• সিলেট, রাত ৮:০০, ১১ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

উৎমা ছড়ার পথে—এক মায়ের গল্প

admin
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬
উৎমা ছড়ার পথে—এক মায়ের গল্প

Manual7 Ad Code

উৎমা ছড়ার পথে—এক মায়ের গল্প

Manual3 Ad Code

হাবিব সরোয়ার আজাদ

Manual5 Ad Code

 

Manual8 Ad Code

সিলেট থেকে একদিন ছোট ভাই আরাফাতকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে রওনা হলাম উৎমা ছড়ার উদ্দেশে। সিলেট শহর থেকে আম্বরখানা হয়ে এয়ারপোর্ট সড়ক ধরে প্রায় এক ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে আমরা উৎমা ছড়ার দিকে এগিয়ে চললাম। এরপর শুরু হলো কাঁচা রাস্তার পথ। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে একসময় একটি ছড়া অতিক্রম করে পৌঁছে গেলাম উৎমা ছড়া বিডিআর ক্যাম্পের গেটে।
গেটে দায়িত্বে থাকা বিডিআর সদস্যের কাছে জানতে চাইলাম, ক্যাম্প কমান্ডার আছেন কি না। তিনি আমাদের আসার কথা ক্যাম্প কমান্ডারকে জানালেন। কিছুক্ষণ পর ক্যাম্প কমান্ডার নিজেই বেরিয়ে এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করলেন। এরপর তিনি আমাকে ও ছোট ভাই আরাফাতকে ক্যাম্পের ভেতরে নিয়ে একটি গোলঘরে বসালেন।
প্রথমে ক্যাম্প কমান্ডার আমাদের জন্য সাদা পানি ও স্যালাইন পানি পরিবেশন করলেন। এরপর চা, বিস্কুট ও চানাচুর দিয়ে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের আপ্যায়ন করলেন। দুর্গম সীমান্ত এলাকায় অপরিচিত দুই পথিকের প্রতি তাঁর এই আন্তরিক আতিথেয়তা আমাদের সত্যিই মুগ্ধ করেছিল।
এরপর ক্যাম্প কমান্ডারকে বললাম, “আমরা কিছুক্ষণ সীমান্তের কাছে কমলা বাগান ঘুরে দেখতে চাই।”
তিনি বললেন, “যান, ঘুরে আসুন। তবে বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রম করবেন না। কারণ, ভারতের বাগানে থাকা খাসিয়ারা যেকোনো সময় সন্দেহ হলেই বন্দুক বা রাইফেল দিয়ে গুলি করে বসতে পারে।”
আমরা কমলা বাগানের কাছে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি, বাগানের পাশেই কোয়ারি খনন করে শতাধিক শ্রমিক পাথর উত্তোলন করছেন।
বিষয়টি হিতে বিপরীত হতে পারে—এই আশঙ্কায় ক্যামেরা সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও ছবি তোলার কোনো আগ্রহ হয়নি।
কিছুক্ষণ ঘুরে আবার বিডিআর ক্যাম্পের গেটে ফিরে এলাম। সেখানে অপেক্ষমাণ ক্যাম্প কমান্ডারের কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলাম।
ক্যাম্প কমান্ডার বললেন, “এ ভরদুপুরে আশপাশে ভালো খাবারের কোনো হোটেল নেই বললেই চলে। ভেতরে আসুন আপনারা—যা রিজিকে আছে, ডাল-ভাতই খেয়ে যান।”
আমি দুর্গম এলাকার কথা এবং সীমান্তে বিডিআরের দায়িত্ব পালনে তাঁদের ত্যাগের কথা চিন্তা করে, কৌশলে তাঁর এই আন্তরিক আতিথেয়তা এড়িয়ে গেলাম।
এরপর ক্যাম্প কমান্ডারের কাছে জানতে চাইলাম, “আশপাশে কোনো ছোটখাটো হাট-বাজার আছে কি?”
তিনি ভাবলেন, হয়তো আমরা কোনো কিছু কেনাকাটা করব। উত্তরে বললেন, “ছড়ার ওপারে ‘ছড়ার বাজার’ নামে একটি বাজার আছে। কয়েকটি দোকান থাকলেও সেখানে তেমন কিছু পাওয়া যায় না।”
বিদায় নিয়ে আমরা অল্প সময়ের মধ্যেই ছোট পাহাড়ি ছড়া পেরিয়ে ছড়ার বাজারে পৌঁছে গেলাম।
বাজারে প্রবেশ করে স্থানীয় লোকজনের কাছে জানতে চাইলাম, “এ বাজারে কোনো খাবারের হোটেল আছে কি?”
কয়েকজন বললেন, “বাজারের উত্তরে টিনশেডের একটি মাত্র খাবারের হোটেল রয়েছে।”
আমরাও খুঁজে পেলাম সেই খাবারের হোটেলটি।
হোটেলটি ছিল খুবই সাধারণ। একই সঙ্গে সেখানে হোটেলের কাজ চলত, আবার সেটিই ছিল মালিকের বসতঘর। দুটি থাকার ঘর এবং আলাদা একটি ছোট খাবারের ঘর। খাবারের ঘরে বেঞ্চ, টেবিল, জগ, গ্লাস—সবকিছুই ছিল সাদামাটা, কিন্তু বেশ পরিপাটি।
আমরা দুজন—আমি আর আমার ছোট ভাই আরাফাত—সেখানে বসতেই প্রায় পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর বয়সী এক নারী এগিয়ে এলেন।
মায়ের মতো মমতাভরা কণ্ঠে বললেন, “বাবা, আগে পানি খাও। একটু বসো।”
আমরা ভাত খেতে চাইলাম।
তিনি বললেন, “তোমরা আগে হাত-মুখ ধুয়ে নাও। আমি খাবার দিচ্ছি।”
তিনি জগভর্তি পানি দিয়ে দিলেন। আমরা হাত-মুখ ধুয়ে এসে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
প্রায় আধা ঘণ্টা পর তিনি গরম ভাত এনে আমাদের সামনে পরিবেশন করলেন। সঙ্গে ছিল আলু ভাজি, স্থানীয় রুই মাছের কয়েক টুকরো—নিজস্বভাবে রান্না করা বিরান। এরপর এল ঝাল-মসলাদার স্থানীয় মাছের তরকারি, সবশেষে ডাল।
হোটেলে কোনো বিদ্যুৎ ছিল না।
আমরা খেতে বসেছি। আর সেই মা পাশে দাঁড়িয়ে হাতপাখা দিয়ে আমাকে বাতাস করছেন।
হঠাৎ মনে হলো—আমি যেন কোনো পাহাড়ি বাজারের ছোট্ট হোটেলে বসে নেই; আমি যেন আমার মায়ের সামনে বসে মায়ের হাতের রান্না খাচ্ছি, আর মা আমাকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন।
কথায় কথায় তাঁর জীবনের গল্প জানতে পারলাম।
তিনি জানালেন, তাঁর স্বামী বহু বছর আগে মারা গেছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। তাঁর ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনিরা সনাতন ধর্মাবলম্বী।
অদ্ভুত সুন্দর এক সহাবস্থান।
একই হোটেলের আলাদা আলাদা ঘরে তাঁরা থাকেন। কেউ কারও ধর্ম পালনে বাধা দেন না। প্রত্যেকে যার যার বিশ্বাস নিয়ে শান্তিতে বসবাস করছেন।
দূর পাহাড়ি এলাকায় তিনি মাছ-মাংস ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কীভাবে সংগ্রহ করেন—কৌতূহলবশত জানতে চাইলাম।
তিনি বললেন, পরিচিত মানুষজন যখন সিলেট শহরে যায়, তখন তাঁদের কাছে বলে দেন প্রয়োজনীয় মাছ, মাংস ও অন্যান্য বাজার-সদাই এনে দিতে। এভাবেই সপ্তাহে দুই-তিন দিন পরপর তাঁর প্রয়োজনীয় খাবার ও জিনিসপত্র চলে আসে।
আমরা খাচ্ছি, আর তিনি তাঁর জীবনের গল্প বলছেন। পাশ থেকে আসছে হাতপাখার বাতাস।
কেন জানি না, তাঁর কথাগুলো শুনতে শুনতে আমার চোখের কোণে পানি এসে গেল। মনে হচ্ছিল, এই নারী তো আমার কাছে আর অচেনা কেউ নন—তিনি যেন এই মুহূর্তে আমার নিজের মা।
খাওয়া শেষ হলো।
আমি বারবার জানতে চাইলাম, বিল কত হয়েছে। একবার, দুবার নয়—প্রায় দশবার জিজ্ঞেস করলাম।
কিন্তু তিনি কোনোভাবেই বিলের কথা বলতে চাইলেন না। বরং তাঁর চোখে পানি এসে গেল।
আমি তখন অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। মনে হলো, টাকা না দিয়ে এখান থেকে চলে যাওয়া ঠিক হবে না।
হোটেলের পাশেই একটি কাপড়ের দোকান ছিল। সেখানে শাড়ি পেলাম না; শুধু ছায়া-ব্লাউজের কাপড় ছিল।
আমি কিছু কাপড় কিনে আবার সেই হোটেলে ফিরে এলাম। কাপড়গুলো তাঁর হাতে তুলে দিলাম।
তিনি কাপড়গুলো হাতে নিয়ে কেঁদে ফেললেন।
আমি বললাম, “মা, এটা আপনার জন্য।”
এরপর খাবারের বিল হিসেবে জোর করে তাঁর হাতে ১২০০ টাকা তুলে দিতে চাইলাম। তিনি টাকা নিতে রাজি হচ্ছিলেন না। অনেক অনুরোধের পর শেষ পর্যন্ত টাকাটা নিলেন।
ততক্ষণে মনে হচ্ছিল, এই অচেনা পাহাড়ি মায়ের সঙ্গে যেন এক অদৃশ্য সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। তিনি আমাকে সন্তানের মতো আপন করে নিয়েছেন, আর আমিও তাঁর মধ্যে আমার মায়ের মমতার ছায়া খুঁজে পেয়েছি।
মনে হচ্ছিল, হয়তো আর কোনোদিন এই বাজারে ফিরে আসা হবে না। তাই মায়ের জন্য ছোট্ট একটা উপহার দিয়ে যেতে চেয়েছিলাম।
বিদায়ের সময় তিনি চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন—
“বাবা, তুমি এদিকে আবার এলে আমার এখানে আসবে, আমাকে দেখে যাবে!”
কথাটা শুনে বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
চোখের কোনে জল গড়িয়ে পড়তে পড়তে আর পেছনে ফিরে তাকাইনি।
আমি আর ছোট ভাই আরাফাত পাহাড়ি পথ ধরে ফিরে চললাম। সামনে ছিল ফেরার পথ, আর পেছনে পড়ে রইল একজন অচেনা মায়ের মমতা।
কিন্তু সেই মায়ের হাতপাখার বাতাস, তাঁর চোখের জল আর বিদায়ের সেই ডাক—আজও যেন কানে বাজে—
“বাবা, আবার এলে আমাকে দেখে যেও।”
আজও যখন ওই এলাকার কোনো মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, সুযোগ পেলেই জিজ্ঞেস করি—
“সেই হোটেলটা কি এখনও আছে? সেই মা কি এখনও সেখানে আছেন?”
জানি না, কোনোদিন আবার তাঁকে খুঁজে পাব কি না।
তবুও মনের ভেতর একটা আশা রয়ে গেছে—কোনো একদিন আবার উৎমা ছড়ার সেই পাহাড়ি পথে যাব। সেই ছোট্ট টিনশেড হোটেলটি খুঁজব।
আর যদি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সেই মায়ের দেখা পাই, হয়তো তিনি অবাক হয়ে বলবেন—
“বাবা, এতদিন পর এলে?”
আর আমি হয়তো শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকব।
কারণ কিছু সম্পর্ক রক্তের নয়—
মমতার।
লেখা ও সম্পাদনা: হাবিব সরোয়ার আজাদ
গ্রাফিক্স ডিজাইনার: নীলয়
ই-মেইল: smhsazadj@gmail.com
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com