পবিত্র হজ যাত্রার ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে
অনলাইন ডেস্ক
শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে পবিত্র হজ কেবল একটি ধর্মীয় আচারই ছিল না বরং এটি ছিল এক অতুলনীয় ও অবিস্মরণীয় মহাযাত্রা। অতীতে এই যাত্রার প্রতিটি ধাপে যেমন ছিল চরম কষ্টের পরীক্ষা, তেমনই ছিল মক্কার পবিত্র ভূমিতে পৌঁছানোর এক পরম আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা। ইতিহাসের পাতায় সেই প্রাচীন কাফেলাগুলোর কষ্ট ও ভক্তির চিত্র নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তৎকালীন পর্যটক এবং ইতিহাসবিদরা। তাদের রেখে যাওয়া মূল্যবান বই ও পাণ্ডুলিপিগুলো আজ যুগের পর যুগ ধরে হজের বিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক সাক্ষী হয়ে টিকে আছে।
সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ, মরুভূমির তপ্ত বালুকারাশি আর মাইলের পর মাইল দীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার সেসব রোমাঞ্চকর বিবরণ আজও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হজের গৌরব এবং মুসলিম উম্মাহর অভূতপূর্ব ঐক্যের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। প্রাচীনকালে পবিত্র ভূমিতে পৌঁছানো মোটেও সহজ কোনো কাজ ছিল না। একটি হজ যাত্রা সম্পন্ন করতে তখনকার মানুষের কয়েক মাস থেকে শুরু করে পুরো এক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেত। পথিমধ্যে হাজিদের মুখোমুখি হতে হতো প্রকৃতির রুদ্ররূপ, ঝড়-তুফান এবং জলদস্যু ও ডাকাতদের নানাবিধ বিপদের।
ইতিহাসবিদদের মতে, তৎকালীন মুসলিম শাসকরা হজের পথগুলোকে সুগম ও নিরাপদ করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বাগদাদ থেকে বারবার হজে আসা খলিফা হারুন আল-রশিদ এবং দামেস্ক ও কায়রো থেকে আসা কাফেলার নিরাপত্তার জন্য বিশেষ চকি ও রসদ সরবরাহ কেন্দ্র স্থাপনকারী সুলতান আল-জাহিরের নাম এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রাথমিক যুগের ইসলামিক রাষ্ট্রগুলো যে হজের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও হাজিদের নিরাপত্তাকে কতটা গুরুত্ব দিত এই উদ্যোগগুলো তারই প্রমাণ বহন করে। ইরাকের দারব যুবায়দাহ কিংবা মিশরের প্রাচীন হজ রুটগুলোর পাশে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য ছোটখাটো শহর ও বিশ্রামাগার। এই পথগুলো কেবল হজের জন্যই ব্যবহৃত হতো না বরং এগুলো ছিল গোটা মুসলিম বিশ্বের সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের মূল ধমনী। এগুলো বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছিল।
হাজিদের সুবিধার্থে তৎকালীন সময়ে জলাশয় ও কূপ খনন, খাবারের ঘর নির্মাণ, নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং চিকিৎসাসেবার যে ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তাকে আধুনিককালের বড় জনসমাবেশ ব্যবস্থাপনার একটি প্রাথমিক রূপরেখা বলা চলে। তৎকালীন পরিব্রাজক আবদ আল-গনি আল-নাবুলসির লেখায় হাজিদের মধ্যকার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের যে চিত্র পাওয়া যায়, তা যেন বহু শতক আগেই আধুনিক যুগের আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ধারণা তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে ‘ফি মানজিল আল-ওয়াহি’, ‘দ্য রোড টু মক্কা’ কিংবা ‘টু দ্য ল্যান্ড অব প্রফেথহুড’-এর মতো বিখ্যাত গ্রন্থগুলো বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে হজের মানবিক ও আধ্যাত্মিক অনুভূতি ফুটিয়ে তুলেছে। ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও যুগে লেখা হলেও এই বিবরণগুলো হজের বিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল।
গবেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, হজের এই ভ্রমণকাহিনীগুলো তৎকালীন ইসলামি সমাজের সামাজিক বাস্তবতার অন্যতম প্রধান উৎস। যেমন আন্দালুসিয়া থেকে হিজাজে আসা বিখ্যাত পর্যটক ইবনে জুবায়ের তার সমুদ্রযাত্রা এবং পরবর্তী স্থলপথের নিখুঁত বিবরণ রেখে গেছেন। তার লেখনীতে ইহরাম, তাওয়াফ, সাঈ, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান এবং জামরায় পাথর নিক্ষেপের মতো প্রতিটি ধর্মীয় আচারের আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক রূপ ফুটে উঠেছে।
অন্যদিকে, বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতার ডায়েরি দেখায় হজের পথের অস্থায়ী বাজার, চিকিৎসকদের তাঁবু এবং বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা বিভিন্ন ভাষা ও বর্ণের মুসলিমদের অভূতপূর্ব একাত্মতা। যুগের পর যুগ ধরে এই অমূল্য স্মৃতিগুলোই হজ যাত্রার সেই প্রাচীন ও গৌরবময় ইতিহাসকে আজও মানুষের মনে অম্লান করে রেখেছে।
বিডি প্রতিদিন