হিজরতের শিক্ষা আশুরার তাৎপর্য
মুফতি রফিকুল ইসলাম আল মাদানি
ইসলামের ইতিহাসে হিজরত একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এটি কেবল ভৌগোলিক স্থানান্তরের নাম নয়; বরং সত্য, ন্যায় ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ এবং নতুন সভ্যতা নির্মাণের এক মহিমান্বিত অধ্যায়। ‘হিজরত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ত্যাগ করা, পরিত্যাগ করা বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যাওয়া। ইসলামি পরিভাষায় হিজরত বলতে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আদেশ পালনের উদ্দেশ্যে দীনের নিরাপত্তা ও প্রতিষ্ঠার জন্য নিজ আবাসভূমি ত্যাগ করে অন্য কোথাও চলে যাওয়া বোঝায়।
মক্কায় ইসলামের সূচনালগ্নে মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবিগণ চরম নির্যাতনের শিকার হন। কুরাইশ নেতারা ইসলামের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে নিজেদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের জন্য হুমকি মনে করেছিল। মুসলমানদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, সামাজিক বয়কট, সম্পদ লুট এবং হত্যার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত করা হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর স্মরণ করুন, যখন কাফিররা আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল-আপনাকে বন্দি করে রাখতে, অথবা হত্যা করতে, অথবা দেশ থেকে বের করে দিতে। তারা ষড়যন্ত্র করছিল, আর আল্লাহও পরিকল্পনা করছিলেন। আর আল্লাহই সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী’ (আল-আনফাল-৩০)। এই আয়াতে হিজরতের প্রাক্কালে মক্কার কুরাইশ নেতাদের দারুণ-নাদওয়ার বৈঠকে গৃহীত তিনটি প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে-
বন্দি করে রাখা : কিছু সদস্য মহানবী (সা.)-কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে কারাগারে আবদ্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছিল, যাতে তিনি ইসলামের দাওয়াত দিতে না পারেন।
হত্যা করা : কিছু সদস্য মহানবী (সা.)-কে হত্যা করার পরামর্শ দিয়েছিল। যাতে সব মিশন চিরতরে শেষ হয়ে যায়।
দেশ থেকে বহিষ্কার করা : কিছু সদস্য মহানবী (সা.)-কে মক্কা থেকে নির্বাসিত করে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল, যাতে তিনি অন্যত্র গিয়ে প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন।
দারুণ-নাদওয়ার এই বৈঠকে উত্থাপিত তিনটি প্রস্তাবের মধ্যে শেষ পর্যন্ত মহানবী (সা.)-কে হত্যা করার প্রস্তাবটিই গৃহীত হয়। সিরাতের প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী, কুরাইশদের এ সভায় নাজদের এক বৃদ্ধ শাইখের ছদ্মবেশে ইবলিশ উপস্থিত হয়েছিল। যখন বিভিন্ন মতামত আলোচনা হচ্ছিল, তখন সে হত্যা পরিকল্পনাটিকে সবচেয়ে কার্যকর বলে সমর্থন করে। মূল পরিকল্পনাটি পেশ করে আবু জাহেল। সে বলে, প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে শক্তিশালী যুবক নির্বাচন করা হবে। তারা সবাই একযোগে মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর আঘাত করবে। ফলে তাঁর রক্তের দায়িত্ব সব গোত্রের মধ্যে বণ্টিত হবে। তখন বনু হাশিম সমগ্র কুরাইশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবে না। বাধ্য হয়ে রক্তপণ গ্রহণ করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভিন্ন কুরাইশ গোত্র থেকে নির্বাচিত যুবকদের একত্র করা হয়। তারা রাতের বেলা রসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘর ঘিরে ফেলে এবং অপেক্ষা করতে থাকে যে তিনি সকালে বের হলে সবাই মিলে একযোগে তাঁকে আক্রমণ করবে। আল্লাহতায়ালা আগেই তাঁর নবীকে এ ষড়যন্ত্রের সংবাদ অবহিত করেন। রসুলুল্লাহ (সা.) হিজরতের নির্দেশ পান। তিনি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সুরা ইয়াসিন-এর কিছু আয়াত তিলাওয়াত করেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁকে দেখতে পায়নি। তিনি আবুবকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে হিজরতের পথে রওনা হন। হিজরত শুরু হয়েছিল সফর মাসে। মদিনায় পৌঁছেন রবিউল আউয়াল মাসে। কিন্তু হিজরি সনের গণনা মহররম থেকে শুরু হয়েছে, কারণ মহররম ছিল আরবদের বর্ষের প্রথম মাস এবং দ্বিতীয় আকাবার বাইআত সংঘটিত হয়েছিল জিলহজ মাসে। তখনই হিজরতের সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি হয়। তাই পরবর্তী প্রথম মাস মহররম হওয়ায় সাহাবিগণ এটিকেই বছরের সূচনা হিসেবে গ্রহণ করেন। এ মাসের দশম দিন ‘আশুরা’ নামে পরিচিত। এ দিনের সঙ্গে বহু ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি জড়িত। রসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় আগমন করেন, তখন ইহুদিদের আশুরার দিন রোজা পালন করতে দেখেন। তারা বলল, এদিন আল্লাহতায়ালা মুসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন নবী (সা.) বলেন, ‘মুসা (আ.)-এর প্রতি তোমাদের চেয়ে আমাদের অধিক অধিকার রয়েছে।’ অতঃপর তিনি নিজে রোজা রাখেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন (সহিহ বুখারি)। অন্য হাদিসে রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফের কারণ হবে (সহিহ মুসলিম)।
আশুরার রোজা মূলত ১০ মহররম। তবে ইহুদিরা এই দিনে রোজা রাখে, তাই ইহুদিদের থেকে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার জন্য নবম ও দশম মহররম দুই দিন অথবা দশম ও একাদশ মহররম দুই দিন রোজা রাখা সুন্নত। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ইহুদিদের বিরোধ করো, তোমরা এর আগে একদিন অথবা পরে একদিন রোজা রাখো’ (আহমদ)।
♦ লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বসুন্ধরা, ঢাকা
বিডি প্রতিদিন