ইসলামের আলোকে
পিতা-পুত্রের দূরত্ব ও দ্বন্দ্ব নিরসনে করণীয়
মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ
কিশোর বয়সে সাধারণত রাগ, তাড়াহুড়া, অবাধ্যতা, পরিণতি সম্পর্কে দুর্বল ধারণা এবং নিজেকে পূর্ণবয়স্ক মনে করার প্রবণতা দেখা যায়। অনেক কিশোর মনে করতে পারে যে সে একজন পরিণত মানুষ এবং তার ওপর মা-বাবার কোনো অভিভাবকত্বের প্রয়োজন নেই। এমন প্রেক্ষাপটে এখানে ইসলামের আলোকে পিতা ও পুত্রের দ্বন্দ্ব নিরসনে করণীয় বিষয়ে বর্ণনা করা হলো।
পিতার প্রতি উপদেশ
সম্মানিত বাবা, নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ মনে করে ছেলেকে বড় বড় অভিযোগে অভিযুক্ত করবেন না। সম্ভবত সমস্যার মূল কারণ আপনার সন্তানের ছোটবেলা থেকেই তাকে সঠিকভাবে দীক্ষা না দেওয়া, অথবা উপদেশ দেওয়ার সময় অতিরিক্ত কঠোরতা, অপমান কিংবা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের পথ অবলম্বন করা। বিশেষ করে কিশোরদের ক্ষেত্রে এ ধরনের আচরণ সাধারণত ভালো ফল দেয় না; বরং তিক্ততা সৃষ্টি করে।
মহান আল্লাহ তাঁর নবী (সা.) সম্পর্কে বলেছেন, ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন। আপনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তাহলে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত। অতএব আপনি তাদের ক্ষমা করুন, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং কাজে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেন, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)
এক বেদুঈন মসজিদের মধ্যে প্রস্রাব করে ফেলেছিল। লোকেরা তাকে শাস্তি দিতে এগিয়ে গেলে মহানবী (সা.) বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। তার প্রস্রাবের ওপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও। কারণ তোমাদের সহজকারী হিসেবে পাঠানো হয়েছে, কঠিনকারী হিসেবে পাঠানো হয়নি। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২২০)
আর আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সহজ করো, কঠিন কোরো না; সুসংবাদ দাও, মানুষকে বিমুখ কোরো না। (বুখারি, হাদিস : ৬৯)
নিজের মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্কের কথা স্মরণ করুন : হে স্নেহশীল বাবা, আপনার নিজের মা-বাবার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল এবং আপনি তাঁদের সঙ্গে কতটা সদাচরণ করেছিলেন, তা স্মরণ করুন। আপনি যদি তাঁদের কোনো অধিকারে অবহেলা করে থাকেন, তাহলে বেশি বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং নিজের ভুল সংশোধন করুন। কারণ কখনো কখনো সন্তানের অবাধ্যতা মানুষের নিজের আগের আচরণের প্রতিফলনও হতে পারে।
সন্তানের জন্য বেশি বেশি দোয়া করুন : সবচেয়ে শক্তিশালী চিকিৎসা ও সমাধানের অন্যতম হলো দোয়া, বিশেষ করে সন্তানের জন্য মা-বাবার দোয়া। তাই সন্তানের জন্য বেশি বেশি দোয়া করুন। তারা যতই ভুল করুক, তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করবেন না। আর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দোয়া অবশ্যই কবুল হয়-মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের জন্য পিতার দোয়া। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৩৬)
ছেলের জন্য পরামর্শ
হে ছেলে, জেনে রেখো, বাবার প্রতি তোমার সদাচরণ শুধু তার পক্ষ থেকে তোমার প্রতি করা ভালো কাজের প্রতিদান নয়; বরং মা-বাবার প্রতি সদাচরণ করা তোমার ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে আরোপিত একটি শরিয়তসম্মত কর্তব্য। এমনকি মা-বাবা কাফির হলেও এবং সন্তানকে কুফরের দিকে আহবান করলেও তাদের সঙ্গে দুনিয়াবি জীবনে সদাচরণ করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তবে তারা যদি তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছু শরিক করতে বাধ্য করে, যার সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না। আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন; তখন আমি তোমাদের জানিয়ে দেব তোমরা কী করতে।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৮)
মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্ক সমানে সমান নয় : মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্ক এমন নয় যে তুমি আমার সঙ্গে যেমন আচরণ করবে, আমিও তোমার সঙ্গে তেমন আচরণ করব। বরং এটি ভালোবাসা, সম্মান ও সদাচরণের সম্পর্ক। তারা ভুল করলেও তাদের সঙ্গে সম্মান বজায় রাখতে হবে। অবশ্যই প্রয়োজন হলে হিকমত ও কোমলতার সঙ্গে তাদের ভুলের ব্যাপারে নসিহত করা যাবে।
মা-বাবার মর্যাদা বোঝো : দেখো, আল্লাহ কিভাবে তাঁর একত্ববাদ ও ইবাদতের নির্দেশের সঙ্গে মা-বাবার প্রতি সদাচরণের নির্দেশকে পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, “তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উফ’ বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো। আর তাদের জন্য দয়ার সঙ্গে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বলো, ‘হে আমার রব! তারা যেমন শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন, তেমনি আপনি তাঁদের প্রতি দয়া করুন’।” (সুরা : আল-ইসরা, আয়াত : ২৩-২৪)
মা-বাবার সেবা জান্নাত লাভের বড় কারণ : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, তার নাক ধুলায় মলিন হোক, আবার তার নাক ধুলায় মলিন হোক, আবার তার নাক ধুলায় মলিন হোক! সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, কে?
তিনি বললেন, যে ব্যক্তি তার মা-বাবার একজন অথবা উভয়কে বার্ধক্যে পেল, অথচ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না। (মুসলিম, হাদিস : ২৫৫১)
মা-বাবা ভুল করলেও ধৈর্য ধরো : হে সম্মানিত ছেলে, আমরা অস্বীকার করছি না যে মা-বাবা কিংবা তাঁদের কেউ কখনো সন্তানের প্রতি ভুল করতে পারেন। তবু সন্তানের কর্তব্য হলো ধৈর্য ধারণ করা এবং শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে মা-বাবার সঙ্গে আচরণ করা। এর বিনিময়ে সন্তানের জন্য বড় পুরস্কার রয়েছে।
হে সৌভাগ্যবান ছেলে, বিশেষ করে মা-বাবার সঙ্গে এবং সাধারণভাবে সবার সঙ্গে ধৈর্য, কোমলতা ও রাগ সংবরণ করার মর্যাদা মনে রাখো। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও, যার প্রশস্ততা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমান; যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। যারা সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা উভয় অবস্থায় ব্যয় করে, রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৩-১৩৪)
ভুলভাবে পরামর্শ দেওয়া বন্ধুদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো : যেসব বন্ধু ভালো চায় বলে মনে হলেও ভুল পরামর্শ দেয় এবং তোমাকে মা-বাবার বিরুদ্ধে উসকে দেয়, তাদের ষড়যন্ত্র ও প্রভাব থেকে সাবধান হও। কারণ এসব পরামর্শ কখনো কখনো বিষমাখা ছুরির মতো মারাত্মক হতে পারে; যদিও তা সহানুভূতি ও নসিহতের পোশাক পরে আসে।
বিডি প্রতিদিন