• সিলেট, দুপুর ১২:০৬, ২৬শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সমাজ সংস্কারে ইসলামি শিক্ষার অবদান

admin
প্রকাশিত এপ্রিল ১২, ২০২৬
সমাজ সংস্কারে ইসলামি শিক্ষার অবদান

Manual2 Ad Code

সমাজ সংস্কারে ইসলামি শিক্ষার অবদান

মুফতি রফিকুল ইসলাম আল মাদানি

 

প্রতীকী ছবি

Manual3 Ad Code

বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে ইসলামি শিক্ষা বিস্তারে কওমি মাদ্রাসা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কওমি মাদ্রাসাগুলো কোরআন-হাদিস, ফিকহ, আকিদা ও নৈতিক শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়ে সমাজে দীনি চেতনা জাগ্রত করে আসছে। ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক চরিত্র গঠন এবং ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধ প্রচারের ক্ষেত্রে কওমি মাদ্রাসার ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

Manual4 Ad Code

ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের অবসানের পর কওমি মাদ্রাসা নতুনভাবে গড়ে ওঠে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ শাসনের প্রভাবে ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন আলেম সমাজ দীনি শিক্ষাকে টিকিয়ে রাখার জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন অনুভব করে। এই প্রেক্ষাপটে ১৮৬৬ সালে ভারতের দেওবন্দে প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল উলুম দেওবন্দ।

এখান থেকেই কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার একটি শক্তিশালী ধারা শুরু হয়, যা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশসহ পুরো উপমহাদেশে বিস্তৃত হয়। গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের বিভিন্ন স্থানে আলেম সমাজের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অসংখ্য কওমি মাদ্রাসা। এই প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ মানুষের অনুদান, জাকাত, সদকা ও ওয়াকফের অর্থে পরিচালিত হয়। জনগণের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় এ শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘কওমি’ বা জনসম্পৃক্ত শিক্ষাব্যবস্থা বলা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসা বিভিন্ন স্বাধীন শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হয়।

Manual3 Ad Code

বিভিন্ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী কওমি মাদ্রাসাগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। অগণিত মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য লক্ষাধিক শিক্ষক এবং বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন।

পাঠ্যক্রমে কোরআন হিফজকওমি মাদ্রাসার ঐতিহ্যের অন্যতম দিক হলো ‘দরসে নিযামী’ পাঠ্যক্রম। এই পাঠ্যক্রমে কোরআন হিফজ, কোরআন তাফসির, হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা ও সাহিত্য, আকিদা, যুক্তিবিদ্যা এবং ইসলামের বিভিন্ন শাস্ত্র গভীরভাবে অধ্যয়ন করা হয়। বিশেষ করে সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিমসহ হাদিসের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলো পাঠদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ইসলামি জ্ঞানের গভীরে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়।

কওমি মাদ্রাসা উপমহাদেশে ইসলামি উচ্চশিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে উচ্চতর হাদিস, উচ্চতর ফিকহ (ইসলামি আইনশাস্ত্র) উচ্চতর তাফসির এবং ইসলামি অর্থনীতি (ইকোনমিক্স) শিক্ষার ক্ষেত্রে কওমি মাদ্রাসার অবদান উল্লেখযোগ্য। সংক্ষেপে বলা যায়, কওমি মাদ্রাসা শুধু সাধারণ ধর্মীয় শিক্ষা নয়, বরং উচ্চতর হাদিস, ফিকহ, তাফসির ও ইসলামি অর্থনীতি শিক্ষার মাধ্যমে মুসলিম সমাজে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা এবং নৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকাশ ও আদর্শ সমাজ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

কওমি মাদ্রাসার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য হলো চরিত্র গঠন ও নৈতিক শিক্ষা। এখানে শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যজ্ঞানই নয়, বরং তাকওয়া, সততা, শালীনতা ও মানবিক গুণাবলি অর্জনের শিক্ষা দেওয়া হয়। শিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং সরল জীবনযাপনের মাধ্যমে একটি আদর্শ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে ওঠে।

সমাজে কওমি মাদ্রাসার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত ইসলামি জ্ঞান সংরক্ষণ ও প্রচারে এই প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। দেশের অসংখ্য আলেম, খতিব, ইমাম ও ধর্মীয় বক্তা কওমি মাদ্রাসা থেকেই শিক্ষা লাভ করে সমাজে দীনের দাওয়াত ও সেবা প্রদান করছেন। মসজিদ, মক্তব, মাদ্রাসা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে তাঁদের অবদান অপরিসীম।

দ্বিতীয়ত কওমি মাদ্রাসা সমাজে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সমাজে যখন বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক সংকট দেখা দেয়, তখন আলেম সমাজ মানুষকে সৎ পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করে। ওয়াজ-নসিহত, দাওয়াতি কার্যক্রম এবং ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে তারা মানুষকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির দিকে আহ্বান জানায়। তৃতীয়ত দুর্যোগ ও সংকটময় সময়ে কওমি মাদ্রাসার ভূমিকা প্রশংসনীয়।

Manual8 Ad Code

বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্য যেকোনো দুর্যোগের সময় অনেক মাদ্রাসা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং আলেম-উলামারা ত্রাণ কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। দরিদ্র ও এতিম শিশুদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও কওমি মাদ্রাসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সবশেষে বলা যায়, কওমি মাদ্রাসা শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানধারা ও সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অবদানের দিক থেকে কওমি মাদ্রাসা উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। সঠিক দিকনির্দেশনা ও যুগোপযোগী উদ্যোগের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতেও সমাজে নৈতিকতা, জ্ঞান ও মানবিকতার আলো ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হবে। ইনশাআল্লাহ!

লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা

 

 

বিডি প্রতিদিন

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com