জুমার মিম্বর থেকে
সংকটকালে মজুত নৈতিকতার অবক্ষয়
শায়খ আহমাদুল্লাহ
বর্তমান বিশ্ব এক অস্থির ও টালমাটাল সময় পার করছে। যুদ্ধবিগ্রহ, মহামারি ও ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার খবর আমাদের প্রতিনিয়ত বিচলিত করছে। অনিশ্চয়তা ও নানাবিধ শঙ্কায় জনমানুষের মনে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। আমাদের দেশেও এর প্রভাব স্পষ্ট ও প্রকট। কিন্তু দুঃখজনক হলো, এই সংকটকালে একশ্রেণির মানুষের চরম আত্মকেন্দ্রিক ও বিবেকহীন আচরণের নগ্ন প্রকাশ ঘটে। বিশেষ করে অসাধু ব্যবসায়ীরা মানুষের দুর্দিনকে পুঁজি করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এবং অস্বাভাবিক মুনাফা লুটে নেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। অপর দিকে অনেকে পরিবারের জন্য মাত্রাতিরিক্ত খাদ্য বা নিত্যপণ্য কিনে রাখে, এর ফলে বাজারে সংকট দেখা দেয়। অথচ এ সময় একজন মুসলিমের কর্তব্য হওয়া উচিত-সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের পরিচয় দেওয়া।
সংকটকালে মজুত নৈতিকতার অবক্ষয়রসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কারও কোনো কষ্ট লাঘব করবে, আল্লাহ তার কষ্ট দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো দুস্থ লোকের অভাব দূর করবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দুরবস্থা দূর করবেন (মুসলিম)। কিন্তু আমরা কী করছি? বিপদের সময়কে পুঁজি করে অন্যকে আরও বিপদে ফেলার চেষ্টা করছি। নিঃসন্দেহে এটি মানবিকতা ও নৈতিকতার এক নির্মম অবক্ষয়।
অন্যত্র রসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্যকে কষ্টে ফেলবে, আল্লাহ তাকে কষ্টে ফেলবেন (আবু দাউদ)। সুতরাং যারা সাধারণ পার্থিব লোভে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, তারা দুনিয়ায় সাময়িকভাবে লাভবান হলেও আল্লাহর কঠোর শাস্তি থেকে কখনোই তারা রক্ষা পাবে না। বরং তাদের এই অন্যায় একসময় তাদের জন্যই দুঃসহ পরিণতি ডেকে আনবে।
মজুতের দুটি দিক ও শরিয়তের বিধান।
এক. ইহতিকার তথা বাণিজ্যিক মজুতকরণ : মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য বা খাদ্যসামগ্রী বাজার থেকে কিনে মজুত করা, যাতে পরে বেশি দামে বিক্রি করে মুনাফা লাভ করা যায় এটাকে ইহতিকার বা মজুতকরণ বলে। স্বাভাবিক অবস্থায় যদি মজুতকরণ মানুষের জন্য সংকট বা কষ্টের কারণ না হয়, তবে তা জায়েজ। যেমন উৎপাদন মৌসুমে বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা অবস্থায় ব্যবসায়িক প্রয়োজনে পণ্য সংরক্ষণ করা, যা বাজারে কোনো কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে না। পক্ষান্তরে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পরে চড়া মূল্যে বিক্রয় করার জন্য মজুত করলে সেটি গুনাহর কাজ। সংকট তৈরির উদ্দেশ্য ছাড়াও যদি মজুতকরণের ফলে মানুষের ক্ষতি হয় তবে সেটাকে ইসলাম অনুমোদন করে না। নবী করিম (সা.) বলেছেন, অপরাধী ছাড়া অন্য কেউ মজুতদারি করে না (মুসলিম)।
দুই. ইদ্দিখার তথা পারিবারিক প্রয়োজনে মজুতকরণ : নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর উদ্দেশ্যে খাদ্যসামগ্রী বা প্রয়োজনীয় পণ্য সংরক্ষণ করে রাখাকে ইদ্দিখার বলা হয়। এ মজুতকরণ যদি নিজের উৎপাদিত শস্য বা সম্পদ থেকে হয়, তবে এতে কোনো অসুবিধা নেই। রসুল (সা.) নিজ উৎপাদিত খেজুর থেকে পরিবারের জন্য এক বছরের খাদ্য সংরক্ষণ করে রাখতেন (সহিহ বুখারি)।
বাজারে পণ্যের সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা না থাকলে বাজার থেকে খাদ্যসামগ্রী ক্রয় করে সংরক্ষণ করাও বৈধ। কিন্তু যদি এভাবে পণ্য ক্রয় ও পরিবারের জন্য সঞ্চয় করার ফলে বাজারে সংকট তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদের জন্য পণ্য মজুত করা জায়েয হবে না। বরং একজন ইমানদার এ অবস্থায় প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য সংগ্রহ করবে এবং নাগরিকদের প্রতি সহমর্মিতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে।
এ ছাড়া যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ বা মহামারির আশঙ্কা থাকলে রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় পণ্য মজুত করে রাখতে পারে। রাষ্ট্রের এটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইউসুফ (আ.)-এর ঐতিহাসিক ঘটনা এ ক্ষেত্রে প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস পেয়ে পরিকল্পিতভাবে শস্য সংরক্ষণ করে পুরো জাতিকে রক্ষা করেছিলেন। এটি ছিল জনকল্যাণমুখী দূরদর্শী মজুতব্যবস্থা। দুঃখজনকভাবে, কোনো সংকট কিংবা সংকটের গুজব ছড়ালেই আমরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ি এবং অপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুত করতে শুরু করি। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরাও তাদের স্বার্থসিদ্ধিতে তৎপর হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি বাজারে আমরা এর বাস্তব উদাহরণ প্রত্যক্ষ করেছি। অথচ মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত ছিল দুর্যোগে-দুর্দিনে একে অপরের সহযোগী ও কল্যাণকামী হওয়া। তাই আসুন, সংকটময় সময়ে নিজেরা সম্পদ কুক্ষিগত না করে একে অপরের সহযোগী হই। শুধু নিজের ও পরিবারের স্বার্থ বিবেচনা করা চরম স্বার্থপর মানুষের কাজ, কোনো ইমানদারের কাজ নয়। একজন ইমানদার নিজের ও পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অন্য মানুষের চিন্তাও করবে। মহান আল্লাহ আমাদের মজুতদারির মতো এমন হীন মানসিকতা পরিহার করে সততার জীবনযাপন করার তাওফিক দিন।
♦ জুমার মিম্বর থেকে
গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম
বিডি-প্রতিদিন