• সিলেট, বিকাল ৫:০৫, ১৭ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

তারেক রহমানের প্ল্যান বাস্তবায়ন কীভাবে?

admin
প্রকাশিত ডিসেম্বর ২৮, ২০২৫
তারেক রহমানের প্ল্যান বাস্তবায়ন কীভাবে?

Manual4 Ad Code

 

তারেক রহমানের প্ল্যান বাস্তবায়ন কীভাবে?

আমিরুল ইসলাম কাগজী

 

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় দীর্ঘ দেড় যুগ নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় পদার্পণ করেই চলে যান সংবর্ধনাস্থলে। যেখানে অধীর আগ্রহে লাখ লাখ মানুষ অপেক্ষায় ছিল। অনেকে ছিল দুই দিন আগে থেকেই। একজন প্রাণবন্ত রাষ্ট্রনায়কের মতো তিনি মঞ্চে উঠে চারদিকে ঘুরে ঘুরে হাত নেড়ে তাদের অভিবাদনের জবাব ও সাধুবাদ জানান। এরপর মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জনতার উদ্দেশে বক্তব্য রাখার একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের একটি উদ্ধৃতি দিলেন : ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’। সেই উদ্ধৃতি শেষ করেই তিনি তাঁর কথা বললেন, আই হ্যাভ আ প্ল্যান ফর মাই কান্ট্রি, ফর মাই নেশন। এই একটি বাক্য উচ্চারণের মধ্য দিয়ে তারেক রহমান যে অচিরেই একজন রাষ্ট্রনায়ক হয়ে উঠবেন, তার প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি একটি প্ল্যান নিয়ে দেশে এসেছেন। তবে কী সেই প্ল্যান, সেটা তিনি এখনো ব্যাখ্যা করেননি। তবে বলা যায়, তাঁর প্ল্যান হবে বাংলাদেশকে একটি মানবিক সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে গড়ে তোলা। তাঁর এই প্রতিশ্রুতির কথা সেদিন আগত লাখ লাখ মানুষ যেমন সাক্ষী হয়ে থাকল, তেমনি সাক্ষী হয়ে থাকল মিডিয়ার মাধ্যমে শোনা-দেখা গোটা বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ এবং বিদেশে অবস্থানকারী আরও অনেকেই। অর্থাৎ তিনি এখন তাঁর প্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য এত মানুষের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে থাকলেন। এখন এসব মানুষ অপেক্ষায় থাকবে-কীভাবে তারেক রহমান তাঁর এই রাষ্ট্রভাবনা বাস্তবায়ন করেন।

Manual1 Ad Code

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব জাতি সংকটকাল অতিক্রম করে নতুন দিগন্তে পৌঁছেছে, তাদের নেতৃত্বে ছিলেন এমন মানুষ, যাঁদের কাছে ছিল স্পষ্ট পরিকল্পনা, দৃঢ় নৈতিকতা ও মানবিক রাষ্ট্রভাবনা। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখন বলেন আই হ্যাভ আ প্ল্যান, তখন এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি একটি রাষ্ট্রদর্শনের ঘোষণা, একটি নতুন শাসনচিন্তার রূপরেখা। জাতির কাছে দেওয়া একটি প্রতিশ্রুতি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ‘প্ল্যান’ বাস্তবায়ন করতে কেমন মানুষ দরকার? দরকার হয় একজন নির্মোহ দক্ষ প্রশাসক, প্রাজ্ঞ সৎ রাজনীতিক, শক্তিশালী নাগরিক কাঠামো। এ ছাড়া কোনো পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পায় না। বিশ্বনেতাদের অভিজ্ঞতা ও মন্তব্যের আলোকে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডুইট ডি. আইজেনহাওয়ার, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার ছিলেন, তাঁর মতে, ‘Plans are worthless, but planning is everything.’ পরিকল্পনা অর্থহীন কিন্তু পরিকল্পনাই সবকিছু অর্থাৎ পরিকল্পনা যেমন, তেমন গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মানসিকতা ও সক্ষমতা।

Manual2 Ad Code

তারেক রহমানের আই হ্যাভ আ প্ল্যান মূলত একটি অংশগ্রহণমূলক, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য দরকার এমন মানুষ, যারা ক্ষমতার মোহে নয়, বরং জনসেবার আদর্শে বিশ্বাসী।

রাষ্ট্রপরিচালনায় প্রথম শর্ত নৈতিক নেতৃত্ব।

Manual2 Ad Code

তারেক রহমানের প্ল্যান বাস্তবায়ন কীভাবে?

দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয়তাবাদী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘A good head and a good heart are always a formidable combination.’ অর্থাৎ একটি ভালো মেধা এবং একটি ভালো হৃদয় সব সময়ই একটি দুর্দান্ত সমন্বয়।

তারেক রহমানের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাঁকে হতে হবে নৈতিক নেতৃত্বে বিশ্বাসী একজন রাষ্ট্রনায়ক। এমন নেতৃত্ব, যিনি প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, পুনর্মিলনের রাজনীতি বোঝেন। যিনি ক্ষমতাকে প্রতিপক্ষ দমনের অস্ত্র নয়, বরং জনগণের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব হিসেবে দেখেন। এসব গুণাবলি তিনি ইতোমধ্যেই অর্জন করেছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে নৈতিকতার সংকট প্রকট। এ সংকট কাটাতে হলে তারেক রহমানের পরিকল্পনার কেন্দ্রে থাকতে হবে সৎ, সাহসী ও আত্মসংযমী একদল নিবেদিতপ্রাণ মানুষ।

প্রশাসনে দরকার পেশাদার ও স্বাধীন চিন্তার মানুষ। সিঙ্গাপুরের স্থপতি লি কুয়ান ইউ বলেছিলেন, ‘A country is only as good as the people who run it.’ অর্থাৎ একটি দেশ ততটা ভালো যতটা তাকে দেশের মানুষ পরিচালনা করে। সেদিক থেকে বলতে হবে তারেক রহমানের প্ল্যান যদি একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থায় রূপ নিতে চায়, তবে প্রশাসনে দরকার দলীয় আনুগত্যের বাইরে থাকা পেশাদার আমলা। যারা রাজনৈতিক চাপে নয়, সংবিধান ও আইনের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে।

রাষ্ট্রপরিচালনার রূপরেখায় প্রশাসনিক সংস্কার হবে অন্যতম স্তম্ভ। এখানে দরকার-মেধাভিত্তিক নিয়োগ স্বচ্ছ পদোন্নতিব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন। এ পরিবর্তন বাস্তবায়ন করতে হলে এমন মানুষ চাই, যারা ‘হুকুম মানা’ আমলা নয়, বরং রাষ্ট্রের রক্ষক। গণতন্ত্র রক্ষায় দরকার সাহসী রাজনীতিক। উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, ‘Courage is what it takes to stand up and speak; courage is also what it takes to sit down and listen.’ অর্থাৎ সাহস হলো দাঁড়ানো এবং কথা বলার জন্য যা লাগে; সাহস হলো বসে শোনার জন্যও যা দরকার।’ এবার তারেক রহমানকে সেই রকম সাহস প্রদর্শন করতে হবে। তাঁকে হতে হবে একজন স্টেটসম্যান। রাষ্ট্রনায়ক। দলের নেতা-কর্মীদের রাখতে হবে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। তাঁর পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নে দরকার হবে এমন রাজনীতিক, যাঁরা ভিন্নমতকে শত্রু মনে করে না। যাঁরা সংসদকে বিতর্কের মঞ্চ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, রাবার স্ট্যাম্প হিসেবে নয়। রাষ্ট্রপরিচালনার রূপরেখায় থাকতে হবে-শক্তিশালী সংসদ, স্বাধীন বিচার বিভাগ, কার্যকর বিরোধী দল। এই কাঠামো টিকিয়ে রাখতে হলে রাজনীতিতে দরকার সাহসী, যুক্তিবাদী ও সহনশীল মানুষ। অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় দরকার বাস্তববাদী চিন্তক। চীনের সংস্কারক নেতা দেং শিয়াওপিং বলেছিলেন, বিড়াল কালো কিংবা সাদা সেটা মূলকথা নয় মূলকথা হলো- সে ইঁদুর ধরতে পারে কিনা। অর্থাৎ তাঁকে লক্ষ্য পূরণে সফল হতে হবে।

তারেক রহমানের প্ল্যান কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের রূপরেখাও। এ রূপরেখা বাস্তবায়নে দরকার এমন মানুষ, যাঁরা আদর্শিক জড়তা নয়, বাস্তব সমস্যার বাস্তব সমাধানে বিশ্বাসী। রাষ্ট্রপরিচালনায় দরকার উৎপাদনমুখী অর্থনীতিতে বিশ্বাসী নীতিনির্ধারক তরুণ উদ্যোক্তাদের সুযোগ করে দেওয়া মানুষ; লুটেরা পুঁজিবাদ নয়, ন্যায়ভিত্তিক বাজার অর্থনীতির প্রবক্তা। এখানে দরকার এমন নেতৃত্ব, যারা উন্নয়নের নামে ঋণের বোঝা নয়, কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করবে। তরুণ ও নাগরিক সমাজ পরিকল্পনার প্রাণশক্তি।

Manual1 Ad Code

বারাক ওবামা বলেছিলেন, ‘The future rewards those who press on.’ অর্থাৎ যাঁরা এগিয়ে যায়, ভবিষ্যৎ তাঁদের পুরস্কৃত করে। তারেক রহমানের পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবায়নকারী হবে তরুণ সমাজ। সে কথা তিনিও বলেছেন। রাষ্ট্রপরিচালনার রূপরেখায় তরুণদের কেবল ভোটব্যাংক নয়, নীতিনির্ধারণের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। তাদের এগিয়ে যেতে হবে। এজন্য দরকার-শিক্ষিত, প্রযুক্তিবান্ধব তরুণ নেতৃত্ব, নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ, মুক্ত গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।

এই কাঠামো গড়তে হলে দরকার এমন মানুষ, যারা ভয় নয়, বিশ্বাসের রাজনীতি করে। সবশেষে বলা যায় প্ল্যান তখনই বাস্তব হয়, যখন মানুষ বদলায়।

তারেক রহমানের আই হ্যাভ আ প্ল্যান মূলত একটি আশার বার্তা, একটি বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তার ঘোষণা। কিন্তু ইতিহাস আমাদের শেখায়, কাগজে লেখা পরিকল্পনা নয়, মানুষই রাষ্ট্র গড়ে।

যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হয়, তবে দরকার নৈতিক নেতৃত্ব, দক্ষ ও স্বাধীন প্রশাসন, সাহসী ও সহনশীল রাজনীতিক, বাস্তববাদী অর্থনৈতিক চিন্তক, সচেতন ও অংশগ্রহণমূলক নাগরিক সমাজ।

রাষ্ট্রপরিচালনার এই রূপরেখা বাস্তবায়িত হলে, বাংলাদেশ কেবল ক্ষমতার হাতবদলের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র কোনো দলের নয়, রাষ্ট্র মানুষের। আর মানুষের জন্যই তারেক রহমানের সেই ঘোষণা-আই হ্যাভ আ প্ল্যান।

লেখক : সাংবাদিক

 

বিডি প্রতিদিন

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com