• সিলেট, সকাল ৯:২৫, ২৪শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামের অগ্রগতি ও সম্ভাবনা

admin
প্রকাশিত নভেম্বর ১, ২০২৫
পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামের অগ্রগতি ও সম্ভাবনা

Manual5 Ad Code

পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামের অগ্রগতি ও সম্ভাবনা

 

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ

 

ইসলামকে ইউরোপ ও আমেরিকার দ্বিতীয় বা তৃতীয় বৃহত্তম ধর্ম বলে মনে করা হয়। এমনকি ইসলাম ও মুসলিম জনগোষ্ঠী পশ্চিমা বিশ্বের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়ে আমেরিকান ইউনিভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. ইসমাইল আল-ফারুকি বলেন, আমেরিকানদের ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে ইসলামের সবচেয়ে বড় বিজয় হবে।

তবে তা কি আদৌ সম্ভব? বস্তুবাদী ধ্যান-ধারণায় ডুবে থাকা আমেরিকার জন্য কি তা সম্ভব? হ্যাঁ, তা সম্ভব।

কারণ আমরা পশ্চিমা বিশ্বের অসংখ্য মানুষকে প্রতিদিন ইসলাম গ্রহণ করতে দেখছি। তাই হয়তো একসময় আমেরিকা মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হবে। পুঁজিবাদী অর্থ ও সমাজ ব্যবস্থার ব্যর্থতা হয়তো তাদের সেই পথে নিয়ে যাবে। নিরাপদ জীবনের বিকল্প হিসেবে তারা হয়তো এই পথ গ্রহণ করবে।

Manual5 Ad Code

জার্মান কূটনীতিক ড. মুরাদ উইলফ্রেড হফম্যান ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর বিখ্যাত বই ‘ইসলাম : দ্য অল্টারনেটিভ’ লেখেন। তিনি তাতে ইসলামের পুনর্জাগরণে আশা ব্যক্ত করে লিখেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি একবিংশ শতাব্দীর ইসলামী জাগরণ ইউরোপ থেকে শুরু হবে।’
১৯৮২ সালে বিশ্বখ্যাত ফরাসি দার্শনিক ও কমিউনিস্ট লেখক রজার গ্যারাউডির ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর মতো একজন চিন্তাশীল লেখকের মুসলিম হওয়ার ঘটনাটি পুরো ইউরোপের জন্য বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

তবে পরিস্থিতি যেমনই হোক, ইউরোপীয় দেশগুলোতে ইসলাম গ্রহণের ক্রমবর্ধমান হার সবার মধ্যে আশা জাগায়। ইউরোপীয় নওমুসলিমদের ঈমানি চেতনা ও নবস্পৃহা নতুন করে স্বপ্ন দেখায়। জীবনযাপনের অত্যন্ত সাধারণ বিষয়েও তারা মহানবী (সা.)-এর সুন্নতকে খুঁজে খুঁজে অনুকরণের চেষ্টা করে। অনেক সময় ইসলামের নির্দেশনা অনুসরণের ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে তারাই অনেক বেশি এগিয়ে। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে।

Manual3 Ad Code

আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বিনে প্রবেশ করতে দেখবেন। তখন আপনি আপনার রবের প্রশংসাসহ পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন, তিনি তাওবা কবুল করেন।’
(সুরা : নাসর, আয়াত : ১-৩)

তাই ইউরোপে ইসলামী সূর্যের উদয়ন অস্বাভাবিক নয়। নতুন প্রজন্মসহ সবার ইসলামী জীবনাচার ও অবিচলতার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করা আমাদের কর্তব্য। আর এই দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে বহু প্রমাণ ও ইঙ্গিত রয়েছে, যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—

প্রথমত : পশ্চিমা পাঠ্যক্রমে ইসলাম উপস্থাপনের ক্ষেত্রে অতীতের খ্রিস্টীয় ও মিশনারি দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব দ্রুত কমে যাচ্ছে। এখন সেখানে তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাচ্ছে। প্রাচ্যবিদদের এক পক্ষীয় পরিকল্পনা ও গবেষণার দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ার পর এই পরিবর্তন আরো জোরদার হয়েছে। এই ইতিবাচক ধারা জোরদার হচ্ছে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে শিক্ষা-সংস্কৃিতির বিনিময় এবং ইসলামী গ্রন্থ ও প্রামাণিক উৎস, বিশেষ করে পবিত্র কোরআন ও হাদিসের নির্ভুল অনুবাদ ও সহজলভ্যতার মাধ্যমে।

দ্বিতীয়ত : পশ্চিমের শিক্ষা মন্ত্রণালয়গুলো সরাসরি পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করে না; বরং বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রকাশনা সংস্থা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এসব বই প্রকাশ করে। এসব সংস্থার অনেকেই নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের দ্বারা বই লেখায় আগ্রহী, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা মুসলিম পণ্ডিতদের পরামর্শ নিচ্ছেন কিংবা সরাসরি তাঁদের দিয়েই বই রচনা করাচ্ছেন। এর পাশাপাশি, পূর্বদেশগুলোতে এমন কিছু গবেষণা কেন্দ্র ও শিক্ষাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেগুলো আধুনিক ভাষা, নকশা ও প্রকাশনাশৈলীতে আন্তর্জাতিক মানের পাঠ্যক্রম ও শিক্ষাসামগ্রী তৈরি করছে।

তৃতীয়ত : মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্বের অন্যান্য ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত পশ্চিমা মুসলিম শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। একইভাবে এই দেশগুলোর পুরনো ও নতুন মুসলিম অভিবাসীদের সন্তানদের মধ্যেও ধর্মপ্রাণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এই দুই শ্রেণির শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন বিদেশি ভাষায় দক্ষ, তেমনি ইসলামী জ্ঞানেও সুদক্ষ হয়ে উঠছে। ফলে তাদের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামের বিকৃত ও ভুল ধারণাগুলো ক্রমে মুছে যাবে, ইনশাআল্লাহ।

চতুর্থত : পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামের প্রতি আগ্রহ ক্রমাগত বাড়ছে। এর ফলস্বরূপ ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের মতো বিষয়ে যোগ্য ও নিরপেক্ষ অধ্যাপকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক দশকে এই পরিবর্তনের ইতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট—শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে ইসলামকে আরো বাস্তবভিত্তিক ও ন্যায়সংগতভাবে উপস্থাপনের প্রবণতাও বেড়েছে।

পঞ্চমত : পশ্চিমের শিক্ষাব্যবস্থায় এমন একটি সুযোগ রয়েছে, যেখানে স্কুলগুলো ধর্মীয় মূল্যবোধসমৃদ্ধ বিষয় পড়ানোর অনুমতি পায়, যতক্ষণ না তা ধর্মান্তরকরণ বা নির্দিষ্ট ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে করা হয়। এই উন্মুক্ত নীতির ফলে ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণাগুলো সংশোধনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধর্মের মূলনীতি সম্পর্কে জানতে পারছে।

ষষ্ঠত : পশ্চিমা জনগণের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর পেছনে রয়েছে নানা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানসিক কারণ। এই আগ্রহের ফলেই অনারবি ভাষাভাষীদের জন্য আরবি ভাষা শেখার কেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক সাড়া দেখা যাচ্ছে। নতুন মুসলমান ও ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহী অমুসলিম—উভয় শ্রেণির মানুষের মধ্যেই এই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, বিশেষত মিসর, লেভান্ট ও সুদানের মতো দেশগুলোতে অ-আরবি ভাষাভাষীদের আরবি শিক্ষা প্রদানের এক প্রাণবন্ত আন্দোলন গড়ে উঠেছে। আরো উল্লেখযোগ্য হলো এই শিক্ষার্থীদের অনেকেই নিজ নিজ দেশে কলেজের ডিন, বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক, গবেষক ও চিন্তাবিদ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছেন।

সপ্তমত : বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বের কিছু শক্তিধর রাষ্ট্র যে অহংকার, আধিপত্যবোধ ও ক্ষমতার উন্মত্ততায় আক্রান্ত—তা তাদের প্রভাবের স্থায়িত্বকে সংক্ষিপ্ত করে ফেলবে, বিশেষত সেই দেশগুলো, যেগুলো তথাকথিত ‘কাউবয় মানসিকতা’ দ্বারা পরিচালিত। এ ছাড়া এই দেশগুলো প্রকৃত অর্থে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি নয়, বরং বিভিন্ন জাতি, সংস্কৃতি ও মতাদর্শের একটি বিচ্ছিন্ন সংমিশ্রণ। ফলে তাদের আধিপত্য টেকসই নয়।

অষ্টমত : আজকের ইসলামী বিশ্ব এক শতাব্দী আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিণত ও সচেতন। বর্তমান শতাব্দী হচ্ছে ইসলামের শতাব্দী। গত শতকের শেষ তিন দশকে এমন এক শক্তিশালী ইসলামী পুনরুজ্জীবন আন্দোলন দেখা গেছে, যা শুধু ধর্মীয় নয়, বরং বৈজ্ঞানিক, বৌদ্ধিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। তুরস্ক, সুদান, আফগানিস্তান, আলজেরিয়া, প্যালেস্টাইন এবং সাম্প্রতিককালে সোমালিয়ায় ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ নামের পরিচিত যে অভিজ্ঞতাগুলো আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, সেগুলো নিঃসন্দেহে এই নবজাগরণের প্রতিফলন। যদিও এসব প্রচেষ্টা এখনো পুরোপুরি সফল হয়নি বা নানা সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে, তবু তারা চেতনা, আত্মসচেতনতা ও আন্দোলনের এমন এক গতি সৃষ্টি করেছে, যা ১০০ বছর আগের মুসলিম উম্মাহর স্থবির অবস্থার সঙ্গে তুলনাই চলে না।

নবমত : এখানে সবাই ইসলামের প্রতি শত্রুতায় সমান নয়। তাদের মধ্যে অনেকেই ন্যায়বোধসম্পন্ন, যারা ইসলাম ও তার মহৎ মূল্যবোধকে সম্মান ও স্বীকৃতি দেয়—তারা ইসলাম গ্রহণ করুক বা না করুক। এই ন্যায়নিষ্ঠদের দেখা মেলে বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক, ধর্মীয় অধ্যয়নের খ্যাতিমান মার্কিন পণ্ডিত জন এল এসপোসিটো, কার্ল আর্নেস্ট ও মাইকেল সেলস, খ্রিস্টান ধর্মতাত্ত্বিক কারেন আর্মস্ট্রং। তা ছাড়া পশ্চিমে বসবাসরত মুসলিম অভিবাসী এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্ম এখন এক শক্তিশালী ও ইতিবাচক উপস্থিতি গড়ে তুলেছে। তারা শুধু সংখ্যায়ই নয়, বরং শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও প্রভাবশালী ভূমিকা রাখছে। তবে সত্য এ-ও যে পশ্চিমা বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষই এখনো ইসলাম সম্পর্কে যথাযথভাবে অবগত নয়, বরং তাদের জ্ঞান অনেকাংশেই বিকৃত বা পক্ষপাতদুষ্ট তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। তাই প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান, সত্য তথ্য ও আন্তরিক যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের কাছে ইসলামের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা। মহান আল্লাহ তাআলার বাণী আমাদের এই পথেই উদ্বুদ্ধ করে : ‘যারা মিথ্যা রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একদল। তোমরা একে তোমাদের জন্য মন্দ মনে কোরো না, বরং এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।’

Manual1 Ad Code

(সুরা : নুর, আয়াত : ১১)

এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রতিকূলতার মধ্যেও কল্যাণের বীজ লুকিয়ে থাকে। তাই ইসলাম ও সত্যের পথে অটল থেকে আমাদের উচিত জ্ঞানকে হাতিয়ার বানিয়ে, পরিকল্পনাকে স্পষ্ট করে এবং আশাকে হৃদয়ে ধারণ করে কর্মে অবতীর্ণ হওয়া।

Manual8 Ad Code

বিডি-প্রতিদিন

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com