ফাইল ছবি
পরিচ্ছন্নতা ইমানের অংশ
মাওলানা আল আমিন সরকার
পরিচ্ছন্নতা মানুষের স্বভাবজাত সৌন্দর্যবোধের অংশ। একজন সুস্থ ও সচেতন মানুষ যেমন নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখতে পছন্দ করেন, তেমনি নিজের ঘরবাড়ি ও চারপাশের পরিবেশও পরিচ্ছন্ন দেখতে চান। ইসলাম মানুষের এই স্বাভাবিক প্রবণতাকে উৎসাহিত করেছে এবং পরিচ্ছন্নতাকে ব্যক্তিগত অভ্যাসের পাশাপাশি ইমানি ও সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্রতা অর্জন করে তাদেরও ভালোবাসেন (সুরা বাকারা-২২২)। এ সম্পর্কে হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘পবিত্রতা ইমানের অর্ধেক’ (সহিহ মুসলিম-২২৩)। মৌলিকভাবে ইসলামের দৃষ্টিতে পরিচ্ছন্নতার দুটি দিক রয়েছে। বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা ও আত্মিক পরিচ্ছন্নতা। অজু, গোসল, মিসওয়াক, নখকাটা, পরিপাটি পোশাক পরা, শরীর ও ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখা বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার অংশ। আর হিংসা, অহংকার, বিদ্বেষ, মিথ্যা, গিবত, চোগলখোরি, প্রতারণা ও অন্যায় থেকে অন্তরকে মুক্ত রাখা হলো আত্মিক পরিচ্ছন্নতা।
শুধু নিজের শরীর ও ঘর পরিষ্কার রাখলেই একজন নাগরিকের দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং মসজিদ, মাদ্রাসা, বিদ্যালয়, অফিস, দোকান, বাজার, ফুটপাত, রেলস্টেশন, রাস্তাঘাট, ড্রেন ও আশপাশের পরিবেশও পরিচ্ছন্ন রাখা আমাদের দায়িত্ব। বিশেষ করে যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা, পলিথিন ও বর্জ্য ড্রেনে ফেলা, রাস্তা-ফুটপাতে থুতু ফেলা কিংবা রাস্তার পাশে প্রস্রাব করা শুধু পরিবেশের সৌন্দর্যই নষ্ট করে না; বরং জনস্বাস্থ্য, চলাচল ও স্বাচ্ছন্দ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করবেন, কিন্তু ময়লা না ফেলা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব। অনুরূপভাবে পরিচ্ছন্নতা মানুষের ব্যক্তিত্বেরও পরিচয় বহন করে। দামি পোশাক বা বড় সম্পদ নয়; পরিপাটি থাকা, সংযত কথা বলা, ভদ্র আচরণ করা এবং অন্যকে সম্মান করা একজন মানুষের প্রকৃত ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করে। একজন রিকশাচালক, শ্রমিক, গৃহকর্মী কিংবা পরিচ্ছন্নতাকর্মী পেশাগতভাবে আমাদের থেকে ভিন্ন হতে পারেন; কিন্তু মানুষ হিসেবে তিনি সম্মানের অধিকারী। আমরা নিজের জন্য যে সম্মান প্রত্যাশা করি, অন্যকেও সেই সম্মান দিতে শিখতে হবে। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পরিচ্ছন্ন মানসিকতার পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় কটু কথা, অশালীন মন্তব্য, অপমানজনক বক্তব্য কিংবা অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য অনেক সময় নিজের ব্যক্তিত্বকেই অন্যের কাছে ছোট করে তোলে। বেশি কথা বলাই স্মার্টনেস নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী সুন্দর ও অর্থবহ কথা বলাই ব্যক্তিত্বের পরিচয়।
আর এই পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস আমাদের শৈশব থেকেই গড়ে তুলতে হবে। শিশুদের নিজের বিছানা, পড়ার টেবিল, বইখাতা, পোশাক ও ব্যবহৃত স্থান পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলা, অন্যের প্রতি সম্মান দেখানো এবং জনপরিসর পরিচ্ছন্ন রাখার শিক্ষা দিতে হবে। তবে পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব শুধু ব্যক্তির ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। রাষ্ট্রকেও একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রতি কয়েকটি প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমত, ফুটপাত, মার্কেট, দোকান, কলকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, রেলস্টেশনসহ প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব এলাকা পরিষ্কার রাখার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। প্রতিটি দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সামনে নির্দিষ্ট ময়লার ঝুড়ি রাখা এবং উৎপাদিত বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের অফিস, আবাসিক এলাকা ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার বিষয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান যদি নিজেরাই দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, তাহলে সাধারণ মানুষও উৎসাহিত হবে। তৃতীয়ত, প্রশাসনকে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু নির্দেশনা জারি করলেই হবে না; বাস্তবে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
চতুর্থত, সচেতনতা ও সতর্কতার পাশাপাশি প্রয়োজনে আইন প্রয়োগ করতে হবে। তবে শাস্তির আগে ব্যাপক জনসচেতনতা ও পর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। পঞ্চমত, প্রতিটি গ্রাম, ইউনিয়ন, পৌরসভা ও শহর এলাকায় বর্জ্য ফেলার জন্য নির্দিষ্ট স্থান বা সংগ্রহকেন্দ্র থাকতে হবে। মানুষ সেখানে ময়লা ফেলবে এবং নির্ধারিত সময়ে সরকারি বা দায়িত্বপ্রাপ্ত বর্জ্যবাহী গাড়ি সেগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে যাবে। এতে রাস্তার পাশে যত্রতত্র ময়লা ফেলার প্রবণতা অনেকটাই কমবে। ষষ্ঠত, বর্জ্যকে শুধু আবর্জনা হিসেবে না দেখে সম্পদে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, জৈবসার বা অন্যান্য ব্যবহারযোগ্য উপাদান তৈরির প্রকল্প গ্রহণ করা সম্ভব। তবে এসব কার্যক্রমে পরিবেশগত নিরাপত্তা, বায়ু ও পানিদূষণ এবং জনস্বাস্থ্যের বিষয়গুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
♦ লেখক : পরিচালক চরপাথালিয়া সালমান ফারসী (রা.) মাদরাসা, গজারিয়া, মুন্সিগঞ্জ
বিডি প্রতিদিন