• সিলেট, সকাল ৮:০৫, ৬ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কেমন যাবে ২০২৬ সালের অর্থনীতি

admin
প্রকাশিত জানুয়ারি ৯, ২০২৬
কেমন যাবে ২০২৬ সালের অর্থনীতি

Manual3 Ad Code

কেমন যাবে ২০২৬ সালের অর্থনীতি

Manual2 Ad Code

নিরঞ্জন রায়

যেকোনো নতুন বছরের আগে এবং শুরুতে আগামী বছরের অর্থনীতি কেমন হবে, তা নিয়ে চলে বিস্তর আলোচনা। বিশেষ করে বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য অর্থাৎ আমদানি-রপ্তানি, শেয়ার মার্কেট, সুদের হার, মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থান নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে আলোচনা এবং বিশ্লেষণ করা হয়। এককথায় খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, আর্থিক খাতের বিশ্লেষক, বিভিন্ন থিংকট্যাংক, পেশাদার সংস্থা এবং এমনকি স্বনামধন্য পত্রিকার পক্ষ থেকে অর্থনীতির একটা পূর্বাভাস বা আউটলুক দেওয়ার চেষ্টা থাকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ এবং তথ্য-উপাত্ত দিয়ে থাকে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) এবং এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক।

কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই এ রকম ঘটা করে অর্থনৈতিক পূর্বাভাস দিতে দেখা যায় না। গত বছর প্যারিসভিত্তিক ওইসিডি (অর্গানাইজেশন অব ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেণ্ট), তাদের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। কিন্তু এ বছর সে রকম কোনো প্রতিবেদন চোখে পড়েনি।

সার্বিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা বা বিশ্লেষণ না থাকলেও খাতওয়ারি আলোচনা যথেষ্টই আছে।

Manual3 Ad Code

যেমন—সুদের হার কতটা হ্রাস পাবে এবং এর প্রভাব বন্ড মার্কেটে কেমন পড়বে, মূল্যস্ফীতি কী আকার ধারণ করতে পারে, ক্রসবর্ডার ট্রেড বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেমন হবে, কর্মসংস্থানের কী অবস্থা হবে—এ রকম বিষয় নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এবং বিশ্লেষণ চলছে তিনটি বিষয় নিয়ে, যেগুলো হচ্ছে (১) আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ এবং সুদের হার হ্রাস, (২) এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স)-এর প্রভাব এবং (৩) ক্রিপ্টো কারেন্সি। এসব আলোচনা এবং বিশ্লেষণ মূলত আমেরিকার অর্থনীতিকে কেন্ন্দ্র করেই হয়েছে। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতি এখন এতটাই আমেরিকাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে, তাতে আলোচনা বা বিশ্লেষণ আমেরিকাকেন্দ্রিক হলেও সেখানে বিশ্ব অর্থনীতির বিষয়টি চলে আসে এবং বিশ্বব্যাপী সবার দৃষ্টি আমেরিকার দিকেই থাকে।

যেমন—আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার হ্রাসের দিকে সমগ্র বিশ্বের দৃষ্টি থাকে এবং আমেরিকায় ফেড (ফেডারেল রিজার্ভের) সুদের হার হ্রাস করার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য অনেক দেশ তা অনুসরণও করে।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে কাকে মনোনীত করবেন সেদিকে এখন বিশ্বের অনেকের দৃষ্টি আছে। কেননা এটি তো শুধু ফেডের চেয়ারম্যান নন, এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আগামীদিনে আমেরিকার নীতি সুদহার কোন দিকে যাবে তার সম্পর্ক। ট্রাম্প এই সুদের হার যথেষ্ট হ্রাস করার পক্ষে, যা ফেডের বর্তমান চেয়ারম্যান মানতে রাজি নন। যদিও ফেড পর পর তিনবার নীতি সুদহার হ্রাস করেছে যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে এবং কিছুটা আপত্তি নিয়ে।

এ কারণে গত মাসে সুদের হার হ্রাস করার সময় ইঙ্গিতও দিয়েছে যে খুব সহসা সুদের হার পুনরায় হ্রাস করা সম্ভব নাও হতে পারে। ফেডের নতুন চেয়ারম্যান ট্রাম্পের প্রত্যাশা অনুযায়ী সুদের হার হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু ফেডারেল রিজার্ভের যে কাঠামো, সেখানে চেয়ারম্যান একা যে সুদের হার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, তেমন নয়। কারণ ফেডারেল রিজার্ভে আছে ১২ সদস্যবিশিষ্ট নীতি সুদহার কমিটি, যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে নীতি সুদহার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এখন ট্রাম্প যদি সেই কমিটিতেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাহলে ফেডের স্বাধীনতা বা নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, যা আমেরিকায় বিনিয়োগে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই বিষয়টি নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে।
এআই আলোচনায় একটি বড় স্থান দখল করে আছে। গত বছর ট্রাম্পের উচ্চ শুল্কহার ঝড়ের মধ্যেই এআই নিয়ে আলোচনা ছিল তুঙ্গে। এআই বিনিয়োগ, অর্থনীতি, উৎপাদন এবং বাজার ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাবে, এমনটাই ছিল আলোচনা। এই খাতে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সৃষ্টি করতে পারে সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত। সেই সঙ্গে এই প্রযুক্তির ব্যবহার চাকরির বাজারে ব্যাপক ধস নামাতে পারে, এমন উদ্বেগের বিষয়ও আলোচনায় স্থান পেয়েছিল। সেই এআই নিয়ে বর্তমান বছরেও আছে ব্যাপক আলোচনা। তবে এবারের আলোচনা কিছুটা ভিন্ন ধরনের এবং প্রত্যাশার পরিবর্তে শঙ্কার। গত বছর শেষের দিকে ওরাকল শেয়ারের যে মাত্রার দরপতন ঘটেছে, তা বিনিয়োগকারী, অর্থনীতিবিদ এবং প্রযুক্তিবিদদের এক চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। যে এআই নিয়ে উচ্ছ্বাসের শেষ ছিল না, সেই এআই কি বিনিয়োগ বাবল হওয়ার আগে ফেটে যাবে—এমনটাই ছিল বছর শেষের আলোচনা। এই আলোচনা চলতি বছরেও যে অব্যাহত থাকবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। কেননা এই খাতে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সম্ভাবনা আছে, যা নিয়ে আলোচনা তো থামবেই না, উল্টো ভিন্ন মাত্রায় চলতে থাকবে।

Manual6 Ad Code

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এআইয়ের নেতিবাচক প্রভাবের দিক। বিশ্বের অনেক বৃহৎ কম্পানির প্রধান নির্বাহীরা এরই মধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ২০২৬ সালে সে রকম নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ নেই। তারা তাদের প্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করবে এবং সে অনুযায়ী নতুন কর্মসংস্থান নিয়ে চিন্তাভাবনা করবে। তাই কর্মসংস্থান নিয়ে যারা কাজ করে, তারা বর্তমান বছরে নতুন কর্মসংস্থান নিয়ে মোটেই আশাবাদী হতে পারছে না। উল্টো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহারের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় অনেক চাকরি হারানোর ঘটনা ঘটতে পারে। কর্মসংস্থানের এই নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে পড়তে বাধ্য। ফলে এই বছরের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনায় কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এর বাইরে আরো একটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে আলোচনায় আছে, তা হচ্ছে ক্রিপ্টো কারেন্সি। ট্রাম্প নিজে একজন ক্রিপ্টোপ্রেমিক এবং তাঁর প্রশাসনও এই ডিজিটাল কারেন্সির পক্ষে। ক্রিপ্টো কারেন্সিকে বৈধতা দিয়ে এই ভার্চুয়াল মুদ্রাকে একটি রেগুলেশনের অধীনে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে ব্যাপক আলোচনা আছে। এ ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে কিছু বিধি-বিধানও জারি করা করা হয়েছে। এমনকি ক্রিপ্টো কম্পানিকে ব্যাংকিং লেনদেনের সুযোগ দেওয়া এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্রিপ্টো কম্পানিকে ব্যাংক খোলার অনুমতি দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব কারণে ক্রিপ্টো কারেন্সিতে বিনিয়োগ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছিল এবং বিষয়টি নিয়ে বিস্তর আলোচনাও চলছিল। কিন্তু গত বছর শেষের দিকে ক্রিপ্টো কারেন্সির মূল্য সেভাবে বৃদ্ধি পায়নি, যেখানে শেয়ারবাজারে সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। ফলে ক্রিপ্টো কারেন্সি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মাঝে কিছুটা হতাশা দেখা দিয়েছে, যা দূর করে এই ডিজিটাল কারেন্সিতে গতি আনার উদ্দেশ্যে ক্রিপ্টো কম্পানির নির্বাহীরা এই বিনিয়োগ আমেরিকার বাইরে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। এই উদ্দেশ্যে সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ক্রিপ্টো সম্মেলন। তাই এই বছরের অর্থনৈতিক আলোচনায় ক্রিপ্টো কারেন্সি বেশ গুরুত্ব নিয়েই থাকবে।

Manual8 Ad Code

বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে সেভাবে সম্পৃক্ত নয়, তাই বৈশ্বিক প্রভাব হয়তো সরাসরি সেভাবে পড়বে না। তবে দেশের ডলার সংকট, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটা প্রভাব তো থাকবেই। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়েই আছে অনেক ধরনের অনিশ্চয়তা। তদুপরি মনে রাখতে হবে, এ বছর বাংলাদেশে নির্বাচনের বছর। নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়া, নির্বাচিত দলের ক্ষমতা গ্রহণ করে সব কিছু গুছিয়ে নেওয়া এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করতে করতেই এ বছর শেষ হয়ে যাবে। তাই আমাদের দেশের অর্থনীতি যে এ বছরও একটি কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে পার করবে, তা মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলা যায়। সেই সঙ্গে দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য এই বছর চ্যালেঞ্জ এবং সংকট হয়েই থাকবে।

লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

 

বিডি প্রতিদিন

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com