গণতন্ত্রের সৌন্দর্যের জন্য হলেও সংবিধান সংস্কার প্রয়োজন: ডা. শফিকুর রহমান
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, গণতন্ত্রের সৌন্দর্যের জন্য হলেও সংবিধান সংস্কার প্রয়োজন। কোন দেশের সংবিধানই অপরিবর্তনশীল নয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তা পরিবর্তন করতে কোন বাধা নেই।
এবারের ঈদ যাত্রার সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ঈদ যাত্রায় বিশৃঙ্খলার জন্য সরকারের গাফিলতি এবং সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রীর অযাচিত মন্তব্যই অনেকাংশে দায়ী।
সিলেট সার্কিট হাউসে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে সাংবাদিকদের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা ও মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
প্রায় ঘন্টাব্যাপি চলা এই মতবিনিময়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরসহ সিলেট জেলা ও মহানগর জামায়াতের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
পরে বিকেলে সিলেট মহানগর জামায়াতের ঈদ পুনর্মিলনীতে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে ডা. শফিকুর রহমানের।
নির্বাচন পরবর্তি সংকটের বিষয়গুলো নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংসদের ভেতরে এসব সমাধান না হলে স্বভাবতই তা বাহিরে আন্দোলনে রুপ নেবে।
রাষ্ট্র আগের ধারাতে চলছে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রেসিডেন্টের প্রতিষ্ঠান নিয়ে কোন নেতিবাচক ধারনা জামায়াতের নেই, তবে ব্যক্তিকে নিয়ে প্রশ্ন আছে তাদের। নিশ্চয় সরকার এটা নিয়ে ভাববে। একই সাথে দেশের জনসংখ্যাকে যদি জনশক্তিতে রুপান্তরিত করা যায় তাহলে বাংলাদেশ হবে একটি মর্যাদাপুর্ন সম্ভাবনাময় অঞ্চল।
মতবিনিময় সভায় জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা আরো বলেন, আমরা সবসময় যুক্তিসঙ্গত রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। আমরা উদার, কিন্তু অন্ধ নই। চোখ বন্ধ করে কোনো কিছু মেনে নেওয়ার পক্ষেও আমরা না। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার—জাতি যখন পরিবর্তনের পক্ষে মত দেয়, সংস্কারের পক্ষে গণরায় দেয়, তখন সেই সংস্কার বাস্তবায়ন করাই সরকারের দায়িত্ব।
ডেপুটি স্পীকার না নেওয়া প্রসঙ্গে জামায়াত আমীর বলেন, আমরা বলেছি, আংশিক নয়—পূর্ণাঙ্গ সংস্কার চাই। শুধু স্পিকারের পদ নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় জনগণের অধিকার ও ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে। কারণ এটি কোনো ব্যক্তি বা দলের দয়ার বিষয় নয়—এটি জাতির স্বার্থের প্রশ্ন। আমরা যুক্তিসঙ্গত, কিন্তু আপসহীন। সময়ই বলে দেবে কখন কী প্রয়োজন। যখন বাস্তবতা আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করবে, তখন আন্দোলন আসবে। আন্দোলন কোনো উৎসব বা নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়—এটি বাস্তবতার দাবি অনুযায়ী হয়।আমরা একটি সুষ্ঠু ও স্থিতিশীল পরিবেশ চাই।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণ আমাদের ওপর যে দায়িত্ব দিয়েছে, তার জবাবদিহিতা আমাদের করতেই হবে। যদি আমরা সেই দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হই, তাহলে জনগণের কাছে আমাদের জবাব দিতে হবে—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। সরকার যদি জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করে, তাহলে তারা তাদের পাঁচ বছরের ম্যান্ডেট পূর্ণ করুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু যদি তাদের কার্যক্রম প্রমাণ করে যে তারা সেই সক্ষমতা রাখে না, তাহলে সিদ্ধান্ত নেবে জনগণই।
শফিকুর রহমান জানান, আন্তর্জাতিক বিষয়ে আমরা একটি নীতিতে বিশ্বাস করি—বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ আমরা সমর্থন করি না। তবে তারা যদি কোনো বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, আমরা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জায়গা থেকে তা বিবেচনা করি। দেশের সম্মান রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় সংকট হলো যুদ্ধ পরিস্থিতি। এই পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশ জ্বালানি, রেমিট্যান্স এবং রপ্তানি—সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আমাদের অর্থনীতি মূলত দুইটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—রেমিট্যান্স এবং রপ্তানি। বিদেশে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষরাই সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পাঠান। কিন্তু যুদ্ধ বা বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে তারা যদি ক্ষতিগ্রস্ত হন বা দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন, তাহলে তা আমাদের অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। একইভাবে, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি চাপে পড়বে। এটি কোনো একক দলের সমস্যা নয়—এটি পুরো জাতির সমস্যা। এই ধরনের জাতীয় সংকট মোকাবেলায় সরকার যদি সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেয়, আমরা অবশ্যই ইতিবাচকভাবে অংশগ্রহণ করব। কারণ আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার মানুষ, দেশ এবং এই মাটির স্বার্থ। আমরা সবসময় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে চাই। তবে সেই পরিবেশ তৈরি করার দায়িত্ব সবার—বিশেষ করে সরকারের।
তিনি আরো বলেন, আমরা শুরু থেকেই অন্যায়, ফ্যাসিবাদী প্রবণতা এবং জনগণের স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। মানুষের জীবন, সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে আমরা কখনোই আপস করিনি এবং করব না।
সংসদ কোনো দলীয় প্রতিষ্ঠান নয়—এটি পুরো জাতির। তাই এখানে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই দায়িত্ব গঠনমূলক ভূমিকা রাখা। আমরা সংসদের ভেতরে যেমন দায়িত্বশীল রাজনীতি করব, তেমনি প্রয়োজন হলে সংসদের বাইরেও জনগণের পক্ষে অবস্থান নেব।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল—সংসদের প্রথম অধিবেশন দ্রুত ডাকা হবে এবং একই পদ্ধতিতে সংস্কার পরিষদের অধিবেশনও আহ্বান করা হবে—তা ছিল একটি প্রেসিডেনশিয়াল অর্ডারের অংশ। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, এই অধিবেশন আহ্বান করবেন রাষ্ট্রপতি, তবে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত অনুরোধের ভিত্তিতে।
এখন আমাদের প্রশ্ন হলো—সেই লিখিত অনুরোধটি আদৌ পাঠানো হয়েছে কি না? যদি পাঠানো না হয়ে থাকে, তাহলে এর পেছনের কারণ কী?