু একজন নেতার দেশে ফেরা নয়, এটি একটি রাজনৈতিক দিকনির্দেশের ঘোষণা। যেখানে আবেগ আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে পরিকল্পনা। যেখানে অতীতকে সম্মান করা হয়, কিন্তু চোখ রাখা হয় আগামী দিনের বাংলাদেশের দিকে। বাংলাদেশের মানুষের আশা আজ আর বিমূর্ত কোনো কল্পনায় আটকে নেই। এই আশা গড়ে উঠেছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, ক্ষোভ আর প্রত্যাশার সমন্বয়ে।
তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে অনেক মানুষ দেখছে এমন এক নেতৃত্বের সম্ভাবনা। যিনি কথা বলার আগে পরিকল্পনার কথা বলেন। ক্ষমতার আগে দায়িত্বের বিষয়ে গুরুত্ব দেন। এই আশার কেন্দ্রে আছে একটি স্বাভাবিক চাওয়া। একটি কার্যকর গণতন্ত্র। যেখানে ভোটের মূল্য থাকবে। একটি রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিক পরিচয় নিরাপত্তার ঝুঁকি নয়। একটি ভবিষ্যৎ, যেখানে তরুণরা দেশ ছাড়াকে নয়, দেশ গড়াকেই প্রথম বিকল্প হিসেবে দেখবে। মানুষ তারেক রহমানের কাছে অলৌকিক কিছু প্রত্যাশা করছে না। তারা চায় স্থিতিশীলতা, ন্যায্যতা আর সম্মান। চায় এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে ভিন্নমত মানেই শত্রু নয়, যেখানে রাষ্ট্র কাউকে ভয় দেখায় না, বরং আস্থার পরিবেশ গড়ে তোলে।
লেখক : বিএনপির সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক
বিডি প্রতিদিন