• সিলেট, সকাল ৯:৪৮, ৬ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

তওবা ও আত্মসংযমের প্রয়োজনীয়তা

admin
প্রকাশিত জানুয়ারি ৪, ২০২৬
তওবা ও আত্মসংযমের প্রয়োজনীয়তা

Manual7 Ad Code

তওবা ও আত্মসংযমের প্রয়োজনীয়তা

মুফতি রফিকুল ইসলাম আল মাদানি

 

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই যে সে ভুলের মাঝেই ফিরে আসার পথ খুঁজে নিতে পারে। সেই ফিরে আসার নামই তওবা। আর তওবাকে স্থায়ী ও ফলপ্রসূ করে যে গুণ, তাহলো আত্মসংযম। তওবা ও আত্মসংযম-এই দুইয়ের সম্মিলনেই মানুষের অন্তর পরিশুদ্ধ হয়, সমাজে ফিরে আসে নৈতিক শুদ্ধতা। তওবা কেবল পাপ স্বীকারের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি হৃদয়ের গভীর অনুতাপ, ভুল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত এবং আল্লাহর দিকে নতুন করে যাত্রা শুরু করার অঙ্গীকার।

কোরআনে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা যুমার-৫৩)। এই আয়াত মানবজাতিকে আশ্বাস দেয়-ভুল যত বড়ই হোক, তওবার দরজা কখনো বন্ধ হয় না।’ অপর আয়াতে মহান প্রভু ঘোষণা করেন, ‘হে মুমিনগণ তোমরা তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা নূর-৩১)

তওবা করার ফলাফল এবং ফজিলত সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি তওবা করো, তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত বর্ষণ করবেন, তিনি তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য বাগানসমূহ তৈরি করবেন ও প্রবাহিত করবেন নদীমালা।’ (সুরা নূর-১০, ১১, ১২)

Manual2 Ad Code

তওবার মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে অর্জন করা যায় প্রশান্তি ও যাবতীয় কল্যাণ। তওবা মানুষের আত্মাকে হালকা করে, বিবেককে জাগ্রত করে এবং জীবনে নতুন আলো জ্বালায়। পরকালে পাওয়া যায় চিরশান্তি ও আল্লাহর করুণা।

তওবা করার জন্য অন্যতম শর্ত হলো: ইমান গ্রহণ করা, মৃত্যুর নিকটবর্তী হওয়ার আগে তওবা করা, আল্লাহতায়ালাকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে তওবা করা, পাপ বর্জন করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া, কৃত পাপাচারের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং মানুষের প্রাপ্য সম্পর্কিত পাপ হলে এর প্রাপক বা তার উত্তরাধিকারীর কাছে তা ফেরত দিয়ে অথবা তার কাছ থেকে ক্ষমা নিয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করা। তাই তওবা যদি হয় ক্ষণিকের আবেগ, আর আত্মসংযম না থাকে, তবে সেই তওবা দ্রুতই ভেঙে পড়ে। আত্মসংযম মানে কেবল ইচ্ছা দমন নয়; এটি সচেতন নিয়ন্ত্রণ, নৈতিক সীমার ভিতরে থাকার সাধনা। ইসলামে আত্মসংযমের শিক্ষা সর্বত্র- চোখের হিফাজত, জিহ্বার সংযম, হালালহারামের পার্থক্য রক্ষা ইত্যাদি। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে জয়ী হয়; বরং শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, মুসলিম)

বর্তমান সমাজে ভোগবাদ, লোভ ও তাৎক্ষণিক তৃপ্তির সংস্কৃতি মানুষকে মুহূর্তে ভুলের দিকে ঠেলে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উন্মুক্ততা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, ক্ষমতার মোহ-সব মিলিয়ে সংযম হারালে মানুষ সহজেই নৈতিক সীমানা অতিক্রম করে। ফলে ব্যক্তিগত জীবনে অশান্তি, পারিবারিক ভাঙন এবং সামাজিক অবক্ষয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। তওবা এখানে আশ্রয়, আর আত্মসংযম হলো সেই আশ্রয়ে স্থায়িত্বের ভিত্তি।

তওবা মানুষকে আশাবাদী করে। যে ব্যক্তি তওবা করে, সে নিজের অতীতকে বোঝা নয়, শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে। আত্মসংযম তাকে ভবিষ্যতের পথে সঠিকভাবে চলতে সহায়তা করে। যেমন নদীর তীরে বাঁধ না থাকলে পানি ছড়িয়ে পড়ে ক্ষতি করে; তেমনি আত্মসংযম ছাড়া আবেগ ও প্রবৃত্তি জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। সংযম সেই বাঁধ, যা শক্তিকে সঠিক পথে প্রবাহিত করে কল্যাণে রূপ দেয়। ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি সমাজের ক্ষেত্রেও তওবা ও আত্মসংযম অপরিহার্য। দুর্নীতি, মিথ্যাচার, হিংসা-এসব সামাজিক ব্যাধির মূলে রয়েছে সংযমের অভাব। যখন ব্যক্তি নিজের ভুল স্বীকার করে সংশোধনের পথে হাঁটে, তখন সমাজও সুস্থতার দিকে অগ্রসর হয়। তওবা সামাজিক সম্পর্ককে মেরামত করে; আত্মসংযম পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থা বাড়ায়।

Manual2 Ad Code

তওবা ও আত্মসংযম চর্চার পথ সহজ নয়, তবে সম্ভব। নিয়মিত আত্মসমালোচনা, ইবাদতে যত্ন, নেক সঙ্গ ও সৎ পরিবেশ এই পথে সহায়ক। বিশেষ করে নীরব মুহূর্তে নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন-আমি কোথায় ভুল করেছি, কোথায় সংযম হারিয়েছি, এই প্রশ্ন মানুষকে সঠিক পথে ফেরায়। তওবা তখন শুধু মুখের কথা থাকে না; জীবনের দিশা হয়ে ওঠে। তওবা মানুষকে আলোর দিকে ফেরায়, আর আত্মসংযম সেই আলোকে ধরে রাখে। এই দুই গুণ ছাড়া ব্যক্তির মুক্তি যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি সমাজের শান্তিও দুর্লভ। অস্থির সময়ে আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার অন্তরের এই সংস্কার-ভুল থেকে ফিরে আসার সাহস এবং সঠিক পথে অবিচল থাকার শক্তি। তওবা ও আত্মসংযম-এই যুগল সাধনাই পারে মানুষকে মানুষ করে তুলতে, সমাজকে দিতে পারে স্থায়ী শান্তি।

Manual5 Ad Code

লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বসুন্ধরা, ঢাকা

Manual3 Ad Code

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com