দিরাইয়ে শতবর্ষী ‘জগন্নাথের মিষ্টান্ন মেলা’ অনুষ্ঠিত
দিরাই প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন মেলা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘জগন্নাথের মেলা’ এবারও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার দিনব্যাপী দিরাই পৌরসভার মজলিশপুর এলাকায় হারনপুর ও মজলিশপুর গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আয়োজনে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
জগন্নাথদেবের পূজাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর পৌষ মাসের ১৫ তারিখের পর প্রথম মঙ্গলবার এই মেলার আয়োজন করা হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই আয়োজন স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি এলাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।
মেলা উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন গোত্র আলাদা আলাদাভাবে আলাদা আলাদা জায়গায় মিষ্টান্ন রান্নার আয়োজন করে। জগন্নাথ দেবের পূজায় কীর্তন, আগরবাতি, ফল-ফসারি ও অন্যান্য উপাচারের মাধ্যমে ভোগ নিবেদন করা হয়। পূজার প্রসাদ হিসেবে বড় বড় ড্রামে বিশেষ পদ্ধতিতে রান্না করা হয় বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন। এই মিষ্টান্ন প্রসাদ গ্রহণ করতে আশপাশের এলাকা থেকে শতশত নারী-পুরুষ ও ভক্তবৃন্দ মেলায় অংশ নেন।
জগন্নাথের মিষ্টান্ন মেলার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থানীয় গোপাল দে, সুধাংশু ধর ও ধনঞ্জয় নন্দী জানান, আজ থেকে একশ বছরেরও বেশি আগে হারনপুর ও মজলিশপুর গ্রামে কলেরা রোগে মানুষ মারা যেতে শুরু করে। সে সময় চিকিৎসা ব্যবস্থাও ছিল খুবই সীমিত। এমন এক সময়ে এক সাধু সন্ন্যাসী হারনপুর হয়ে মজলিশপুরে আসেন। সেই মুহূর্তেও গ্রামে এক-দুইজন মানুষের মৃত্যু ঘটে। গ্রামের মানুষ সাধুর কাছে এই মহামারি থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় জানতে চাইলে তিনি সারাদিন উপবাস থেকে মিষ্টান্ন রান্না করে সূর্যাস্তের আগে জগন্নাথ দেবের কাছে ভোগ নিবেদন করার পরামর্শ দেন। সেই সময় থেকেই এই ধর্মীয় আচার ও মেলার সূচনা হয়।
স্থানীয়দের মতে, ওই সাধু সন্ন্যাসীকে অনেকে ‘বাবা শাহ’ নামেও জানতেন।
রঞ্জন দাস বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা যে ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক চেতনা নিয়ে এই মেলার সূচনা করেছিলেন, আমরা আজও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করছি।
কটু দেবনাথ বলেন, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি—এই মেলাকে ঘিরে পুরো এলাকায় এক ধরনের আনন্দ ও মিলনমেলা তৈরি হয়।
মেলায় আসা দর্শনার্থী রনি তালুকদার বলেন, এখানকার মিষ্টান্নের স্বাদ অন্যরকম। প্রতিবছর বন্ধুদের নিয়ে এই মেলায় আসি। এটি আমাদের কাছে শুধু মেলা নয়, একটি উৎসব।