সিলেটের সাবেক এমপি মাও. ফরিদ চৌধুরী আইসিইউতে, দোয়া কামনা
আবদুল কাদের তাপাদার
সিলেট অঞ্চলের বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবীদ ও রাজনৈতিক নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি), সিলেট জেলা জাাময়াতের সাবেক আমির ও সাবেক কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী গুরুতর অসুস্থ। সিলেট ইবনে সিনা হাসপাতালের আইসিইউতে তিনি চিকিৎসাধীন। তাঁর অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর (৮২) সুস্থতা কামনায় সিলেটসহ দেশবাসী কাছে দোয়া চেয়েছে সিলেট জামায়াতে ইসলামী ও তাঁর পরিবার।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত কারণে নানা জটিল রোগে ভুগছেন। অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় তাকে ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় শুক্রবার তাঁকে হাসপাতালটির ইআইসিইউ বিভাগে স্থানান্তর করা হয়।
মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় আলেমে দ্বীন, ইসলামী চিন্তাবিদ, সংগঠক, সিলেট অঞ্চলের ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম দিকপাল। তার হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনেক স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, এতিমখানা ও ইসলামী প্রতিষ্ঠান।
সিলেটে ইসলাম ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত জামেয়া ইসলামিয়া মডেলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। আশির দশকে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে সিলেটে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় জামেয়া ইসলামিয়া মিরাবাজার উচ্চ বিদ্যালয় । তিনি এই জামেয়ার প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।
এ ধরনের আধুনিক শিক্ষায়তন পরিচালনার জন্য সিলেটে গড়ে উঠে ‘দি সিলেট ইসলামিক সোসাইটি’। এই সোসাইটির উদ্যোগে পরবর্তীতে একই মডেলে সিলেট শহরে পাঠানটুলায় প্রতিষ্ঠিত হয় খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা পাঠানটুলা। সিলেট শহরের ইসলামপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় আল আমিন জামেয়া ইসলামিয়া। শহরের পশ্চিমে নাজিরেরগাঁও জামেয়া ও পূর্ব দিকে জালালাবাদ কলেজসহ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন।
কোরআনের খেদমতে সিলেটে প্রতিষ্ঠিত আনজুমানে খেদমতে কোরআন নামক সামাজিক সংস্থা গঠনেও তিনি অন্যতম দিকপাল হিসেবে কাজ করেন। দীর্ঘদিন তিনি এই সংস্থার সভাপতি ছিলেন। ১৯৭৮ সাল থেকে পরবর্তী তিন দশক সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা ময়দানে আনজুমানে খেদমতে কোরআনের আয়োজনে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত তাফসির মাহফিলে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ওয়াজ করতেন।
সিলেটের আধুনিক ব্যবসা বাণিজ্য প্রসারেও তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। নগরের জিন্দাবাজারে নব্বই দশকে প্রতিষ্ঠিত আধুনিক ও দৃষ্টি নন্দন বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স আলহামরা শপিং সিটি প্রতিষ্ঠায় তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তরুণ বয়সে সিলেট অঞ্চলের নামকরা স্কুল কলেজের বার্ষিক সীরাতুন্নবী (সা:) মাহফিলে তাঁর সীরাত আলোচনা খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠে। সিলেট বিভাগের দূর দূরান্তের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে আলোচনায় অংশ নিতেন। নবী জীবনের ওপর তাঁর সাবলীল আলোচনা এখনো নাড়া নানাভাবে নাড়া দেয়।
তিনি ২০০১ সালে সিলেট-৫ জকিগঞ্জ কানাইঘাট আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর জকিগঞ্জ কানাইঘাটের উন্নয়নে তিনি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেন। রাস্তাঘাট উন্নয়ন ও নদী ভাঙ্গনরোধে বড় কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। নদী ভাঙ্গন রোধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে ১১১ কোটি টাকার ‘আপার সুরমা কুশিয়ারা প্রকল্পের’ মাধ্যমে ব্যাপক কাজ সম্পন্ন হয়। এসময় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা কানাইঘাটের বাসিন্দা আবুল হারিস চৌধুরীও এলাকার উন্নয়নে কাজ করেন।
১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলার রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের তালবাড়ি গ্রামে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মাওলানা আব্দুল হক চৌধুরী। তিনি এলাকার একজন পীরসাহেব ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তি ছিলেন।
ফরিদ চৌধুরী সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা থেকে কামিল ও সিলেট এমসি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। কিছুদিন তিনি এমসি কলেজে বাংলা বিভাগে অনার্স শ্রেণিতেও অধ্যয়ন করেন।
ছাত্রজীবনে ইসলামী ছাত্রসংঘের সিলেট জেলা সভাপতি এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সিলেট জেলা আমির ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন।
সিলেট অঞ্চলে জামায়াতে ইসলামীর সংগঠনকে শক্তিশালী করতে এবং রাজনৈতিক ময়দানে জামায়াতকে এগিয়ে নিতে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী আমলে তিনি নানা জুলুম ও নিপীড়নের শিকার হন।
মাওলানা ফরিদ চৌধুরী নিজ গ্রামে দাদার নামে গড়ে তুলেছেন চমৎকার পরিবেশ সমৃদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া ইসলামিয়া ইউসুফিয়া ফাজিল মাদ্রাসা। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে তিনি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় বিলিয়ে দিয়েছেন।