ইএএসডির জরিপ:
বিএনপি সরকার গঠন করবে বলে মনে করে ৭৭% মানুষ
অনলাইন ডেস্ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করবে বলে মনে করে ৭৭ শতাংশ মানুষ। একই সঙ্গে দলটির প্রতি জনসমর্থন রয়েছে ৭০ শতাংশ মানুষের। এ ছাড়া ১৯ শতাংশ সমর্থন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে জামায়াতে ইসলামী, ২.৬ শতাংশ সমর্থন নিয়ে তৃতীয় অবস্থান এনসিপির ও ১.৪ শতাংশ সমর্থন রয়েছে জাতীয় পার্টির।
এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্টের (ইএএসডি) জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল সোমবার বিকেলে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের সেমিনার হলে সংবাদ সম্মেলনে এই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
স্বাগত বক্তব্যে ইএএসডি পরিচালক ডা. শাহিন আক্তার জানান, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নাগরিকদের মতামত, প্রত্যাশা, দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরাই এ জরিপের মূল্য উদ্দেশ্য। এতে দেশের ৩০০টি সংসদীয় অঞ্চল, বয়স, লিঙ্গ, আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগত ও নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে। জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন সংগঠনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. শামীম হায়দার তালুকদার।
জরিপের সামগ্রিক ফলাফল
জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, বিএনপিকে ভোট দিতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন ৭০ শতাংশ ভোটার। এর বিপরীতে ১৯ শতাংশ ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দিতে আগ্রহী। নতুন দল এনসিপি পেয়েছে ২.৬ শতাংশ সমর্থন। অন্যদের মধ্যে জাতীয় পার্টির জনসমর্থন ১.৪ শতাংশ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ০.১ শতাংশ। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ০.২ শতাংশ। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ০.১ শতাংশ। সমর্থন সম্পর্কে তথ্য দেয়নি ১.৫ শতাংশ, ভোট দিতে অনিচ্ছুক ০.১ শতাংশ, না ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ০.২ শতাংশ। অন্যান্য ৫.১ শতাংশ। লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারী ভোটারদের মধ্যে বিএনপির জনপ্রিয়তা বেশি।
যেখানে ৭১ শতাংশ নারী ভোটার বিএনপিকে সমর্থন দিচ্ছেন।
জনমত জরিপের পদ্ধতি
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জরিপটি দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসন থেকে ক্রস-সেকশনাল বর্ণনামূলক গবেষণা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়েছে। মোট ২০ হাজার ৪৯৫ জন উত্তরদাতার তথ্য ‘কোবো টুলবক্স’ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ১ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ১২০ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তথ্য সংগ্রহকারী মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। ভোটার ঘনত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি নির্বাচনী আসনের দুই থেকে তিনটি ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের ২১৬টি আসনের দুটি ইউনিয়ন থেকে এবং ঢাকা, চট্টগ্রামসহ আটটি সিটি করপোরেশন এলাকার ৮৪টি আসনে তিনটি ওয়ার্ড থেকে সর্বমোট ৬৮৪টি ইউনিয়ন/ওয়ার্ড দ্বৈবচয়ন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
বরিশাল-খুলনায় জামায়াত এগিয়ে
জরিপের তথ্য মতে, আঞ্চলিক বিশ্লেষণেও বিএনপির শক্ত অবস্থান স্পষ্ট। চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগে দলটির প্রতি সর্বোচ্চ ৭৪ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পাওয়া গেছে। তবে বরিশাল ও খুলনায় জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী অবস্থান লক্ষ করা গেছে। বরিশালে দলটির সমর্থন ২৯ শতাংশ এবং খুলনায় ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের রংপুর অঞ্চলে জাতীয় পার্টি তুলনামূলকভাবে বেশি সমর্থন পেয়েছে, যেখানে দলটির পক্ষে মত দিয়েছেন ৫.২ শতাংশ ভোটার।
আওয়ামী লীগের ভোট ভাগ হয়ে যাচ্ছে
জরিপে আওয়ামী লীগের সাবেক ভোটারদের বর্তমান রাজনৈতিক আগ্রহ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পূর্বে আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়াদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন পরিবর্তনের পক্ষে মত দিচ্ছেন। এদের মধ্যে ৬০ শতাংশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে বিএনপিকে ভোট দেওয়ার, আর ২৫ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছে। বাকি ১৫ শতাংশ অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করার ইচ্ছা প্রকাশ করে।
বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ড. কাজী সাইফুদ্দিন বেননুরের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলন শেষে প্যানেলিস্ট আলোচনায় গণমাধ্যমকর্মী, গবেষক, সুধীসমাজের প্রতিনিধি ও অংশীজনদের উপস্থিতিতে উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য ও গণতন্ত্র, প্রাতিষ্ঠানিক বিশেষজ্ঞ মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, ‘সংস্কার কমিশন নির্বাচন কমিশনকে এবার আরো বেশি ক্ষমতায়ন করেছে। এর বাইরেও আমাদের দেশের সংবিধান ও আইনি কাঠামোতে নির্বাচন কমিশনকে অগাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সমস্যা হলো এই ক্ষমতা তারা আগে কখনো ব্যবহার করেনি। তারা কখনো নির্বাহী আদেশের বাইরে যাইনি। এখন দেখার বিষয় এই নির্বাচন কমিশন পারবে কি না?’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, নির্বাচন কমিশনের তিন পদক্ষেপ জরুরি। এক. বিশালভাবে সচেতনতা অভিযান। দুই. নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের নির্বাচন বানচাল, অপতথ্য, ভুল তথ্য কারা প্রচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। তিন. ভোটারদের নিরাপদ ভোট দেওয়া নিশ্চিত করা।
প্যানেলিস্টরা জানান, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু ভোটারদের মানসিকতায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। আসন্ন নির্বাচনের আগে যদি কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে এই জরিপের ফল বদলে দিতে পারে, যা ডাকসু নির্বাচনসহ বিভিন্ন দেশের ইতিহাসে আগেও ঘটেছে।
বিডি প্রতিদিন